আদিত্য আচার্য রুদ্র
বিশেষ ফিচার
ভিনিউজ : ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের জন্য নয়, আর্থিক সাফল্যের দিক থেকেও ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ, ১০৪টি ম্যাচ, তিনটি স্বাগতিক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এবং বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব দর্শক আগ্রহ এই আসরকে পরিণত করেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে লাভজনক টুর্নামেন্টে। রেকর্ড সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও বাণিজ্যিক আয়ের ফলে ফিফা শুধু বিপুল অর্থ উপার্জনই করেনি, একই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তিও তৈরি করেছে।
ফিফার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৬ চক্রে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বড় অংশ এসেছে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। এছাড়া বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি, আতিথেয়তা খাত, বৈশ্বিক স্পনসরশিপ, বিপণন ও লাইসেন্সিং থেকেও এসেছে বিপুল রাজস্ব। আয়োজন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, প্রশাসন, পুরস্কার এবং অবকাঠামো উন্নয়নে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় সত্ত্বেও ফিফা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে পৌঁছেছে।

এই বিশ্বকাপেই দেখা গেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পুরস্কার তহবিল। শুরুতে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে মোট ৮৭১ মিলিয়ন ডলার করা হয়। প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দলকে প্রস্তুতি বাবদ ২.৫ মিলিয়ন ডলার এবং গ্রুপ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেই একটি দেশের ফুটবল সংস্থা নিশ্চিতভাবে মোট ১২.৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে।
এই হিসাবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশ—আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, কোস্টারিকা, পানামা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, নিউজিল্যান্ড, সেনেগাল, মরক্কো, মিশর, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকা, তিউনিসিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, চেক প্রজাতন্ত্র ও ইউক্রেন—প্রত্যেকেই ন্যূনতম ১২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে নিশ্চিত অর্থ পেয়েছে।
তবে নকআউট পর্বে যত এগিয়েছে, তত বেড়েছে পুরস্কারের অঙ্ক। রাউন্ড অব ৩২-এ উঠে বিদায় নেওয়া দলগুলো পেয়েছে ১১ মিলিয়ন ডলার, রাউন্ড অব ১৬-এ পৌঁছানো দলগুলো ১৫ মিলিয়ন ডলার, কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলগুলো ১৯ মিলিয়ন ডলার করে পেয়েছে। চতুর্থ স্থান অধিকারী দল পেয়েছে ২৭ মিলিয়ন ডলার, তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল ২৯ মিলিয়ন ডলার, রানার্সআপ ৩৩ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছে ৫০ মিলিয়ন ডলার। প্রস্তুতি ভাতা যোগ করলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের ফুটবল সংস্থা মোট ৫২.৫ মিলিয়ন ডলার এবং রানার্সআপ দল ৩৫.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্জন করেছে।
বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ কেবল পুরস্কার হিসেবেই বিতরণ করা হয় না। ফিফা জানিয়েছে, আয়ের বড় অংশ বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোকে অনুদান প্রদান, নতুন স্টেডিয়াম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ, নারী ফুটবলের প্রসার, যুব ও বয়সভিত্তিক ফুটবল উন্নয়ন, কোচ ও রেফারিদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও VAR ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচিতে এই অর্থ ব্যয় করা হয়।
এই উন্নয়ন কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে FIFA Forward Programme। আফ্রিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল ফুটবল দেশগুলোর জন্য এই কর্মসূচি এখন জীবনরেখার মতো কাজ করছে। তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল বিস্তার, নারী ফুটবলের বিকাশ, জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ আরেকবার প্রমাণ করেছে যে ফুটবল এখন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাই নয়, এটি একটি বিশাল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শিল্প। রেকর্ড আয়, ইতিহাসের সর্বোচ্চ পুরস্কার এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে ফিফা বিশ্ব ফুটবলকে আরও বিস্তৃত ও প্রতিযোগিতামূলক করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক স্মরণীয় মাইলফলক হিসেবেই ইতিহাসে স্থান করে নেবে।




