স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধুর ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

59
Social Share

ড. একে আবদুল মোমেন:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি প্রত্যয়; একটি আদর্শ, একটি দর্শন, একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্যাতিতের আলো, মানুষের ভালোবাসা, বাংলার সবুজ জমিনে এক সাগর রক্ত, একটি সফল বিপ্লব, অতঃপর একটি দেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম। বহু সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যেতে বাধ্য হলো, পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ। তবে তাতে স্বস্তির চেয়ে যন্ত্রণা বাড়ল বাংলাদেশের। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রেই শুরু হলো শোষণ আর বঞ্চনা। এরপর বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় নেতৃত্বে রাজনৈতিক নানা ঘটনার বাক-পরিক্রমায় একাত্তরে বাংলাদেশ পেল লাল-সবুজের নতুন পতাকা, বিশ্ব অভ্যুদয়ে নতুন পরিচিতি এলো স্বাধীন বাংলাদেশের। নতুন বাংলাদেশ গঠনের শুরুতেই সবার সঙ্গে সুসম্পর্ককে প্রাধান্য দিলেন জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। আর পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের প্রতি জুলুম-নির্যাতনের প্রতিরোধের আন্দোলনে তিনি তো সম্মুখযোদ্ধা। এমন অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু সবসময় শান্তিপূর্ণ আইনানুগ সমাধানের নীতি গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সারা জীবনই ছিলেন অহিংস, মানবপ্রেমী, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর শান্তিপ্রিয়। তিনি চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো জোট নয়, বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ দেশ, হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। সবার সঙ্গে আন্তরিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ, অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমতা, ভৌগোলিক অখ-তা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করলেন। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে প্রতিবেশী ভারত সর্বোতভাবে সাহায্য করে। ভারতের বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের জন্য বারবার ভেটো দিয়েছে। অপরপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমাদের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে গণহত্যায় সাহায্য করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র- সোভিয়েত ইউনিয়েনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না। এমন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কোনো ব্লকের অনুসারী না হয়ে ‘জোটনিরপেক্ষ’ জোটে সদস্যপদ অর্জন এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এমন পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করলেন, যা আজও বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি ও মূলমন্ত্র।
বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো সংবিধানের ২৫নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে-
(ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন;
(খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং
(গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।
ভারসাম্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যাশিত সহযোগিতা মেলেনি চীনের কাছ থেকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুপ্রতীম দেশ এখন চীন। এর অর্থ হচ্ছে দেশের স্বার্থে কূটনৈতিকপাড়ায় কোনো রাষ্ট্র চিরকালীন বন্ধু বা শত্রু নয়। এ যাবৎকালে বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগীদের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে চীন। আবার মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে ভারত। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, শরণার্থীদের আশ্রয়দানসহ সম্মুখ সমরে ভারতের অনেক সৈন্যও প্রাণ হারায় অর্থাৎ নানাভাবেই ভারতের সহযোগিতা সবসময় মনে রাখবে বাংলাদেশ। এমনকি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও পুনর্গঠনে ভারতের কাছ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছিল বাংলাদেশ। এদিকে ভারত ও চীনের বৈরী সম্পর্কের কথাও কারও অজানা নয়। তা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশ দুটির সঙ্গে সমানতালে চমৎকার সম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এটি সম্ভব হয়েছে দেশরতœ শেখ হাসিনার ভারসাম্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্যই।


সবসময়ের বন্ধু ভারত : মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তার পরিকল্পনা ছিল সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লিতে ফিরে বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ভারতের শক্তিশালী অবদানের কথা। বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের ভ্রাতৃত্ববন্ধন চিরকাল অটুট থাকবে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নীতির মিল প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা হচ্ছে আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের মিল।’ তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি অন্ধভাবে ভারতের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। তা বোঝা যায় লন্ডন থেকে বাংলাদেশে তার প্রথম যাত্রা দিয়েই। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লন্ডন হয়ে দিল্লিতে আসেন। এই যাত্রায় তিনি বিনয়ের সঙ্গে ভারতীয় বিমান ব্যবহারের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে ব্রিটিশ বিমান ব্যবহার করেন।


বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি শুধু উদারই নয়, তা স্বাধীন ও বলিষ্ঠও বটে। তার প্রমাণ মেলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাসখানেক পরই। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বঙ্গবন্ধু প্রথম সরকারি সফরে যান। ৬ ফেব্রুয়ারি তার সম্মানে দেওয়া এক নাগরিক সংবর্ধনায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সুস্পষ্ট প্রশ্ন করে জিজ্ঞাসা করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় যেসব সৈন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তারা কবে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহৃত হবে।’ এর প্রত্যুত্তরে সমালোচকরা আশা করেছিল, ভারত হয়তো বাংলাদেশের ওপর নাখোশ হবে, সৈন্যদের অবস্থান দীর্ঘায়িত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে ভারত। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী স্বভাবসুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেই বঙ্গবন্ধুর এমন আহ্বানকে স্বাগত জানান। পরবর্তী সময়ে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আগেই ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহৃত করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম দেশই আছে যেখানে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদেশি বিজিত সৈন্য বিদায় নেয় এবং এ সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের জন্য। আর ইন্দিরা গান্ধী ১৭-১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা আর সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার বিষয়ে দুই দেশের একমত হওয়ার ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের বড় সাফল্য। এতে বলা হয়, এক দেশ আরেক দেশের স্বাধীনতা আর আঞ্চলিক অখ-তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কোনো দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। কোনো দেশই কারও প্রতি আক্রমণ বা এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করবে না। নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বা সামরিক কোনো অভিযান পরিচালনার মতো পদক্ষেপ থেকে দেশগুলো বিরত থাকবে। চুক্তিভুক্ত দেশগুলো আক্রান্ত হলে বা এসব দেশের ওপর আক্রমণের শঙ্কা তৈরি হলে পারস্পরিক মতামত ও সমঝোতার ভিত্তিতে শান্তি ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় দেশ তাদের নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেবে। স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় এমন সাফল্য সে সময়েই ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু সৌহার্দ্যপূর্ণ আর সংযমীই নয়, বরং তা একে অপরের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও সম সম্মানের পরিচায়ক।


শুভেচ্ছা সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে : ভারত সফরের পরই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২ থেকে ৬ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ আর জনগণের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের শুভেচ্ছা নিয়ে যাচ্ছি।’ সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সফরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বাংলাদেশের উদীয়মান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অপরিসীম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অত্যন্ত সফল এই সফরকে ‘বঙ্গবন্ধুর শুভেচ্ছা সফর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ঐতিহাসিক রাজকীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়। সে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের সময় রাস্তার দু’ধারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, জনগণ ফুল হাতে বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানান। এ যেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কোনো মহানায়কের অভিবাদন।

আজকের জাতীয় স্মৃতিসৌধ বলতে গেলে সেই রাশিয়া সফরের প্রাপ্তি। লেনিনগ্রাদের স্বাধীনতা স্তম্ভগুলো দেখার পর বঙ্গবন্ধুর মনে ভাবনা জাগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে এমন অবকাঠামো তৈরি করা উচিত। তারই ফলশ্রুতিতে পরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়। এই সফরে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বঙ্গবন্ধুর এই সফরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজের জন্য সংগ্রহ করা খাদ্যসামগ্রী থেকে বাংলাদেশকে ২ লাখ টন খাদ্যসামগ্রী সহযোগিতা প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের জুনে কয়েকটি মিগ-২১ জঙ্গি বিমান, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার পাওয়া যায় দেশটির কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয়, নৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে পাওয়া গেছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে।


তবে, সহযোগিতা গ্রহণ কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সংযমী ছিলেন বঙ্গবন্ধু, গাম্ভীর্যপূর্ণ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সারাদেশে অনেক মাইন পোতা ছিল। বিশেষ করে বন্দর, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তাব দেয়, চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দরের মাইনমুক্ত করতে দেশটি সহযোগিতা করতে চায়। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় এসে রুশ নৌসেনারা টহল দেবে, বিষয়টি সংযতভাবেই দেখেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাদের শুধু চট্টগ্রাম বন্দর মুক্ত করার দায়িত্ব দেন। আর চালনা বন্দরের দায়িত্ব পায় জাতিসংঘ। আসলে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ক্ষমতায় বলীয়ান বলেই সে সময় তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।


