হেলসের তাণ্ডব রুশোর প্রলয়

বিপিএল আকাশের ঈশান কোণে অদৃশ্য মেঘকালিতে লেখা ছিল দুটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম—ক্রিস গেইল ও এবি ডি ভিলিয়ার্স। কিন্তু নৈঋত থেকে যে দৃশ্যমান হবে অ্যালেক্স হেলস ও রাইলি রুশো নামের দুই সাইক্লোন, কজন ভেবেছিলেন! টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরিই যখন হয় কালেভদ্রে, সেখানে কিনা কাল এক ইনিংসেই হয়ে গেল দুটি সেঞ্চুরি!

এরপর আর ম্যাচের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে কিভাবে! রংপুর রাইডার্সের আগুনরথে জ্বলেপুড়ে ছাই চিটাগং ভাইকিংস। স্বাগতিকদের বিপক্ষে ৭২ রানের জয়ে সেরা চারে ওঠার দৌড়ে প্রবলভাবে রইল তাই বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ৯ ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের চার নম্বরে এখন রংপুর। ঢাকা ডায়নামাইটস ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের পয়েন্টও ১০; তবে তারা একটি করে ম্যাচ কম খেলেছে। আর হার সত্ত্বেও আট খেলায় ১২ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলশীর্ষে চিটাগং ভাইকিংস।

গেইল ও ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটে অমন টর্নেডো ইনিংসের প্রত্যাশায় বাড়াবাড়ি ছিল না। বিশেষত ক্যারিবিয়ান দানবের কাছে। রংপুর রাইডার্সের জার্সিতে এই বিপিএলে তাঁর শুরু ঢিমেতালে। ১, ৮, ২৩, ৭, ০ রানের পর সর্বশেষ ম্যাচে ৫৫ রান করে যেন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বড় কিছুর। কত দিন আর ঘুমন্ত দৈত্য হয়ে থাকবেন গেইল! কিন্তু কালও তো তাঁর বুনো ব্যাটের ঘুম ভাঙে না। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ছয় বলে ২ রান করে এলবিডাব্লিউ।

ডি ভিলিয়ার্সের বিপিএলে যাত্রা শুরু হয়েছে পরে। সর্বশেষ দুই ম্যাচ খেলে খারাপ করেননি। তবে ওই ৩৪, ৪১ রানে কি আর দর্শকদের প্রত্যাশার খোরাক মেটে! চট্টগ্রামেই তাই ‘৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটসম্যানের’ বারুদে বিস্ফোরণের আশা ছিল। কিন্তু গেইলের মতো ডি ডিভিয়ার্সও তা মেটাতে ব্যর্থ। প্রথম বলে ১ রান নিয়ে পরের বলেই আউট কাল।

তাতে রংপুর রাইডার্সের রথযাত্রার গতি রোধ হয় না। ডানা লাগিয়ে ছোটে তা হেলস-রুশোর ব্যাটের তাণ্ডবে। চারের ফুলঝুরিতে, ছক্কার প্রলয়নৃত্যে মাত্র ৪৭ বলে সেঞ্চুরি ইংলিশ ব্যাটসম্যানের। আর প্রোটিয়া রানমেশিন ৫১ বলে জাদুকরী তিন অঙ্কে পৌঁছে থাকেন অপরাজিত। বিপিএলে যে কখনো এক ইনিংসে দুই সেঞ্চুরি হয়নি, তা বলাই বাহুল্য। বিশ্বজোড়া টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেই তো অমন উদাহরণ মোটে দুটি। ২০১১ সালে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে মিডলসেক্সের বিপক্ষে গ্লুস্টারশায়ারের হয়ে কেভিন ও’ব্রায়েন ও হামিশ মার্শালের প্রথম সে কীর্তি। ২০১৬ সালে ভারতের আইপিএলে রয়্যাল  চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে বিরাট কোহলি ও ডি ভিলিয়ার্সের এর পুনরাবৃত্তি।

