২৪ ঘন্টায় করোনায় রেকর্ড সংখ্যক ৬৪ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সর্বোচ্চ ৩,৬৮২ জন

Social Share

দেশে করোনা শনাক্তের ১১৫তম দিনে গত ২৪ ঘন্টায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রেকর্ড সংখ্যক ৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এই পর্যন্ত এ ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন।
এর আগে ১৬ জুন একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড ছিল, ওইদিন ৫৩ জন মৃত্যুবরণ করেছিলেন। গতকালের চেয়ে আজ ১৯ জন বেশি মারা গেছেন। শনাক্তের বিবেচনায় আজ মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগের দিনও এই হার ছিল ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। গতকালের চেয়ে আজ শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেশি।
আজ দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনাভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত অনলাইন হেলথ বুলেটিনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা এসব তথ্য জানান।
অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা জানান, দেশে গত ২৪ ঘন্টায় ১৮ হাজার ৪২৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩ হাজার ৬৮২ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গতকালের চেয়ে আজ ৩৩২ জন কম শনাক্ত হয়েছেন। গতকাল ১৭ হাজার ৮৩৭টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছিল ৪ হাজার ১৪ জন। দেশে বর্তমানে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৮৩ জন। এ পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় ২৪ ঘন্টায় শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আগের দিন এ হার ছিল ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আগের দিনের চেয়ে আজ শনাক্তের হার ২ দশমিক ৫২ শতাংশ কম।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতাল এবং বাসায় মিলিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৪ জন। গতকালের চেয়ে আজ ২০৯ জন কম সুস্থ হয়েছেন। গতকাল সুস্থ হয়েছিলেন ২ হাজার ৫৩ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৫৯ হাজার ৬২৪ জন।
তিনি জানান, আজ শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৪০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আগের দিন এই হার ছিল ৪০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগের দিনের চেয়ে আজ সুস্থতার হার শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি।
ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, ‘করোনাভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘন্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৩টি। আগের দিন সংগ্রহ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ৪১৩টি। গতকালের চেয়ে আজ ৪ হাজার ৪৫০টি নমুনা বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় দেশের ৬৬টি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৪২৬টি। আগের দিন নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল ১৭ হাজার ৮৩৭টি।গত ২৪ ঘন্টায় আগের দিনের চেয়ে ৫৮৯টি বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ।
তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ৫২ জন পুরুষ এবং ১২ জন নারী। বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায় যায়, ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ৩ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ১১ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ১৬ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৬ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ২১ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ৭ জন রয়েছেন। তাদের ৩১ জন ঢাকা বিভাগের, ১২ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৭ জন রাজশাহী বিভাগের, ৭ জন খুলনা বিভাগের, ২ জন সিলেট বিভাগের, ২ জন বরিশাল বিভাগের এবং ২ জন ময়মনসিংহ বিভাগের। এদের মধ্যে হাসপাতালে ৫১ জন এবং বাসায় ১৩ জন মারা গেছেন।
অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেয়া হয়েছে আরও ৪৪৯ জনকে এবং এ পর্যন্ত আইসোলেশনে নেয়া হয়েছে ২৬ হাজার ৫৮৭ জনকে। গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ৫৪৪ জন এবং এ পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন ১১ হাজার ৪৪০ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন ১৫ হাজার ১৪৫ জন।
তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৪২ জনকে, এ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬৬ জনকে। গত ২৪ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড় পেয়েছেন ২ হাজার ৮৩৪ জন, এ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইন থেকে মোট ছাড় পেয়েছেন ২ লাখ ৯৯ হাজার ১৯৯ জন। বর্তমানে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৬৪ হাজার ৬৬৭ জন।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ২৪ ঘন্টায় বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ২শ’টি। এ পর্যন্ত সংগ্রহ ২৫ লাখ ২৮ হাজার ২৪৫টি। এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৪টি। বর্তমানে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৮১টি পিপিই মজুদ রয়েছে।