বরফ গলতে শুরু করে চীনের সঙ্গে
স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশের প্রতি চীনের বিদ্বেষী নীতি কার্যকর থাকে। ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ। কিন্তু চীনের বিরোধিতায় ১০ আগস্ট তা নাকচ হয়ে যায়। এ নিয়ে ক্ষোভও ঝরে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে বলেন, “…যখন চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভেটো দেওয়া হতো তখন এই বাংলার মানুষই বিক্ষোভ করত। আমি নিজে ওই ভেটোর বিরুদ্ধে বহুবার কথা বলেছি। যে ভেটোর জন্য চীন ২৫ বৎসর জাতিসংঘে যেতে পারে নাই, দুঃখের বিষয়, সেই চীন ভেটো ‘পাওয়ার’ পেয়ে প্রথম ভেটো দিলো আমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তবুও আমি কামনা করি তাদের বন্ধুত্ব। অনেক বড় দেশ। দুশমনি করতে চাই না। বন্ধুত্ব কামনা করি। কারণ আমি সকলের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু জানি না, আমার এই কামনায়, আমার এই প্রার্থনায় তারা সাড়া দিবেন কি না। যদি না দেন কিছু আসে যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এত ছোট দেশ নই। বাংলাদেশ এতটুকু নয়। পপুলেশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র।’’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতি ফুটে ওঠে। পরে অবশ্য চীন তাদের অবস্থান পাল্টায়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা রেড ক্রসের একটি দল সফর করে বাংলাদেশের বন্যার্ত অঞ্চল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় এক মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা। আর পঁচাত্তরের মে মাসে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এখানে সে সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৪ সালে আমি সে সময়কার বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করি। কয়লা, লবণসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানের বেশিরভাগই আমরা সে সময় ভারত থেকে আমদানি করতাম। সেবার কয়লা ও লবণ কেলেঙ্কারি হলো। এর ফলে ভারত থেকে কয়লা আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। যথাসময়ে জ¦ালানি সরবরাহের লক্ষ্যে আমরা কয়লা সরবরাহে আন্তর্জাতিক একটা টেন্ডার আহ্বান করি। এতে চীনও অংশ নেয়। যদিও চীন তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীন বলল, গুণগত মানের কয়লা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা সরবরাহ করতে পারবে। কিন্তু বেঁকে বসল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের যুক্তি, পরিবহন খরচ বেশি হবে। বিষয়টির সুরাহার জন্য আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। বঙ্গবন্ধু দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও চীন থেকে কয়লা আমদানির বিষয়টি অনুমোদন করে দিয়ে বললেন, ‘ব্যবসা হলে সম্পর্কও হবে।’ এর কিছুদিন পর ভারতের নয়াদিল্লিতে ঊঝঈঅচ সম্মেলন হয় এবং ওই সম্মেলনের সময় চীনের মন্ত্রী ও আমাদের মন্ত্রীর বৈঠক হয়, যা মন্ত্রী পর্যায়ে চীনের সঙ্গে প্রথম আলোচনা। এর ফলে বরফ গলতে থাকে। ১৯৭৪ সালের জুনে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের সময় সরাসরি বিরোধিতা থেকে বিরত থাকে চীন, ভেটো প্রদান থেকে বিরত থাকে।


আমেরিকার লুকোচুরি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকার ভূমিকা আমাদের স্বপক্ষে ছিল না। যদিও সেদেশের বহু হৃদয়প্রাণ ব্যক্তিত্ব অনেক আইন-প্রণেতা ও বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের যুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করেছেন, যুদ্ধগ্রস্ত দেশের মানুষের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছেন। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই তো লিখে ফিললেন বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সেই মার্কিন মুল্লুকের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিলেন। স্বাধীনতার দু-তিন বছর পর্যন্ত আমেরিকার মন গলাতে বেগ পোহাতে হয় বাংলাদেশকে। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা সফরে যান বঙ্গবন্ধু, প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর ফোর্ডের সঙ্গে ১ অক্টোবর হোয়াইট হাউজে মিটিং করেন। এই বৈঠকে বেশ উদার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ফোর্ড বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানালেও খানিকটা রক্ষণশীল ভঙ্গিতে বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতা লাভ ও জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জনের জন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমরা একটি দরিদ্র দেশ; কিন্তু আমরা আপনাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই।’ এই সফর থেকে ১ লাখ টন খাদ্য সহায়তা মেলে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সুসম্পর্কের বীজ যে রোপিত হয়, তা বলাই বাহুল্য।


মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ ১২৬টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের স্বীকৃতি পাওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। স্বীকৃতির মানে হলো ওইসব দেশ বাংলাদেশকে পূর্ণ সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিগণিত করে। শুরুর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলো খানিকা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কারণ, পাকিস্তানের মতো বড় মুসলিম দেশ থেকে বের হয়ে গিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা ভৌগোলিক আয়তনের ছোট্ট এই দেশটির ভবিষ্যৎ কি-ই বা হতে পারেÑ এমন দোলাচল ছিল তাদের। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ তাদের আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এদিক থেকে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন উল্লেখ করার মতো। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সম্মেলনে ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মতামত তুলে ধরেন, যা তাকে সম্ভাব্য বিশ্ব মুসলিম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে আরবদের সমর্থন করায় বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর অগাধ আস্থা তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আরবদের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধরত মিশরীয় সেনাবাহিনীর জন্য এক লাখ পাউন্ড চা-ও পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের প্রতি আরব দেশগুলোর দৃষ্টি ফেরানো। বাংলাদেশ তাতে সফলও হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, ‘আমরা আজ গর্বিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আরব ভাইদের এবং প্যালেস্টাইনবাসীর পাশে রয়েছি। ইসরাইলিরা তাদের ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। ইসরাইলিরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মানে নাই। তারা দখল করে বসে আছে আরবদের জমি। আমি আরব ভাইদের একথা বলে দেবার চাই এবং তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, বাংলার মানুষ তাদের পেছনে রয়েছে। আরব ভাইদের ন্যায্য দাবির পক্ষে রয়েছে। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সাহায্য করব।’
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩২তম দেশ হিসেবে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা-ওআইসির সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি পরিণত মর্যাদা লাভ করে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল ওআইসির দ্বিতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। কেননা, বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে বাংলাদেশ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবে না। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকে প্রচ- চাপ পড়ে। পাকিস্তান রাজি হলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচার প্রক্রিয়া। এবং কয়েক হাজার পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। পরে সোমালিয়ার মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হয়। এছাড়া প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও কোনোভাবেই চাচ্ছিল না যে, লাহোরের ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করুক। এই ইস্যুতে কয়েকবার ভারতীয় হাইকমিশনার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এসে দেখা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কাউকে কিছু না বলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল তার দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে রাজি হওয়ায় পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের উড়োজাহাজে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়া হয়।


উদীয়মান বিশ্ব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করায় অল্প সময়েই সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দরবারে শান্তির মডেল হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে চিলির রাজধানী সান্তিনিয়াগোতে বিশ্ব পরিষদের প্রেসিডেনসিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে এই পদকের জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা পুরো বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। ১৯৭৩ সালের মে মাসে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ঢাকায় দু’দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৩ মে জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক পরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় বিশ্বশান্তি পরিষদে যোগ দিতে আসা সারা বিশ্বের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পদক পরিয়ে দেওয়ার সময় বিশ্বশান্তি পরিষদের সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ব বন্ধুও বটে।’ বঙ্গবন্ধুও তার ভাষণে বলেন, ‘বিশ্বশান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যে কোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই, বিশে^র সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’ বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতিতে ভর করে জাতিসংঘের ‘টঘ চবধপশববঢ়রহম’-এ বাংলাদেশ আজ একটি ব্র্যান্ড নেইম।


আলজেরিয়ায় ন্যাম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু
১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় জোটরিপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এই সম্মেলন শেষে ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলো তাদের সমর্থন দেয়।
সম্মেলনে ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগত ভাষণে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদবিরোধী মজলুম জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’’
সম্মেলনের ফাঁকে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। এই সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল, প্রেসিডেন্ট টিটো, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বিদায়ী ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য আমাদের পরমাণু নিরস্ত্র¿ীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।’
সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দিতে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর জোর সমর্থনের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমর্থন আদায়ের পথে মূল চালিকাশক্তি ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ২০১৪ সালে ন্যামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে আমি অংশগ্রহণ করি। আমি অভিভূত হই, সেখানকার সেই অডিটোরিয়ামের পাশের দেয়ালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যাম সম্মেলনে উপস্থিতির ওপর বড়োসড়ো সাইজের ছবিসহ বক্তব্য স্থাপন করা হয়েছে। কিউবার প্রতিনিধি (যিনি ১৯৭৩ সালের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন) বললেন, আমি যে চেয়ারে বসে কথা বলছি, সেখানে বসেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ন্যাম সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, বহু রাষ্ট্রনায়ক এই সম্মেলনে যোগদান করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতই বড় মাপের নেতা ছিলেন যে, তার স্মৃতি ধারণ করে আমরা এই দেয়ালে তার প্রতিকৃতি তুলে ধরেছি। দু’দিন পর আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী এই সম্মেলন কক্ষে এলে তাকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত এই দেয়াল আমি দেখাই এবং গর্ববোধ করি।
এই সম্মেলনে ৭৮টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং ২১টি পর্যবেক্ষক দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন জাতিসংঘসহ ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এই সম্মেলনের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতৃত্বের প্রগাঢ় গুণাবলির পাশাপাশি মানবিক গুণবলিতেও অনন্য ছিলেন তিনি। দৃঢ়তা, সততা, বক্তব্যের জোরালো বাগ্মিতা, অসহায় ও নির্যাতিত জনপদের প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য বঙ্গবন্ধু সবার পছন্দের ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এই সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পর সম্মেলনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। তার বক্তব্য এতটাই যৌক্তিক আর বাস্তবধর্মী ছিল যে, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নির্যাতিত ও বঞ্চিত জনপদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হন বঙ্গবন্ধু।


জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু
১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে বালাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম স্বাধীন দেশ হিসেবে সদস্যপদ লাভ করে পরিচিতি পায় বিশ্বজুড়ে। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তৃতা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ভাষণটি ছিল সমগ্র বিশে^র অধিকারহারা শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও সাহসী পদক্ষেপ। এই বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বিশদ আকারে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘একদিকে অতীতের অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটাইতে হইতেছে, অপরদিকে আমরা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতেছি। আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সংকটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিবে আমরা ধ্বংসের ভীতি এবং আনবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকার ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে। এবং যে বিশ্ব কারিগরিবিদ্যা ও সম্পদে পারস্পরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে।’
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নির্ভর করে দেশটির নেতৃত্বের রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ওই দেশের সম্পর্কের সমীকরণের ওপর। পররাষ্ট্রনীতির সফলতার জন্য শুধু শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করলেই চলবে না, এর সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন শক্তিশালী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তার দিকনির্দেশনায় আজকে বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় বঙ্গবন্ধুর পদচারণা
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু নিজের দেশের মানুষের কল্যাণের কথাই ভাবেননি, তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন বিশ্বের নিঃস্ব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বিশ্বটা দুইভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে শোষক, অন্যভাগে শোষিত। আমি শোষিতদের দলে।’ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ধর্ম বা বর্ণের মানুষের ওপর শোষণ বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তিনি কখনও দ্বিধা করেননি। মূলত বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন বিশ্বনেতা যিনি সব সময়ই শোষিতদের পক্ষে কথা বলতেন। তাকে তুলনা করা হতো হিমালয়ের সঙ্গে। তিনি আফ্রিকার বর্র্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; অবসান চেয়েছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় বিদেশি শাসনের। বঙ্গবন্ধু যেমন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, তেমনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাইপ্রাস সরকারকে উৎখাতের নিন্দাও করেছেন। ভিয়েতনামে আমেরিকার বোমাবাজি বন্ধের দাবিও জানায় বাংলাদেশ তার আমলেই। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার আগের পুরোটা সময় তিনি উল্কার মতো ছুটে চলেছেন বিশ্বজুড়ে। নিজে যেমন বাংলাদেশের উন্নয়নের মিশন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন দেশ, তেমনই বাংলাদেশেও এসেছে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, সরকার প্রধানরা।
শেষ হইয়াও যা হইল না শেষ
জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে জুলাই ১৯৭৫, মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০টির মতো রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের সফরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায়। ওই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নানা বিষয়ে ৭০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অনেক দেশ ও সংস্থা যেমনÑ সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইডেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, আলজেরিয়া, নেদারল্যান্ডস, জাতিসংঘ, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি, আইডিএ, ইউএনএইচসিআর প্রভৃতি বাংলাদেশকে কোটি কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের ঋণ, সাহায্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে এবং স্বীকৃতি প্রদান করে আরও বিভিন্নমুখী সহযোগিতার। এ সময় বাংলাদেশ এডিবি, আইসিএও, ইকাফ এবং ফাও-এর সদস্যপদ লাভ করে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষার যে মিশন নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তার শতভাগ সুফল ভোগ করতে থাকে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই সৌদি আরব, সুদান, ওমান ও চীন ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, দূরদর্শিতা ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল এসব অর্জনে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, কারো সঙ্গে দুশমনি করতে চাই না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব করে আমরা শান্তি চাই।’
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার