স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে যা দরকার-অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে যা দরকার
Social Share

করোনাকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে । প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক। আসছে শীতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে । সবাইকে সতর্ক হতে হবে, যাতে বড় ধরনের সংকট না হয় ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন । এ জন্য তিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি গ্রহণ করেছিলেন সময়োপযোগী পদক্ষেপ । মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিত্সাবিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে একটি শক্ত নীতিমালা, পরিকল্পনা, অবকাঠামো রেখে গেছেন। যার ওপরে গড়ে উঠেছে আজকের বিশ্বনন্দিত অনেক কার্যক্রম । বঙ্গবন্ধুর ভাবনা-পরিকল্পনার মধ্যে স্পষ্টত গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নই লক্ষ্য ছিল। যেখানে দুঃখী মানুষের চিকিত্সাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে । তিনি ‘রোগের চিকিত্সার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম (Prevention is better than cure)’ ধারণা থেকেই গড়ে তুলেছিলেন গ্রামীণ স্বাস্থ্যকাঠামো।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি’ বিষয়টা সামনে চলে আসে । এ দেশের চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)’ শুরু থেকেই দেশে একটি গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য দাবি-লড়াই-আন্দোলন করে আসছে । এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মেডিকেল শিক্ষার উন্নয়নে বিএমএর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । ১৯৯০-এ চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল । এ দাবিতে চিকিৎসকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না, ছিল গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে নীতিমালা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিকেল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয়। ১৯৯০-এর ৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণে জেনারেল এরশাদ চিকিৎসকদের হেয় করে বক্তৃতা দিলেন । এতে চিকিত্সক সমাজ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হলো । ডা. মাজেদ ও ডা. জালালের নেতৃত্বাধীন বিএমএ তখন একদিকে কর্মসূচি দিল এবং সাংগঠনিক সফরে বের হলো । তখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় এরশাদের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বিষয়টি ।

২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি এরশাদ বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে এ দেশের চিকিৎসকদের চূড়ান্ত সমালোচনা-অবমাননা করে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করলেন । এ নীতিতে বিএমএ বা চিকিৎসকসহ কোনো মহলেরই কোনো মতামত নেয়া হয়নি । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই স্বাস্থ্যনীতি ছিল একেবারে অবাস্তব । বিএমএ এবং সব রাজনৈতিক দল তা প্রত্যাখ্যান করে । ২৭ জুলাই ছিল বিএমএর পূর্বঘোষিত শহীদ মিনারে জাতীয় চিকিৎসক মহাসমাবেশ এবং বিকেলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিশেষ সাধারণ সভা । সেখান থেকে ‘গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও ২৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন’-এর জন্য চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় । চিকিৎসকদের গণপদত্যাগ, কর্মবিরতি, গণসংযোগ , সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে দেশের চিকিৎসক সমাজ বিএমএর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। অবশেষে ১৪ আগস্ট চিকিৎসকদের তুমুল আন্দোলনের মুখে সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি প্রেস নোট বিএমএর কাছে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত প্রেস নোট সম্ভবত এই একটিই ।

বিএমএ আন্দোলন স্থগিত করার কিছুদিন পর সরকার পুনরায় একই স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে । চিকিত্সকরা স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে ছিল না, বিএমএ চেয়েছিল সবার গ্রহণযোগ্য, সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একটি স্বাস্থ্যনীতি । বিএমএকে সরকারের চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে আবার আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা হলো । চিকিৎসকদের এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল এবং বাম জোটের ৫ দল । দেশে তখন চলছিল স্বৈরাচারবিরোধী জাতীয় আন্দোলন আর অন্যদিকে বিএমএর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল এবং ২৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। ২৭ নভেম্বর ছিল বিএমএর দেশব্যাপী কর্মসূচি । তৎকালীন পিজি হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত সভায় যাওয়ার পথে ডা. মিলন টিএসসি চত্বরে শহীদ হন। ডা. মিলনের মৃত্যু এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করে এবং ৬ ডিসেম্বর ৯ বছরের স্বৈরশাসনের পতন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ঘোষণা করা হয় ।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন কিন্তু স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি । ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেই জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহন করেন । স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সভাপতি করে ২৬ সদস্যের ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয় । এতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় উপনেতা অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় । সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) এবং অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুযায়ী জনগণের পুষ্টির উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনের লক্ষ্যসহ স্বাস্থ্যনীতিতে ১৫টি লক্ষ্য, ১০টি মূলনীতি এবং ৩২টি কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয় । ২০০০ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি সর্বস্তরের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করে মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। এতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মেডিকেল শিক্ষার উন্নয়নের সব দিকনির্দেশনা বিদ্যমান । বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে এই স্বাস্থ্যনীতি হালনাগাদ করা হয়। এই স্বাস্থ্যনীতি অনুসরণ করে চললে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে।

বিগত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ করেছেন । এখন এ খাতের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে সময়োপযোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অভাব । করোনাকালীন যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একশ্রেণির কর্মকর্তা-ব্যবসায়ীর দুর্নীতি, যাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই । স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি জরুরি বিষয়, যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় দ্রুত, বাস্তবায়ন করতে হয় ত্বরিত, ধীরগতি বা গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই ।