২০১৯ : বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঝড়-ঝঞ্ঝার বছর

Social Share

আর একদিন বাকী আছে ২০১৯ সালেই। বছর শেষের সময়ে দেশের ক্রিকেটের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ এক সময়কাল। ক্রিকেটারদের বাজে পারফর্মেন্স, বোর্ড কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়ানো, ক্রিকেটারদের বিদ্রোহ, সাকিব আল হাসানের নিষিদ্ধ হওয়াসহ নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছে দেশের ক্রিকেট। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এটা যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের পিছিয়ে পড়ার বছর।

পারফর্মেন্স

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রত্যাশিত সাফল্য বাদ দিলে বছর জুড়ে মাঠ থেকে কেবল হতাশাই দিয়েছে বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ওই টুর্নামেন্টে প্রথম কোনো শিরোপা জিতে নেয় টাইগাররা। বছরের শুরুটাই হয়েছিল বাজেভাবে। বছরের শুরুতে নিউ জিল্যান্ডে তিন ওয়ানডে ও দুই টেস্টের সবকটি হারে বাংলাদেশ। সেই সফরে সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়ায় পারফর্মেন্স অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। এরপর আসে বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দুর্দান্ত শুরু করলেও চরম বাজে পারফর্মেন্সে টুর্নামেন্ট শেষ করে বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপে একমাত্র উজ্জ্বল ক্রিকেটারটি ছিলেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপের পরপর শ্রীলঙ্কা সফরে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশড হতে হয় বাংলাদেশকে। সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচটি সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচে বাজে ম্যাচ। টেস্টের নবীন দলের বিপক্ষে ঘরের মাঠে বিশাল ব্যবধানে টেস্ট হারে বাংলাদেশ! বারবার বৃষ্টি এলেও বাজে ব্যাটিংয়ে ড্র করতে পারেনি। রশিদ খান বলেকয়ে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দেন! এরপর ভারত সফর।

টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জিতে শুরুটা দারুণ হলেও, শেষটা হয় টেস্টে লজ্জাজনক পারফর্মেন্স দিয়ে। এমনকী ঐতিহাসিক দিবা-রাত্রির টেস্টেও মাত্র ২ দিন ৪৫ মিনিটে হারে বাংলাদেশ! সব মিলিয়ে এই বছরে ৫ টেস্ট খেলে সবকটি হেরেছে বাংলাদেশ, ১৮ ওয়ানডেতে জয় কেবল ৮টি, সাত টি-টোয়েন্টিতে জয় ৪টি। গত ৭ বছরে এই প্রথমবার বাংলাদেশ বছরের সব টেস্টে হার মানে। ৪ বছর পর ওয়ানডেতে ১০টির বেশি ম্যাচে হারের তেতো স্বাদ ফিরে পায় লাল-সবুজের দল। পারফর্মেন্সের দিক দিয়ে খুব খারাপ একটা বছর পার করল নতুন-পুরাতন তারকায় ভরা বাংলাদেশ।

সমালোচনায় বিদ্ধ বিসিবি

২০১৯ সালে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের দ্বারা জাতীয় দলের একাদশ ঠিক করার মতো অদ্ভুত ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এই নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় বিশ্বকাপের পর চাকরি হারান প্রধান কোচ স্টিভ রোডস। এছাড়া ম্যাচের আগে প্রিভিউ এবং ম্যাচের পর রিভিউ নিয়ে গণমাধ্যের সামনে এসে সমালোচিত হন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন। আগের বছরের ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিরোধ হওয়ায় বিসিবি ঘোষণা দেয় বিশেষ বিপিএল আয়োজনের। সব ফ্র্যাঞ্চাইজি রাখা হয় বিসিবির ব্যবস্থাপনায়। কিন্তু দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয় বিপিএল থেকে! টুর্নামেন্টের মাঝামাঝি সময়েও এখন দর্শক পাচ্ছে না জমজমাট ঘরোয়া টুর্নামেন্টটি।

এর মাঝে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন বিসিবির কর্মকর্তারা। যাদের মধ্যে বোর্ড পরিচালক লোকমান হোসেন এখন জেলে আছেন। যার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিসিবি। বরং বোর্ড প্রধান বলেছিলেন, ‘লোকমান কখনো মদ খায়নি, জুয়া খেলেনি।’ আরেক পরিচালক মাহবুব আনামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে ক্যাসিনো খেলতে যান খালেদ মাহমুদ সুজন। সেই ঘটনা ফাঁস হওয়ায় তিনি বলেছিলেন যে, ‘ক্যাসিনোতে খেতে গিয়েছিলাম।’ এছাড়াও বারবার জাতীয় দলের কোচ হতে চেয়ে হাস্যরসের জন্ম দেন খালেদ মাহমুদ।

ক্রিকেটারদের ধর্মঘট

বছরের শেষদিকে গত ২১ অক্টোবর ক্রিকেটারদের ধর্মঘট তোলপাড় ফেলে দেয় সারাবিশ্বে। এদিন মোট ৬০ জনের মতো ক্রিকেটার মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। এই ধর্মঘটের নেতৃত্বে ছিলেন সাকিব আল হাসান। তিনিসহ বাকী ক্রিকেটাররা ১১ দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলোর বেশির ভাগই ছিল মৌলিক এবং যৌক্তিক ছিল। একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশে এমনিতেই এসব সুবিধা থাকার কথা। কিন্তু মৌলিক সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য সাকিবদের আন্দোলন করতে হয়েছিল।

দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ক্রিকেটারদের প্রাপ্য সম্মানী দেওয়া, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, ম্যাচ ফি ও ভাতা বাড়ানো, ঘরোয়া ক্রিকেটের সংস্কৃতি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিপিএল ও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে পারিশ্রমিক বাড়ানো, আম্পায়ারিংয়ের মানোন্নয়ন, টুর্নামেন্ট বাড়ানো ইত্যাদি। এরপর মারমুখী মেজাজে সংবাদ সম্মেলন করে ধর্মঘটকে ‘অযৌক্তিক’ বলেন বিসবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক করে বিসিবি সব দাবি মেনে নেওয়ার পর অবসান হয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের ধর্মঘটের। উল্লেখ্য, এই আন্দোলনে মাশরাফি বিন মুর্তজাকে যুক্ত করেননি ক্রিকেটাররা।

সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞা

২০১৯ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেট তথা বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি হলো বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার সাকিব আল হাসানের ওপর আইসিসির ২ বছরের (এক বছর স্থগিত) নিষেধাজ্ঞা। ভারতীয় বুকি দীপক আগরওয়ালের থেকে একাধিকবার ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু একবারও তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বারবার প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি সাকিব আইসিসি কিংবা বিসিবিকে জানাননি। আইসিসির আইন অনুযায়ী, কোনো ক্রিকেটার ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সেটা দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে জানাতে হবে। এসময় সেই বুকির সঙ্গে সাকিবের চ্যাটিংয়ের কিছু স্ক্রিনশটও ফাঁস হয়, যেগুলো বেশ আপত্তিকর ছিল।

কাকতালীয় কিনা বলা মুশকিল যে, ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের পরেই ঘটেছিল সাকিবকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা। ধর্মঘট নিয়ে মারমুখী সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড প্রধান নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন, তার কাছে ফিক্সিংয়ের খবর আছে। খুব দ্রুতই তা প্রকাশ হবে। এ কারণে দেশের সিংহভাগ ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন পর্যন্ত ধারণা করে যে, বোর্ড প্রধানের কোপে পড়েছেন সাকিব। যদিও বিষয়টি আইসিসি নিয়ন্ত্রণ করেছে। শেষ পর্যন্ত বিসিবি প্রধানকে পাশে রেখে আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে সাকিব নিজের দোষ স্বীকার করে নেন। এভাবেই অবসান হয় ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার।