হোয়াইট হাউজে বাইডেন: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নাকি প্রতিবন্ধক

49
Social Share

ডেস্ক রিপোর্ট: নজিরবিহীন তিক্ততার ভেতর দিয়ে বুধবার আমেরিকায় ক্ষমতার রদবদল হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নিচ্ছেন এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিচ্ছেন জো বাইডেন। কিন্তু বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকায় এই ক্ষমতার রদবদলের কোনো প্রভাব আদৌ কি বাংলাদেশের ওপর পড়বে? বিবিসি বাংলাকে এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির এবং যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটির অধ্যাপক মেহনাজ মোমেন।

দুই বিশ্লেষকই মনে করেন বাংলাদেশের মত দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে আমেরিকার নতুন প্রশাসনের সম্পর্ক কী দাঁড়াবে তার অনেকটাই নির্ভর করবে চীনের সাথে জো বাইডেন কী ধরণের সম্পর্ক চান তার ওপর।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ”বাংলাদেশের জন্য আমেরিকার নতুন সরকার সুযোগ হিসাবে দেখা দেবে নাকি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে – তা মূলত নির্ভর করছে এই সরকার চীনের সাথে কি ধরনের সম্পর্ক চায় তার ওপর।”

তিনি বলেন, ট্রাম্প সরকার চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এক ধরনের ”যুদ্ধংদেহী” আচরণ শুরু করেছিল। ”আমার ধারণা জো বাইডেন চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা আনার চেষ্টা করবেন। এটিকে তিনি মূলত অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিতে চাইবেন। চীনের প্রতিবেশীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার চেষ্টা করবেন।”

মি. কবির বলেন, জো বাইডেন সেই কৌশল নিলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হবে, আমেরিকার সাথে ব্যবসায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু একই সাথে কিছুটা চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশের সরকারের জন্য হাজির হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ”ট্রাম্প বিশ্বের অন্যত্র গণতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাননি। আমরা ধারণা জো বাইডেন গণতন্ত্র নিয়ে বেশি মনোযোগী হবেন। সেখানে আমাদের বাড়তি কাজের প্রয়োজন হতে পারে।”

গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা আপত্তি-উদ্বেগ রয়েছে। এই বিষয়ে আমেরিকার খবরদারি, নজরদারি কি বাড়তে পারে?

অধ্যাপক মেহনাজ মোমেন বলেন, এটা ঠিক যে ডেমোক্র্যাটরা সবসময়ই গণতন্ত্র বা মানবাধিকার নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়, কিন্তু জো বাইডেনের সামনে এই মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি।

জো বাইডেন হয়তো বাণিজ্যকে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি করতে চাইবেন
জো বাইডেন হয়তো বাণিজ্যকে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি করতে চাইবেন

”আমেরিকার ভেতরেই এখন বাক-স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যেভাবে তাদের ক্ষমতা এবং প্রভাব দেখাচ্ছে তাতে এই বিতর্ক বাড়তেই থাকবে।” এই অবস্থায় বাইরের বিশ্বে গণতন্ত্র বা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে জো বাইডেন কতটা নজর দিতে পারবেন বা সেই খবরদারির নৈতিক অধিকার কতটুকু তার প্রশাসনের থাকবে তা নিয়ে আমেরিকার ভেতরেই অনেক কথাবার্তা চলছে।

অধ্যাপক মোমেন মনে করেন, বাংলাদেশ-সহ বাইরের বিশ্বের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে ”অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক।” চীনের সাথে যে প্রতিযোগিতা জো বাইডেন চাইবেন তা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। সুতরাং দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে জোট তৈরির একটি চেষ্টা হয়তো তিনি করবেন। বাংলাদেশ তাতে হয়ত সুবিধা পাবে।

1px transparent line

রোহিঙ্গা সংকট এবং জো বাইডেন

অধ্যাপক মোমেন বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে জো বাইডেন সরকার ততটা মনোযোগ না দিলেও, রোহিঙ্গা সমস্যার মত কিছু ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে।

”বৈদেশিক সহযোগিতার বিষয়টি ট্রাম্পের সময়ে যেভাবে গুরুত্ব হারিয়েছে তাতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে মিয়ানমারের ওপর যে শক্ত চাপ তৈরির প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। সেই অবস্থার ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন হতে পারে।”

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে কি সত্যিই জো বাইডেন বেশি গুরুত্ব দেবেন? হুমায়ুন কবির মনে করেন, এই প্রশ্নের সহজ জবাব নেই। তবে, তিনি বলেন, পররাষ্ট্র দপ্তরে এবং জাতীয় নিরাপত্তা স্তরে এমন কিছু লোক জো বাইডেন নিয়োগে করেছেন যারা দক্ষিণ এশিয়াকে ভালো জানেন।

”জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগে এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের দায়িত্ব যিনি পাচ্ছেন সেই কার্ট ক্যাম্পবেল এই অঞ্চল সম্পর্কে খুবই ওয়াকিবহাল।. তাছাড়া, মিয়ানমারের গণতন্ত্রের পথে যে যাত্রা তা কিন্তু ওবামা প্রশাসনের সময় শুরু হয়েছিল। মি ওবামা মিয়ানমারে সফরও করেছিলেন। সেসব পুরনো যোগাযোগ পুন:প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

মি. কবির বলেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি ওয়াশিংটনে নতুন সরকারের সাথে ঠিকমত কূটনৈতিক দেন-দরবার করতে পারে, তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুবিধা হতে পারে। ”কার্যকরী চাপ তৈরির ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, যদি তারা এ ব্যাপারে মনোযোগী হয়।” তবে এ ব্যাপারে জটিলতাও রয়েছে বলে মনে করেন হুমায়ুন কবির, এবং তার কারণ চীন। ”যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি করলে, চীনের জন্য তা স্পর্শকাতর হতে পারে। ইতিমধ্যেই চীনের সাথে বাংলাদেশ এ নিয়ে কথা বলছে। আমি যতদূর জানি এ নিয়ে দুদিন পরই একটি ত্রি-পক্ষীয় বৈঠক হবে। ফলে বিষয়টি খুব সহজ নয়।”

”যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনকে যদি এক প্লাটফর্মে আনা যায়, তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়। তার জন্য প্রয়োজন ধারালো বিচক্ষণ কূটনীতি।”

বাংলাদেশে আল কায়দা

ইসলামী জঙ্গিবাদ নিয়ে বিদায়ী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেরও সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ এবং ক্রোধ তৈরি হয়েছে।

বিদায়ী মারকিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। বাংলাদেশে আল কায়দার তৎপরতার ঝুঁকি নিয়ে তার এক বক্তব্যে ঢাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে
বিদায়ী মারকিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। বাংলাদেশে আল কায়দার তৎপরতার ঝুঁকি নিয়ে তার এক বক্তব্যে ঢাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে

১২ জানুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে বিশ্বের কটি দেশে আল কায়দার তৎপরতা বিষয়ে এক বিবৃতিতে মি. পম্পেও বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশে আল কায়দার হামলা হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও সে সম্ভাবনা রয়েছে। সাথে সাথে তীব্র প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ। হঠাৎ এমন কথা কেন বললেন মি পম্পেও? এটা কি তার ব্যক্তিগত অভিমত নাকি আমেরিকার প্রশাসনও একই রকম ভাবে? বাইডেন প্রশাসনও বাংলাদেশে আল কায়দার ঝুঁকি নিয়ে একই মনোভাব পোষণ করতে পারে?

অধ্যাপক মেহনাজ মোমেন মনে করেন, বাংলাদেশে আল কায়দার তৎপরতার ঝুঁকি নিয়ে হয়তো আমেরিকার প্রশাসনের ভেতরও একইরকম মনোভাব পোষণ করে, এবং এই সন্দেহ জো বাইডেন প্রশাসনের মধ্যেও থাকতে পারে।

”বাইডেন প্রশাসনের চরিত্র হবে অনেকটা নিও লিবারেল ধরনের। এ ধরনের উদারপন্থীরা সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি একটু অতিরঞ্জিত করেন।”

হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশ যথার্থভাবেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছে, তবে তিনি বলেন, প্রতিবাদ করে বসে না থেকে বাংলাদেশের উচিৎ হবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা কেন মি পম্পেও এমন কথা বললেন।

”যদি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিশ্লেষণের সূত্রে মি. পম্পেও এ কথা বলেন, তাহলে তাদের সাথে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ করে বুঝতে হবে তাদের এই উদ্বেগের ভিত্তি কী। সমস্যা থাকলে কিভাবে তা সমাধান করা যেতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যখন এমন কথা বলে তখন সারা বিশ্বে তা দ্রুত ছড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক একটি ধারণা তৈরি হয়।”কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র – তা সেই যে প্রশাসনই সেদেশে আসুক না কেন- কতটা গুরুত্ব দেয়?

অধ্যাপক মোমেন মনে করেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ”গত ২০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যেভাবে হয়েছে তা নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তৈরি পোশাক আমেরিকাতে রপ্তানি হয়। তবে বাংলাদেশ কতটা গুরুত্ব পাবে, মাত্রা কী হবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে চীন-মার্কিন সম্পর্কের ওপর।”

”ট্রাম্পের সময় আমরা যে হার্ড পাওয়ার দেখেছি সেটা যদি সফট পাওয়ারে রূপান্তরিত হয়, জো বাইডেন যদি চীনের প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে চীনকে চাপে রাখার কৌশল নেন, তাহলে বাংলাদেশ হয়ত গুরুত্ব পাবে।”

হুমায়ুন কবিরও এ নিয়ে একমত। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাতে, তার ভাষায়, ”আমাদের দিক থেকেও বাড়তি কিছু উদ্যোগ লাগবে।”