স্মরণ : কর্ণেল (অব.) শওকত আলী : কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের প্রেরনার উৎস

288
শওকত আলী
Social Share

এ এস এম সামছুল আরেফিন : দেশের রাজনীতির জগতে একটি আদর্শের নাম কর্ণেল (অব:) শওকত আলী। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে অভিযুক্ত ছিলেন। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসাবে তার কর্মজীবন বর্নাঢ্যময় ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্ণেল (অব.) শওকত আলী অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর-২ আসন থেকে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জন মানুষের একান্ত আপন একজন ছিলেন কর্ণেল (অব.) শওকত আলী ।


১৯৩৭ সালের ২৭ জানুয়ারি শরীয়তপুরের নড়িয়ার লোনসিং বাহের দীঘিরপার গ্রামে তার জন্ম। তার পিতার নাম মুন্সী মোবারক আলী এবং মাতার নাম মালেকা বেগম। পিতা পেশায় ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। দাম্পত্য জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। ১৯৫৩ সালে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। একই বছর তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজে আই এস সিতে ভর্তি হন। পারিবারিক অর্থনৈতিক কারণে তার পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটেছিল। ঢাকায় থাকা বা খাওয়ার জন্য তাঁর নির্দিষ্ট কোন জায়গা ছিলো না। অনেক চেষ্টায় ঢাকার হাজারীবাগে একটা লজিং পেয়েছিলেন। এই হাজারীবাগ থেকে হেঁটে কলেজে আসা যাওয়া করতে হত। বাধ্য হয়ে একসময় লজিং ছেড়েছিলেন। এর পরে টিপু সুলতান রোড-সংলগ্ন দক্ষিণ মৈশুন্ডিতে এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। ছাত্র জীবনে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক এম এ আবদুল্লাহর বিশেষ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে আই.কম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে স্থান করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে তিনি ২০তম অবস্থানে ছিলেন। তাঁর ফলাফলে খুশি হয়ে আবদুল্লাহ সাহেব তাকে বি.কম ক্লাসে ভর্তি এবং বইপত্র কেনায় সহযোগিতা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে বি.কম এবং ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন। এই বছরে তিনি প্রশিক্ষণ সমাপনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসাবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অগ্রনায়কদের সাথে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পরবর্তিতে এক গণ-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে মুক্তিলাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে তিনি ২নম্বর সেক্টরের একজন সাব কমান্ডার হিসাবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন তিনি মুজিবনগরস্থ সশস্ত্রবাহিনীর সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি পুনঃরায় সেনাবাহিনীতে যোগদান করে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ প্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৮ সালে সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করেন।


শওকত আলী ১৯৫৭ সালে বি.কম প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি কায়েদে আজম কলেজ শাখা ছাত্রলীগের আহবায়ক ছিলেন। পিতার স্বাস্থ্যগত কারনে শওকত আলীর কর্মজীবন শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। এইসময় বাবার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিলো। সংসারের আয়ও কমে গিয়েছিলো। ইন্টারভিউ দিয়ে ১৯৫৪ সালের আগষ্ট মাসে সচিবালয়ের চাকরিতে যোগদান করেন। সেইসময়ও তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছাত্রলীগের এই পদ নিয়েই তিনি তখন সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তখনও তার বি.কম পরীক্ষার তিনটি পরীক্ষা বাঁকী ছিল। সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষের সম্মতিতে বি.কম পরীক্ষা শেষে তিনি প্রশিক্ষণে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তার নিযুক্তি হয়েছিল করাচির মালির সেনানিবাসে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিল সেখানে ক্যাপ্টেন শওকত আলীকে ২৬ নম্বর আসামি করা হয়। এ মামলায় ১৯৬৮ সালের ১০ জানুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের মালির ক্যান্টনমেন্ট থেকে আটক করার পর তাকে ঐ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৯৬৮-১৯৬৯ সালে ১৪ মাস তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাস কারাগার থেকে সকলে মুক্তিলাভ করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে ১৯৬৯ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। এই মামলাটির রাষ্ট্রীয় নাম ছিল, ”রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যরা”।


মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এসময় সামরিক বাহিনীর পুর্নগঠনে তার বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। তিনি ডাইরেক্টর অব অর্ডন্যান্স সার্ভিসেস হিসেবে স্বাধীন দেশের সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তোলার কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। কর্ণেল পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে অর্ডন্যান্স সার্ভিসেসের পরিচালক থাকা সময়কালে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর শওকত আলীকে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয়।
কর্নেল (অব.) শওকত আলী সুস্থ ধারার এক গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারনায় বিশ্বাসী ছিলেন। আইনশাস্ত্র, দর্শন, বিশ্ব রাজনীতি, সামাজিক ইতিহাস, বিবর্তনের ইতিহাস, এমনকি মার্কসবাদ সম্পর্কেও তিনি অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ১৯৭৯ সালে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শরীয়তপুর-২ (তৎকালীন ফরিদপুর-১৫) আসন থেকে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মাত্র ৩৯ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সংসদে তিনি আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের হুইপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সামরিক শাসক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ইঙ্গিতে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লিখিত নির্দেশে তাঁর বিরুদ্ধে পর পর তিনটি মিথ্যা হত্যা ও অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়। তাঁকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে হত্যা ও অপহরণের দায়ে ১৯৮২ সালের ১০ মে ঢাকার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। যশোরের ৫ নং বিশেষ সামরিক আইন আদালতে বিচারের জন্য তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৭ জুন ১৯৮২ সালে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ অক্টোবর ১৯৮২ সালের রায়ে বিশেষ সামরিক আদালত অন্যান্য আসামী সহ তাঁকে নির্দোষ বলে খালাস প্রদান করেন। স্বৈরাচারী এরশাদের সরকারের আমলে মিথ্যা হত্যা মামলায় তাকে ১৬ মাস কারাভোগ করতে হয়েছে।


কর্নেল (অব) শওকত আলী ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম, ২০০৮ সালের নবম ও ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শরীয়তপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। নবম জাতীয় সংসদে কর্নেল (অব.) শওকত আলী ডেপুটি স্পিকার মনোনীত হন। ২২ মার্চ ২০১৩ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০১৩ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৮ সালের ২৬ আগস্ট কর্ণেল (অব.) শওকত আলীর নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে গড়ে উঠে ’মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ’ (ঋৎববফড়স ঋরমযঃবৎং ঝড়ষরফধৎরঃু ঈড়ঁহপরষ)। তিনি এই পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রগতিশীল মহলকে সোচ্চার হয়ে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সংগঠিত হত্যাকান্ডের বিভিন্ন বধ্যভূমি সনাক্তের মাধ্যমে বধ্যভূমিগুলোতে ফলক উন্মোচনে করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের রাজাকার ও আলবদরদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আমৃত্যু তিনি এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি সংযুক্ত ছিলেন। কর্ণেল (অব.) শওকত আলী নড়িয়া মহাবিদ্যালয়, নড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়, নড়িয়া উন্নয়ন সমিতি, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, সুরেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু পরিষদসহ শরীয়তপুর জেলাধীন নড়িয়া উপজেলার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু কলেজ মিরপুর, ঢাকার পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
বর্নাঢ্য এই কর্মজীবনে কর্নেল (অব.) শওকত আলী ভারত, যুক্তরাজ্য, যুগোস্লাভিয়া, থাইল্যান্ড, ইতালি, কিউবা, বুলগেরিয়া ও রাশিয়া সফর করেছেন। তার লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: সত্য মামলা আগরতলা, কারাগারের ডায়েরী, বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও আমার কিছু কথা (২০১২), গণপরিষদ থেকে নবম সংসদ (২০১৬), আর্মড কোয়েস্ট ফর ইনডিপেন্ডেন্স (ইংরেজি)। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নিজ বাড়ি ‘স্বাধীনতা ভবন’-এর আঙিনায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, আগরতলা যড়যন্ত্র মামলার আসামী, জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পীকার শওকত আলীর কর্মময় জীবন ও দেশ প্রেম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরনার উৎস হয়ে থাকবে। সমগ্র জাতি তাকে কৃতজ্ঞতার সাথে চিরদিন স্মরণে রাখবে।

লেখক : মুক্তযিুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক । ভিনিউজের প্রধান সম্পাদক