হেফাজতের তাণ্ডব: সংগঠন গোছানোর তাগিদ আ. লীগে

48
Social Share

হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক তাণ্ডবের পর খানিকটা টনক নড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি দপ্তর, স্থাপনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ঠেকানো যায়নি। এর পেছনে প্রশাসনের ব্যর্থতার পাশাপাশি সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও বড় কারণ মানছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এ কারণে এখন তাঁরা সংগঠন গোছানোয় গুরুত্ব দিচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ বিবাদ কমিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার তিন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব বদল করেছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। দলকে সংগঠিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত এসেছে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো।

শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন দলটির দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া। তিনি জানান, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনকে চট্টগ্রাম, আহমদ হোসেনকে সিলেট ও সাখাওয়াত হোসেন শফিককে রংপুর বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এত দিন চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন আহমদ হোসেন, সিলেট বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন শফিক। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পরিবর্তন করতে গিয়েই অন্য দুই বিভাগের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রথমে রংপুরের দায়িত্বে থাকা স্বপনকে চট্টগ্রামে ও চট্টগ্রামের দায়িত্বে থাকা আহমদ হোসেনকে রংপুরের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু পরে সে ভাবনার পরিবর্তন হয়। আহমদ হোসেন এর আগে সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকার সময়ে সেখানে বেশ ভালো কাজ করেছিলেন। সে জন্য তাঁকে আবারও সিলেট বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকা সাখাওয়াত হোসেনকে রংপুর বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ স্বপন এর আগে বিভিন্ন সময়ে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগ আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকার সময়ে বিভাগ দুটির বেশির ভাগ জেলা ও উপজেলার সম্মেলন আয়োজনে সক্ষম হন।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলাগুলোর মধ্যে আট-নয়টিতে তীব্র দলীয় কোন্দল রয়েছে। অন্যদিকে বেশ কয়েকটি জেলায় হেফাজতে ইসলামের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ফলে এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সবচেয়ে বেশি অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারছে হেফাজত। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিভাগে সংগঠন গোছানোয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্য বিভাগগুলোতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদেরও দল গোছাতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম যে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব চালিয়েছে, তা এ দেশের আপামর জনগণের মানসিক অবস্থানের প্রতিফলন নয়। দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি গোষ্ঠী হেফাজতকে মদদ দিচ্ছে। কোনো ছাড় না দিয়ে তাদের মোকাবেলা করা হবে।’

হেফাজতের তাণ্ডব মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে নানক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শক্তিশালী অবস্থানেই আছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত আছি। সতর্কভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি। যুদ্ধংদেহি না হয়ে ধৈর্য ধারণ করছি।’

তিন বিভাগে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব বদল প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দায়িত্ব বণ্টনের সময়ই কথা ছিল, যেকোনো সময় যে কারো দায়িত্ব পরিবর্তন করা হতে পারে। নিশ্চয়ই কোনো ভালো উদ্দেশ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময়ই দলকে শক্তিশালী করা, ঝালাই করা, তৃণমূলকে শক্তিশালী করার তাগিদ বোধ করে থাকি। সে জন্যই আওয়ামী লীগ অন্য দলের চেয়ে এগিয়ে থাকে।’

চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পাওয়ার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই বিভাগে দেশবিরোধী অপশক্তির যে চরম উত্থান ঘটেছে, তা বেশ উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এই চরমপন্থা মোকাবেলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে অধিকতর সংগঠিত করতে হবে। সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সব কিছুই বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং সব কিছুর জন্য টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। এই গুরুদায়িত্ব পালনে আমি সবার কাছে দোয়া চাই।’

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, দল গোছানোর কাজে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ দেয়নি আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সভাপতি বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের তাগিদ দিলেও বাস্তবে হয়েছে উল্টো। হাইব্রিড এবং বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে ভেড়া নেতাকর্মীরাই গুরুত্ব পাচ্ছেন। এসব নেতাকর্মী কোনো বিপদের আঁচ পেলেই নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। এসব কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও কিছু কিছু স্থানে দলের কার্যালয় কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙার মতো ঘটনা ঘটছে। এখনই দল গোছানো শুরু না করলে সামনে বড় বিপদ আসতে পারে।

এদিকে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে দলকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতারা। তাঁদের মতে, কয়েক বছর ধরে দলের নেতাদের চেয়েও প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। কিন্তু বিপদের সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ সহযোগিতা মিলছে না।

ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলার একজন আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাদের তো এখন দাম নেই। ডিসি (জেলা প্রশাসক) হলেন এখন জেলা আওয়ামী লীগের অঘোষিত সভাপতি এবং এসপি (পুলিশ সুপার) হলেন সাধারণ সম্পাদক। তাঁদের কথামতোই এখন আমাদের চলতে হয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সামনে বিপদ আছে।’

হেফাজতের সাম্প্রতিক তাণ্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা আওয়ামী লীগের এক মতবিনিময়সভায় জেলা সভাপতি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, ‘রবিবারের ঘটনার সময় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছি। ডিসি ও এসপির সহায়তা চেয়েছি। থানার ওসিকে ফোন করেছি। অ্যাকশনে যেতে বলেছি। আমি তো আর দারোগার ভূমিকায় নামতে পারি না। নাসিরনগরের হামলাসহ আগের ঘটনাগুলোতেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। কেন আনা হয়নি জানি না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, রবিবার হরতাল পালনের সময় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের ও আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ তাঁর (আল মামুনের) কার্যালয় ও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং গানপাউডার ছিটিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলার সব প্রমাণ রয়েছে। পৌরসভা থেকে ১০ হাত দূরে ফায়ার স্টেশন, কিন্তু আগুন নেভাতে তাদের কেউ আসেনি।

তিনি বলেন, ‘আমার অফিসে আমার সারা জীবনের অর্জনের বিভিন্ন নথিপত্র ছিল। সব তারা পুড়িয়ে ফেলেছে। কোনো দিন এসব আর ফেরত পাব না। আমি সরকারের কাছে জানতে চাই, কেন প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারল না? কেন তারা হামলাকারীদের ঠেকাতে পারল না? কেন প্রশাসনের এই নীরবতা?’