কাল রেকর্ড বইয়ের খুব বিশেষ এক পাতায় তাই জায়গা করে নেন হেলস-রুশো।

রেকর্ড বইয়ে ধুলো ঝাড়পোছ কাল করতে হয় আরো। রংপুর রাইডার্সের চার উইকেটে ২৩৯ রান এবারের আসর তো বটেই, সব মিলিয়েই বিপিএলের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। এর আগের সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ছিল ২০১৩ সালে রংপুরের বিপক্ষে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের চার উইকেটে ২১৭ রান। আর এ আসরের সর্বোচ্চ সিলেটে খুলনা টাইটানসের বিপক্ষে চিটাগং ভাইকিংসের চার উইকেটে ২১৪। ওগুলোকে পেছনে ঠেলে এখন সবচেয়ে ওপরে, সবচেয়ে জ্বলজ্বলে কালকের রংপুর রাইডার্স ইনিংসের স্কোরকার্ড।

চিটাগং ভাইকিংসের আমন্ত্রণে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় ওভারে গেইলকে হারায় শিরোপাধারীরা। এরপরই হেলস-রুশোর ১৩ ওভারে ১৭৪ রানের জুটি। বিপিএলের এবারের আসরের সর্বোচ্চ রানের সেতু তা, সব মিলিয়ে তৃতীয়। মাত্র ৪৭ বলে ১১টি চার এবং পাঁচ ছক্কায় সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ হেলসের। ওই ৪৭তম বলটিতেই আউটের যা একটু সুযোগ দেন। কিন্তু ওয়াইড লং অনে ক্যাচ মুঠোবন্দি করতে না পারলে ২ রান নিয়ে তিন অঙ্কে পৌঁছে যান তিনি। পরের বলে আউট হয়ে ইনিংস বাড়াতে পারেননি। তবে উইকেটে ডি ভিলিয়ার্স আসায় চিটাগং ভাইকিংসের দুর্দশা শেষ না হওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

প্রোটিয়া দানো সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি। তবে তাণ্ডবের রাজদণ্ড হেলসের কাছ থেকে তুলে নেয় রুশোর ব্যাট। ফিফটির পরপর একটি সুযোগ দিয়েছিলেন। তাতে বেঁচে গিয়ে প্রতিপক্ষ বোলারদের দুঃস্বপ্ন দীর্ঘায়িত করেন আরো। ইনিংসের শেষ ওভারে ১ রান নিয়ে নিজের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পেয়ে যান রুশো। ৫১ বলে আটটি চার এবং ছয় ছক্কায় ঠিক ১০০ রান করে থাকেন অপরাজিত।

চার উইকেটে ২৩৯ রান—রংপুর রাইডার্সের এ বিশাল রানপর্বত টপকানোর সাধ্যি স্বাগতিকদের ছিল না। তা মোহাম্মদ শেহজাদ যতই প্রথম ওভারে ছক্কা মারুন কিংবা মুশফিকুর রহিম চার বলের মধ্যে তিন ছক্কা মারেন শফিউল ইসলামকে। ২০ ও ২২ করে আটকে যান তাঁরা। ওপেনার ইয়াসির আলীর ৪৮ বলে ৭৮ রানের ইনিংসটি হয়ে থাকে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধার লড়াই। আট উইকেটে ১৬৭ রানে থেমে পাঁচ ম্যাচ পর হার মেনে নিতে হয় চিটাগং ভাইকিংসকে।

তবে বহু বছর পরও চট্টগ্রামের এই দিনটি নিয়ে আলোচনা হবে যখন, তখন ম্যাচের ফল হয়ে যাবে গৌণ। ঈশানের অদৃশ্য দুই ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও কেউ বলবে না হয়তো। নৈঋতের দুই দৃশ্যমান সাইক্লোন নিয়েই আড্ডা হবে শুধু। যে জোড়া সাইক্লোনের নাম অ্যালেক্স হেলস ও রাইলি রুশো!