স্মরণ : মোহাম্মদ নাসিমের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের প্রেরনা

192
Social Share

জয়ন্ত আচার্য:

মোহাম্মদ নাসিম রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই পার করেছেন নানা চড়াই-উতরাই। রাজনীতির হাতেখড়িটাও শৈশবেই। একসময় নিজেও নেমেছেন সক্রিয় রাজনীতিতে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগ। দেশের রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায়জুড়ে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারি ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাসিম বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় চারনেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সুযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন ।

১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায় এম মনসুর আলী ও মা মোসাম্মত আমেনা মনসুরের ঘরে মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম। তার স্ত্রীর নাম লায়লা আরজুমান্দ। ব্যক্তিগত জীবনে মোহাম্মদ নাসিম তিন সন্তানের জনক। তাঁর পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকে ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় চারনেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ৩ নভেম্বর জেলখানায় অন্তরীণ থাকা অবস্থায় একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে হত্যাকান্ডের শিকার হন। এরপরই মোহম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পুরোপুরি সস্পৃক্ত হয়ে ওঠেন। পঁচাত্তরের হত্যাকান্ডের পর মোহাম্মদ নাসিমকেও গ্রেপ্তার করা হয়। সেইসময় দীর্ঘদিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে। তাঁর পিতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকারের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁরই সুযোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও তিনি একই সাথে ১৪ দলের মুখপাত্র হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর কারাগারে মনসুর আলীকেও হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন নাসিম। তখন কারাগারেও যেতে হয়েছিল তাকে।
মোহাম্মদ নাসিম পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশের পর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তিনি ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মোহাম্মদ নাসিম প্রথমে ছাত্রজীবনে বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ছাত্রলীগ করতে শুরু করেন। এরপর মুল দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুবলীগের সভাপতিন্ডলীর সদস্য হন। রাজনৈতিক জীবনে মোহাম্মদ নাসিম বিভিন্ন সরকারের সময় জেল, জুলুম ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। তিনি পাকিস্তানের স্বৈরশাসন. নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ স্বাধীন বাংলাদেশে সব সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। মোহাম্মদ নাসিম ৮০ দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে মোহাম্মদ নাসিমকে অনেকবার কারাবন্দী হতে হয়েছে। প্রথম তাকে কারাগারে যেতে হয় ১৯৬৬ সালে, যখন তিনি এইচএসসি পড়ছিলেন। সেই সময় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ভুট্টা খাওয়ানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পিতা এম মনসুর আলীর সঙ্গে কারাগারে যেতে হয় মোহাম্মদ নাসিমকে। একবছর পরে তিনি ছাড়া পান। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। দেশের সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্র সৈনিক।


রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন নাসিম সম্পর্কে এক স্মৃতির রোমন্থন থেকে বলেছেন, ১৯৭৫ সালের পর নাসিমকে বেশ একটা দুঃসময় পার করতে হয়। ৭৮ সালের দিক থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন। একাত্তর সালে মুক্তিসংগ্রামের সময় কলকাতায় নাসিমসহ আমরা এক বাড়িতে থাকতাম। জাতীয় চার নেতার পরিবারের মধ্যে আমরা তাকে আমাদের বড় ভাইয়ের মতো মনে করতাম। তিনিও সেভাবেই আমাদের খোঁজখবর রাখতেন। তাকে দেখেছি, যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও শক্ত মন নিয়ে দাঁড়তে পারতেন, কর্মীদের চাঙ্গা করে তুলতে পারতেন। পরবর্তীতে প্রশাসক হিসাবেও তাঁকে সফল দেখতে পেয়েছি। তিনি অনেক সময় গর্ব করেই বলতেন,আমি কোন বেঈমানের সন্তান নই, আমি বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত আদর্শের সৈনিক, তার সন্তান।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) বিদেশ থেকে দেশে আসার পর তিনি সবসময় নেত্রীর সঙ্গেই থেকেছেন। এরপর ১৯৮১ সালের সম্মেলনে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুব সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালের কাউন্সিলে দলের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহম্মদ নাসিমকে। তার আগের বছর, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের সম্মেলনে পরপর দুবার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নাসিম। ওই সময় দলে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ একটি ছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম ও ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে (কাজীপুর) তৃতীয় এবং চতুর্থ বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ওই সরকারে মোহাম্মদ নাসিম ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরের বছর বারতি দায়িত্ব হিসেবে আরও একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ডাক ও টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এরপর ১৯৯৯ সালে মন্ত্রিসভা রদবদল করা হলে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অনেক বার রাজপথে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে কার্যনির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য পদে ছিলেন নাসিম।
এরপর ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিযানে আরো অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। সেই সময় অবৈধভাবে এক কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন ও ২০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মিথ্যা মামলায় বিশেষ জজ আদালত ২০০৭ সালে মোহাম্মদ নাসিমকে ১৩ বছরের কারাদন্ড দেয়। তবে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত ওই সাজা ও মামলা বাতিল করে দেন।


কিন্তু মামলায় সাজা হওয়ার কারণে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি মোহাম্মদ নাসিম। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে পুন:রায় কার্যনির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য পদে ছিলেন নাসিম। তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই আসনে তাঁর ছেলে তানভির শাকিল জয় অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। এরপর ২০১২ সালের আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তাঁকে দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর মামলা ও সাজা উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। এরপর প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছেনুয়ায়ি ১২ জানুয়ারি গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মন্ত্রী না হলেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও ১৪ দলের মুখপাত্র হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪ দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা রয়েছে । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে ২০২০ সালের ১ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি হন মোহাম্মদ নাসিম। ওই দিন নমুনা পরীক্ষা করা হলে তাঁর করোনা শনাক্ত হয়। তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। এরপর ৫ জুন তাঁকে কেবিনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও ওই দিন তিনি স্ট্রোক করেন। জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয় তাঁর। এরপর তিনি গভীর কোমায় চলে যান, লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাঁকে। গঠন করা হয় ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। এর মধ্যে ৮, ৯ ও ১০ জুন তাঁর নমুনা পরীক্ষা করা হলে করোনাভাইরাস নেগেটিপ আসে। বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে পরিবার। কিন্তু ১১ জুন অবস্থার অবনতি হলে সিদ্ধান্তক থেকে সরে আসেন সবাই। ১২ জুন অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তাঁর হৃদ্যন্ত্রে জটিলতা দেখা দেয়। পরদিন ১৩ জুন বেলা ১১টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ট্রমা সেন্টার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নাসিমের বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে গেছেন।
তার সুযোগ্য পুত্র তানভীর শাকিল জয় তার আসনে (সিরাজগঞ্জ-১) উপ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য ।
রাজনীতিতে তাদের পরিবারের ভূমিকা নিয়ে ‘সংসদে তিন প্রজন্ম’ নামের একটি বইয়ের সম্পাদনাও করেছেন মোহাম্মদ নাসিম। সেখানে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, তার সন্তান মোহাম্মদ নাসিম এবং তার ছেলে তানভীর শাকিল জয়ের ভূমিকা নিয়ে বইটি লেখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর বাবার মতোই বঙ্গবন্ধু পরিবারের আস্থাভাজন ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। রাজপথের পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও তিনি উচ্চ কণ্ঠ ছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
তিনি রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশকিছু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন তিনি।
অমৃত্যু মোঃ নাসিম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মানে নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। কখনো অপোষ করেননি । তার জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরনা হয়ে থাকবে । আগামী ১৩ জুন তার প্রথম মৃত্যু বাষির্কীেতে তার প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলী ।