স্বাস্থ্য বাজেটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

52
Social Share

ডা. কামরুল হাসান খান: মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। চলতি বাজেটে মোট স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের কম এবং মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র ১১০ ডলার। এ কারণে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দও সব সময় অপর্যাপ্ত থেকেছে। বাজেট যাই হোক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আবার ব্যবহারের সক্ষমতারও অভাব রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাত ঘিরে বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছে সরকার। এসব বিষয় মাথায় রেখেই স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে প্রথমবারের মতো মোট বাজেটের ৭ শতাংশের বেশি বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। গত সাত অর্থবছর ধরে এ বরাদ্দ ৫ শতাংশের কাছাকাছি থেকেছে। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এটি মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছর থেকে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে তিন হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। বাড়তি এই বাজেটের বড় একটি অংশই অবশ্য খরচ হবে পরিচালনা খাতে। বাকিটা মূলত ব্যয় হবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে।

স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, গত সাত অর্থবছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। করোনা মহামারির সময় দেখা গেছে, জনসংখ্যা অনুপাতে দেশের হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ শয্যার সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে ৫০৮টি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩৭টি আইসিইউ শয্যা আছে।

এখন সরকার যে মাস্টার প্ল্যান করার পরিকল্পনা নিয়েছে, সেখানে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সরঞ্জাম বাড়ানো হবে। ভেন্টিলেটরের সংখ্যাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য এসব সরঞ্জাম আমদানি করমুক্ত থাকবে। এর পাশাপাশি করোনা মোকাবিলায় নতুন দুই হাজার চিকিৎসক, ছয় হাজার নার্স ও ৭৩২ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এর জন্য বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে। চলতি বাজেটে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের সংখ্যা ও সেবার মান বাড়াতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা।

করোনাকালে এখন পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশি চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। চলতি বাজেটে চিকিৎসকদের সম্মানী ভাতার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। করোনা চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণকারী চিকিৎসকদের এককালীন সম্মানী ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটে এ ভাতার পাশাপাশি দেওয়া হতে পারে ঝুঁকি ভাতা। সেইসঙ্গে আসতে পারে প্রণোদনার ঘোষণা। প্রণোদনা এবং এসব ভাতার জন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকছে ৮৫০ কোটি টাকা।

করোনা মোকাবিলা, বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা কেনা বাবদ সরকার চলতি অর্থবছর ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রেখেছে। করোনার প্রকোপ এখনও কমেনি, বরং দিন দিন তা পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এ বিবেচনায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আগামী বাজেটেও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখবে। আগামী বাজেটে সব নাগরিকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে চার হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এটি ছয় হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক সেবাও অনলাইনে বিশেষায়িত সেবার ঘাটতি দেখা গেছে করোনাকালে। এ সেবার মান বাড়াতে এ খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ১৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী বাজেটে তা ২০০ কোটি টাকা করা হতে পারে।

দেশের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে গবেষণার জন্য বাজেটে আবারও বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী বাজেটেও এ খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। চলতি অর্থবছর ‘সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করে সরকার। এ জন্য বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে এ তহবিল থেকে কোনো টাকা খরচ করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে ২০ বছর মেয়াদি (২০১২-৩২) স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল। এতে বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে ৩২ শতাংশ করা হবে। তখন ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৬৭ শতাংশ। এখন তা ৭৪ শতাংশ হয়ে গেছে। বিশ্বে গড়ে পকেট থেকে চিকিৎসা খরচের হার ৩২ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ১১টি দেশ নিয়ে ‘হালনাগাদ ২০১৯’ নামে যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশের এক কোটি ১৪ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের ওপর এই চাপ বাড়ার কারণ হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। ডব্লিউএইচওর মতে, বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষকে ‘আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের’ চাপ সামলাতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একটি পরিবার তার মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ ব্যয় করছে শুধু স্বাস্থ্যের পেছনে। অগ্রাধিকার ঠিক করে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ না বাড়ানোর কারণেই এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

নিম্নমধ্যম আয় থেকে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্থাৎ সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এখনও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় নাগরিকেরা আর্থিক অসচ্ছলতা থেকে মুক্ত না হয়েও স্বাস্থ্য সুবিধা পেতে পারেন, সেটিই হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।

৯ বছর আগে ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) সংক্রান্ত প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইউএইচসির পক্ষে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সন্তোষজনক। বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এবং দুর্বলতা আছে যা কাটিয়ে উঠলে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য যা করতে হবে-

১. বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের জন্য জনবান্ধব, চিকিৎসাবান্ধব আধুনিক ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করতে হবে, ২. কঠোরভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ৩. কঠোরভাবে মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নার্স ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউশনের মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ৪. গবেষণার সুযোগ, পরিবেশ বাড়াতে হবে এবং গবেষকদের উৎসাহিত করতে হবে, ৫. দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সমানুপাতিক হারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে, ৬. প্রতিটি কর্মসূচির নিবিড় পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং এবং ফলোআপের আধুনিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে, ৭. আর্থিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, ৮. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বিভাগের নিবিড় সমন্বয় থাকতে হবে, কাজের সুষ্ঠু বণ্টন ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে, ৯. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে, ১০. সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে, ১১. কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, ১২. নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে বাস্তবিক কারণে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে নন-কভিড রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। এবং কোথাও যেন কভিড-নন কভিড রোগী মিশ্রিত না হয়ে যায়। টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে, ১৩. চিকিৎসক এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু অতি সম্প্রতি তার এক অর্থনৈতিক বিশ্নেষণে লিখেছেন, এবার বাংলাদেশ আমেরিকার মতো ভালো করবে। কৌশিক বসু এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। তালিকায় প্রবৃদ্ধির হারে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। আইএমএফের সূত্রও তাই বলে। তাই, প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে লিখিত এক প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাতারে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছেন কৌশিক বসু। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্নেষণে বাংলাদেশ এখন এশিয়ার এমারজিং টাইগার। বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে অর্থনীতির স্বাস্থ্য আরও ভালো হবে। সরকারকে সেদিকে নজর দিতে হবে।

সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়