স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, কেউ অবস্থান পরিবর্তন করবেন না : প্রধানমন্ত্রী

ফাইল ছবি
Social Share

সংসদ ভবন, ১৮ এপ্রিল ২০২০ (বাসস) : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে দেশের জনগণকে বাঁচাতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থানে অবস্থান করে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, বার বার আপনাদেরকে অনুরোধ করছি যে, যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। অর্থাৎ এটাকে (করোনা ভাইরাস) যদি আমরা একটা জায়গায় ধরে রাখতে পারি এবং সেখান থেকে যদি মানুষকে সুস্থ করতে পারি তাহলেই কিন্তু এটা আর বিস্তার লাভ করতে পারবে না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা যেহেতু মুখ থেকে ছড়ায়, তাই, একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন।’
‘দেশবাসীকে বলবো দয়া করে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। যে যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করেন, ’ যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা আজ বিকেলে একাদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে একথা বলেন। এ সময় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সংসদ অধিবেশনের মধ্যে এক অধিবেশন থেকে অন্য অধিবেশনের দূরত্ব অনধিক ৬০ দিন হওয়ায় ১৮ ফেব্রুয়ারির পর এদিন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এদিন করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেই একাদশ সংসদের এই ৭ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তবে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে স্বল্প সংখ্যক সংসদ সদস্যের অংশগ্রহণে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অধিবেশনে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরিফের মৃত্যুতে উত্থাপিত শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং একইসঙ্গে সমাপনী ভাষণও প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে হাজার হাজার মানুষ দৈনিক মারা যাচ্ছে সেখানে অন্য দেশের সঙ্গে আপনারা যদি একটু তুলনা করেন তবে, আমরা অনেক ভাল আছি। কিন্তু আমি একটু আমার দেশের মানুষকে বলবো-আপনারা ঘরে থাকেন।’
তিনি এ সময় উদাহারণ দেন-কেউ যেন একটু বেশিই সাহসী হয়ে যাচ্ছে। ঘরে থাকার নির্দেশনা না মেনে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে গেল শিবচর, সেখান থেকে আবার টুঙ্গিপাড়া গিয়ে হাজির হল। ব্যস করোনাভাইরাস টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত পৌঁছিয়ে গেল। কিংবা নারায়ণগঞ্জ থেকে কেউ বরগুনা চলে গেল কেউ, ভাইরাসও গিয়ে সেখানে পৌঁছলো।
সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি অনেকে মানতেই চাইছে না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা সকলকে ঘরে থাকার অনুরোধ করছি, আইনশৃংখলা রক্ষাকারি সংস্থা যথেষ্ট কষ্ট করছে দিনরাত, তারপরেও এখানে গল্প, ওখানে বসে আড্ডা। কারণ, এটাতো কোন সিমটমে বোঝা যায় না যে কার শরীরে আছে আর কার শরীরে নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যত সংসদ সদস্য এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন তাঁদেরসহ সকল নেতা-কর্মী এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আহ্বান করবো সকলে স্বাস্থ্য সম্পর্কে যে সচেতনতা, যেটা বার বার ঘোষণা করা হচ্ছে, যে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হচ্ছে সবাই দয়াকরে সেই নির্দেশনাগুলো মেনে চলবেন।’
সংসদ নেতা বলেন, এই নির্দেশনাগুলো মেনে চললে নিজে যেমন সুরক্ষিত থাকতে পারবেন অপরকেও সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। কারো এতটুকু ঝুঁকি নিজেকে যেমন অসুস্থ করে তুলতে পারে তেমনি অন্যেরও অসুস্থ হবার কারণ হবেন, সেটা যেন না হয়।
তিনি বলেন, ধান কাটার জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীকে বলা রয়েছে। যারা যেখানে ধান কাটতে যাবে তাঁদের পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ, এই ধানটা যদি আমরা সঠিকভাবে ঘরে তুলতে পারি তাহলে আর খাবারের অভাব হবে না।
তিনি এসময় প্রশাসন এবং আইন শৃংখলা রক্ষবকারি বাহিনীসহ ছাত্র-শিক্ষক, এবং জনপ্রতিনিধিদের কৃষকের ধান আহরণে সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এ সময় দেশে এক টুকরো জমিও যেন অনাবাদি না থাকে সে দিকে সকলকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়ে উৎপাদিত পণ্য বাজার জাত করার ব্যবস্থা সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন করে দেবে এবং দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, কৃষি উৎপাদনটা যেন অব্যাহত থাকে সেজন্য আমরা ৪ শতাংশ সুদে কৃষি ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া বর্গাচাষীদের জন্য বিনা জামানতে ঋণ প্রদান এবং কৃষি সামগ্রীসহ অন্যান্য সামগ্রীও বিনামূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট দিনে বড় খোলা মাঠে হাট বসিয়ে এবং নিরাপদ দূরত্বে পণ্য নিয়ে বসে কেনা-বেচা করা সুযোগ প্রদানেও নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের একটাই চেষ্টা মানুষের জীবনটা যেন চলে এবং তাঁরা যেন সুরক্ষিতও থাকতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ যেহেতু ছোঁয়াছে রোগ তাই চিকিৎসার জন্য তিনটি হটলাইন খোলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ১৬২৬৩, ৩৩৩ এবং ১০৬৫৫। এরমাধ্যমে আমাদের নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসকগণ চিকিৎসাসহ নানারকম পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
সকলের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ায় তাঁর সরকারের উদ্যোগসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩৩৩ এ ফোন করে শুধু চিকিৎসাই নয়, যারা হাত পাততে পারেনা, বাড়িতে খাবার নেই। কাজেই সেই তথ্যটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ’দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে আমি নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন এই হটলাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। যখন এখানে ফোন করে কেউ সহযোগিতা চাইবেন তখনই তাদের যেন সহযোগিতা (জরুরী খাদ্য) পাঠানো হয়। এজন্য সম্পূর্ণ ডাটা এন্ট্রির ব্যবস্থাও আমরা করে দিয়েছি।’
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দুুর্ভিক্ষের পূর্বাভাসের প্রেক্ষিতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা করে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত যেন জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আয়-রোজগার সচল থাকে সেজন্য তাঁর সরকারের ইতোমধ্যে ঘোষিত প্রায় একলাখ কোটি টাকার প্রণোদণা প্যাকেজের পুনরুল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি। যা আমাদের জিডিপি’র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।’
সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫০ লাখের সঙ্গে আরো ৫০ লাখ যোগ করে সেই সংখ্যা কোটিতে উন্নীত করায় ৫০লাখ নতুন রেশন কার্ড প্রদানে সরকারের উদ্যোগও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘আরো ৫০ লাখ কার্ড করে দেব। আগে ৫০ এবং পরে ৫০। অর্থাৎ এক কোটি কার্ড করে দিয়ে প্রতি পরিবারে ৪/৫ জন সদস্য হলে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি লোক সুবিভাভোগী হবে।
‘খাদ্যে যেন কোন অসুবিধা না হয়, সে ব্যবস্থাটা আমরা করতে পারবো,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এখন পর্যন্ত ৬৪ জেলায় ৫০ কোটি টাকা নগদ এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।’
এই সময়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মালদ্বীপে খাদ্য এবং কুয়েতে ওষুধ সাহায্য এবং চীনে ভাইরাস ছড়ানোর প্রথম পর্যায়ে মাস্ক, গ্লাভস এবং স্যানিটাইজার জাতীয় সামগ্রী দিয়ে তাঁর সরকারের সহযোগিতা প্রদানেরও উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। অনেক বিভাগীয় এবং জেলা হাসপাতালেও খোলা হয়েছে। মোট আইসোলেশন শয্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২শ’।’
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে প্রত্যেক জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন সহ উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাটাও আমরা করবো।’
ঢাকার কয়েকটি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট ভাবে রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারমধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, সংক্রামক রোগ হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাষ্ট্রোলিভার ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মহানগর হাসপাতাল এবং লালকুঠি হাসপাতাল। এছাড়া কিছু বেসরকারী হাসপাতালকেও অনুরোধ করা হয়েছে, রোগী সংখ্যা বাড়লে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কারণ, এই রোগ কতদিন থাকতে কেউ বলতে পারছে না।
তিনি এই বিপদ থেকে দেশ এবং দেশবাসীকে রক্ষার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে বেশি বেশি প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।’
ঘরে বসেই ইবাদত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কাবা শরিফ এবং মদিনা শরিফেও কারফিউ দেওয়া হয়েছে। কাজেই মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসেই আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সে দোয়া কবুল করবেন।
সংসদ নেতা বলেন, ‘আল্লাহর শক্তি যে সব থেকে বড় শক্তি সেটাতো করোনা ভাইরাসের শক্তি দেখেই আমরা বুঝতে পারি যে অস্ত্র, গোলা-বারুদ কিছুই কাজে লাগে না।’
‘সবাই আল্লাহকে ডাকেন আমরা এবং বিশ্ববাসী সবাই যেন এই করোনা ভাইরাসের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে আসতে পারি,’ যোগ করেন তিনি।
এরআগে প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা বক্তব্যের শুরুতে সংসদ সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘তাঁর বয়স হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও বলবো আমাদের সংগঠনের জন্য তিনি একটা শক্ত পিলার ছিলেন।’
১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময়কালের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সে সময় যে স্বল্প ক’জন মানুষ আমার পাশে ছিলেন তার মধ্যে শামসুর রহমান শরিফ ছিলেন একজন।’
তিনি বলেন, ‘সেই চলার পথ মোটেও সহজ ছিল না। অনেক বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করেই চলতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সবসময় আমাকে সমর্থন দিয়েছেন এবং পাশেই থেকেছেন।’