হুমায়ূন আহমেদ একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার

36
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: হুমায়ূন আহমেদ একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার। অসুস্থ ধারায় চলচ্চিত্রকে সুস্থ ধারায় ফিরিযে আনতে যে ক’জন স্বনামখ্যাত ব্যক্তিত্ব এদেশের চলচ্চিত্রে অত্যধিক প্রশংস কুড়িয়েছেন, নিজেদের অলক্ষ্যেই জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসপটে হুমায়ূন আহমেদ তাঁদেরই একজন। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা মোহনগঞ্জে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফয়েজুর রহমান আহমেদ, মাতা আয়েশা আক্তার। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ছোটবেলায় তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে অনার্সসহ মাস্টার্স করেন এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছেন পলিমার কেমিস্ট্রিতে গবেষণার জন্য।
‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাস দুটি দিয়ে তার যাত্রা শুরু সাহিত্য জগতে। উপন্যাস দুটি পাঠকপ্রিয়তা পেয়ে যায় দ্রুত। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো আগমন ঘটে তার। মধ্যবিত্ত ঘরে তিনি লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হবার মধ্য দিয়ে তিনি জনসম্মুখে নিজেকে প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে। এ কারণে তাঁকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রায় সমকালীন এক আখ্যানকাল বলা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক ১৯৮১তে তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান। ১৯৯৪ সালে পান সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৮-এর মধ্যে তাঁর উপন্যাস সমগ্রের দশম খ-ই শুধু প্রকাশিত হয়নি, তাঁর সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স ফিকশন সমগ্র’ এবং এক আশ্চর্য চরিত্র মিসির আলি’র আখ্যান নিয়ে ‘মিসির আলি অমনিবাস’। ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কবি’, ‘বাদশা নামদার’ ইত্যাদি কতো কতো উপন্যাস, যা পাঠকদের মনকে ছুঁয়ে গেছে।

বাকের ভাই: ‘কোথাও কেউ নেই’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্রের নাম বাকের ভাই। পরে এই উপন্যাসটি অবলম্বনে ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হয়। বিটিভিতে প্রচারিত হয় নাটকটি। বিটিভির ইতিহাসে আলোচিত কয়েকটি নাটকের একটি ‘কোথাও কেউ নেই’। একইভাবে এই নাটকে বাকের ভাই নাটকের ইতিহাসে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী চরিত্র। কোনো নাটকের চরিত্রকে কেন্দ্র করে এতো সাড়া কখনো এই দেশে পড়েনি। নাটকে বাকের ভাইকে যখন ফাঁসি দেওয়া হবে, সে সময়ে ঢাকাসহ দেশে বেশ কয়েকটি স্থানে মিছিল পর্যন্ত হয়েছিলো। বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পান আসাদুজ্জামান নূর। আজও এদেশের নাটকপ্রেমীরা মনে রেখেছেন বাকের ভাই চরিত্রটিকে। আসাদুজ্জামান নূর এ বিষয়ে বলেন, “আমার অভিনয় জীবনের সেরা একটি কাজ ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি। হুমায়ূন আহমেদ নিখুঁতভাবে বাকের ভাই চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন।”

একাধিক কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে দূরদর্শন চিত্র এবং নাটক। তাঁর পরিচালিত ছবি ‘আগুনের পরশমণি’ শ্রেষ্ঠ ছবিসহ ৮টি শাখায় পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সম্মানীত হয়েছেন শিশু একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক, অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদকসহ আরও বহু পুরস্কারে। এছাড়াও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, দারুচিনি দ্বীপের নায়িকা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, চন্দ্রকথা, আমার আছে, জলছবি প্রভৃতি। ২০ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও তিনি অসংখ্য নাটক পরিচালনা, রচনাসহ গান, কবিতা, গল্প, রচনায় সচেষ্ট রয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী শাওন আহমেদ। তিনি একজন জনপ্রিয় নাট্যভিনেত্রী, গায়িকা এবং নাট্য পরিচালক। হুমায়ূন আহমেদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলের গর্বিত পিতা। ভবিষ্যতে তিনি আরও মনে রাখার মতো দর্শক নন্দিত নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস উপহার দেয়ার জন্য দর্শক তাকে মনে রাখবে চিরদিন।

২০১১ সালে তাঁর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। দেশ ও দেশের বাইরে অনেক চিকিৎসার পরও সুস্থ হয়ে ওঠেননি হুমায়ূন আহমেদে। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান কিংবদন্তি এই কথাসাহিত্যিক। নুহাশপল্লীর লিচুতলায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।