হেফাজতে ইসলাম এর উৎস কোথায়? কেমন বাংলাদেশ চেয়েছে তারা?

79
Social Share

 

রাকিব হাসনাত

সাত বছর আগে ঢাকায় শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের এই বিশাল সমাবেশ অনেককেই বিস্মিত করেছিল কারণ মাদ্রাসা কিংবা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ঘরানার বাইরে হেফাজতে ইসলামের এমন শক্তি সম্পর্কে তখনো বহু মানুষের মধ্যে কোন ধারণাই ছিল না।

উন্নয়ন কর্মী সানজিদা রিপা তাদেরই একজন। তিনি বলছেন, ”২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে যা ঘটেছিল তার আগে হেফাজত ইসলামের নামে ইসলামি সংগঠন আছে তা শুনিনি। অন্যান্য ইসলামি সংগঠন বা ধর্মভিত্তিক সংগঠন আছে বা কার্যকলাপ আছে দেখেছি কিন্তু হেফাজত ইসলামের নাম শুনিনি। এরপর থেকেই দেখলাম তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে বা মাঠে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।”

অথচ এই হেফাজতে ইসলামই গত প্রায় আট বছর ধরে নানা ঘটনায় আলোচিত। সংগঠনটির ঘোষণা করা তের দফা কর্মসূচিও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সময়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
এসব দাবির মধ্যে ছিল ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে আইন করা, নারীদের পোশাকে বিশেষ করে হিজাব উদ্বুদ্ধ করা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতির কথিত ইসলাম বিরোধী ধারাগুলো বাদ দেয়া, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ভাস্কর্য বা মঙ্গল প্রদীপের মতো বিষয়গুলোর বিরোধিতা, নাটক সিনেমায় ধর্মীয় লেবাসের লোকজনের নেতিবাচক চরিত্র বন্ধ কিংবা কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবির মতো বিষয়গুলো।

তাদের তের দফার একটিতে বলা হয়েছে তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কতিপয় ব্লগার, নাস্তিক-মুরতাদ ও ইসলাম বিদ্বেষীদের সকল অপতৎপরতা ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। আর এটি এমন সময় করা হয়েছিলো যখন শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচি চলছিল।

এরপর থেকে গত প্রায় আট বছর ধরে নানা ঘটনায় নানাভাবে আলোচনায় থাকা হেফাজত আসলে এল কোথা থেকে বা এর উৎস কোথায়? সংগঠনটির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলছেন নিতান্ত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সংগঠনটি গঠন করেছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আহমদ শফী, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের স্বার্থ দেখা।

“২০১০ সালের দিকে দেশে ইসলামকে নিয়ে, আল্লাহ রাসুলকে নিয়ে কটূক্তিসহ বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছিলো অনলাইনে। তখন ওলামায়ে কেরামরা বললেন যে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম করা দরকার যাতে ইসলাম বিরোধী কাজ একসাথে প্রতিরোধ করতে পারি। এটা অরাজনৈতিক থাকবে এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছিল।” মি. ইদ্রিস অনলাইনে ইসলাম বিদ্বেষী লেখালেখির পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে হেফাজতের আগমনের কারণ বা উৎস হিসেবে উল্লেখ করলেও ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মোহাম্মদ অবশ্য বলছেন ২০১০ সালে বর্তমান হেফাজত যাত্রা শুরু করলেও ভিন্ন ভিন্ন নামে এই ধারার সূচনা হয়েছে আরও অনেক আগেই।

“কওমি মাদ্রাসার আলেমদের প্রধান স্রোত-বিভিন্ন ইস্যুতে তারা নানা প্লাটফর্ম করেছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ছিল। তাসলিমা নাসরিন ইস্যুতে হয়েছে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পরেও হয়েছে। একইভাবে ২০০১ সালে ফতোয়া-বিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য ইসলামি আইন বাস্তবায়ন কমিটি হয়েছিল। ২০১১ সালে নারী নীতি প্রণয়নের বিরুদ্ধে হরতাল আন্দোলন ছিল। ওই সময় হেফাজতের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও তারা জাতীয়ভাবে ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে ২০১৩ সালে।”

মূলত এনজিও, নারী বিষয়ক বিভিন্ন ইস্যু কিংবা ধর্ম অবমাননার ইস্যুতে নানা নামে কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এ ধারাটি অনেক কাল ধরেই সামনে এসেছে বিভিন্ন ভাবে। ১৯৯৪ সালে তাসলিমা নাসরিন ইস্যুতে বড় ভাবে সংগঠিত হয়ে ব্যাপক শক্তি প্রদর্শন করলেও তা পরে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি তারা।

যদিও মূলত এ ঘটনার জের ধরেই তাসলিমা নাসরিনকে দেশ ছাড়তে হয়। এছাড়া লেখক সালমান রুশদীর লেখায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এবং পরে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনায় পুরো বাংলাদেশ জুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনগুলো। পরবর্তীতে ফতোয়ার মাধ্যমে নারী নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নারী সংগঠনগুলোর সোচ্চার হওয়ার বিপরীতে সারাদেশে নতুন করে সংগঠিত হয়েছিলো কওমি ধারার সংগঠনগুলো।

বিশেষ করে ফতোয়া নিয়ে আদালতের রায় নিয়ে বেশ সোচ্চার হয়েছিল খতমে নবুয়ত আন্দোলনের মতো সংগঠনগুলো। ধর্ম অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করে তারা মাদ্রাসাগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিল নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে গত দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। তবে ইসলামপন্থী এ ধারাটির এমন সক্রিয় কর্মকাণ্ডের ইতিহাস আরও অনেক প্রাচীন। বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে সোচ্চার হওয়ার এ ধারা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ খেলাফত আন্দোলন, কিংবা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকেই ধর্ম অবমাননা বিরোধী আন্দোলন।

বিবিসি