গত ২৪ ঘন্টায় হটলাইন নম্বরে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩২২টি এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৯১টি ফোন কল রিসিভ করে স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি জানান, করোনাভাইরাস চিকিৎসা বিষয়ে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৪১০ জন চিকিৎসক অনলাইনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। ২৪ ঘন্টায় আরও ২ জন চিকিৎসক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এদের মধ্যে ৪ হাজার ২১৭ জন স্বাস্থ্য বাতায়ন ও আইইডিসিয়ার’র হটলাইনগুলোতে স্বেচ্ছাভিত্তিতে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘন্টা জনগণকে চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ দিচ্ছেন।
ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, দেশের বিমানবন্দর, নৌ, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে গত ২৪ ঘন্টায় ১ হাজার ৪৫০ জনসহ সর্বমোট বাংলাদেশে আগত ৭ লাখ ৩৬ হাজার ১৫৫ জনকে স্কিনিং করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি তুলে ধরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৯ জুন পর্যন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ২৪ ঘন্টায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৯৬২ জন। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১৬ জন। ২৪ ঘন্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪৫৭ জন এবং এ পর্যন্ত ২১ হাজার ৭৮ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৯ জুন পর্যন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী সারাবিশ্বে ২৪ ঘন্টায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৮ জন। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ কোটি ২১ হাজার ৪০১ জন। ২৪ ঘন্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪ হাজার ১৫৩ জন এবং এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৯২ হাজার ৯১৩ জন বলে তিনি জানান।
চলমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গর্ভবতী মায়েদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতেও দেশের সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান যেমন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গর্ভবতী মায়েদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিকটস্থ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে ৪টি গর্ভকালীন সেবা নেয়া যাচ্ছে। প্রসবকালীন যেকোনো জটিলতা এড়াতে নিকটস্থ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ প্রসব সেবা নিতে পারবেন।’
তিনি বলেন, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এএনসি বা প্রসবপূর্ব এবং পিএনসি বা প্রসবোত্তর সেবা কর্নার আছে। যেখানে মিডওয়াইফসহ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীরা রয়েছেন। সেখানে সকল স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি এএনসি-পিএনসি কার্ডে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মোবাইল নম্বর দেয়া হচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ এবং মোবাইল সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
গর্ভকালীন পাঁচটি বিপদচিহ্ন যেমন- চোখে ঝাপসা দেখা বা তীব্র মাথাব্যথা হওয়া, খিঁচুনি হওয়া, প্রসবের পূর্বে হঠাৎ রক্তপাত হওয়া, ভীষণ জ্বর হওয়া এবং প্রসব বিলম্বিত হওয়া এগুলোর যেকোনো একটি উপসর্গ দেখা দিলে সাথে-সাথে নিকটস্থ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
গর্ভবতী মায়ের প্রতি পরিবারের সদস্যদের বিশেষ যতœ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য যেমন- টাটকা ফল, শাকসবজি, আমিষ সমৃদ্ধ খাবার, বিভিন্ন প্রকার ডাল,মাছ-মাংস-ডিম-দুধ খেতে দেবেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গর্ভকালীন বেশি পরিমাণে খাবার দিতে হবে। গর্ভস্থ শিশুর বয়স যত বাড়বে, সাথে-সাথে খাবারও বাড়াতে হবে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রথম ৩ মাসে ১০০ থেকে ২০০ ক্যালোরি খাবার বেশি দরকার, দ্বিতীয় ৩ মাসের সময় ২০০ থেকে ৪০০ ক্যালরি এবং তৃতীয় ৩ মাসের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০০ ক্যালরির বেশি খাবার গর্ভবতী মায়েদের প্রয়োজন। মাছ, মাংস, ডিম ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে হবে। কাঁচা দুধ খাওয়া যাবে না। খাওয়ার আগে ফলমূল এবং রান্নার আগে সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।’
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে ঘরে থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, সর্বদা মুখে মাস্ক পরে থাকা, সাবান পানি দিয়ে বারবার ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া, বাইরে গেলে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার, বেশি-বেশি পানি ও তরল জাতীয় খাবার, ভিটামিন সি এবং ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, ডিম, মাছ, মাংস, টাটকা ফলমূল ও সবজি খাওয়াসহ শরীরকে ফিট রাখতে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ-নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়।
তিনি বলেন, ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ তা অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে।