স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া মেহেরপুরের অহংকার

206
স্বাধীন বাংলা
Social Share

মুহম্মদ রবীউল আলম :

বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শব্দসৈনিক,সমাজসেবক,রাজনীতিবিদ,সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া (১০ অক্টোবর ১৯৪০ – ১৩ অক্টোবর ২০১৪)। মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান পুরুষ ছিলেন তিনি।তিনি ছিলেন মানুষের পরোপকারী বন্ধু ও সাদা মনের মানুষ। জমিদার বংশে জন্ম গ্রহণ করলেও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল তার অগাধ ভালোবাসা।তিনি চিরকাল বাম ঘরানার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। অকাতরে নিজের পরিবারের সম্পত্তি তিনি সাধারণের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে গেছেন।এই গুণী মানুষটির যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি জীবিত অবস্থায়। রাষ্ট্রীয় কোন পদক তার ভাগ্যে জোটেনি। তবে বাবুয়া বোস বেঁচে আছেন তার কর্মের মাধ্যমে। তিনি মেহেরপুর সহ দেশের সাংস্কৃতিক ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার পুরা নাম প্রসেনজিৎ বোস হলেও তিনি মেহেরপুর তথা সারা দেশে বাবুয়া বোস নামেই পরিচিত ছিলেন।


স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত নাটক ‘জল্লাদের দরবার’ বেতার নাটকে লারকানার নবাবজাদা ওরফে ভুট্টোর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। |কেবল অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা প্রত্যাশী অবরুদ্ধ ও শরণার্থী বাঙালিদের মনোবল বৃদ্ধিতে যে অবদান রেখেছেন তা’ তুলনাহীন।
যুদ্ধকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত নাটক ‘জল্লাদের দরবার’ আমরা নিয়মিত শুনতাম এবং খুব ভালো লাগতো। আনন্দ পেতাম এই ভেবে লারকানার নবাবজাদার চরিত্রে অভিনয় করছেন মেহেরপুরের কৃতী সন্তান আমাদের বাবুয়া বোস জেনে।
জন্ম, শৈশব, কৈশোর ও ছাত্র জীবন
১৯৪০ সালের ১০ অক্টোবর মেহেরপুর অঞ্চলের বোস পাড়াস্থ জমিদার বোস পরিবারের বসু ভিলায় জন্মগ্রহণ করেন প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া। তাঁর বাবার নাম জমিদার শ্রী হিরণ কুমার বোস ও মাতা শ্রীমতী অলোকা বোস। তাঁর দাদা সুরেন বোস ছিলেন নদীয়ার প্রভাবশালী জমিদার ও নদীয়া জজ কোর্টের সম্মানিত জজ। তার জমিদারীর এলাকা ছিল মেহেরপুরের বারাদী থেকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত পর্যন্ত।মেহেরপুরের বারাদীতে ছিল জমিদারের কাচারী বাড়ী। বারাদির কাচারি বাড়ি এখন ধ্বংস প্রাপ্ত। যা এখন সরকারের অধিগ্রহণ করেছে।
হীরণ কুমার বোসের চার ছেলে তিন মেয়ে। বড় সন্তান প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া (১০ অক্টোবর ১৯৪০ সাল-১৩ অক্টোবর ২০১৪ সাল),অমিতাভ বোস কাকুয়া (মৃত্যু ৯ই নভেম্বর ২০১৬ সাল), দীপংকর বোস সানুয়া,(মৃত্যু ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২সাল) ও অভিজিৎ বোস মানা (জীবত আছেন)। অমিতাভ বোস কাকুয়া ও দীপংকর বোস সানুয়া চিরকুমার ছিলেন। ছোট ভাই অভিজিৎ বোস মানা,তার মেয়ে অনিন্দিতা বোস ও ছেলে ঋদ্ধ বোস এই পরিবারকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। বাবুয়া বোসের বড় বোন চন্দনা সরকার,মোজো অঞ্জনা ঘোষ এবং ছোট কনকণা রায়।২০২০ সালে কনকণা রায় মারা যান।
প্রসেনজিৎ বোস প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশুনা করেন কৃষ্ণনগর মিশনারিজ স্কুলে। মেহেরপুর কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পাস করে জগন্নাথ কলেজে ইংরাজি বিভাগে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হন। পিতার মৃত্যু ও ব্যক্তিগত অনাগ্রহের কারণে স্নাতক ডিগ্রী লাভের আগেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাট চুকে যায় তাঁর।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন
বাবুয়া বোসের স্ত্রী শ্রীমতি বালা বোস। জানা যায় বাবুয়া বোস অনেক পরিণত বয়সে বিয়ে করেন। বিয়ের সময়ে বালা বোস মেহেরপুরে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালির মেয়ে। তার স্ত্রী শ্রীমতি বালা বোস ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। সহধর্মিণী বালা বোসকে হারিয়ে বাবুয়া বোস মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বার্ধ্যক্যজনিত রোগ তাঁকে পেয়ে বসে।
বাবুয়া বোস ব্যক্তিগতভাবে সাদামাটা জীবন-যাপন করেন। তাঁর খাওয়া-দাওয়া ছিল একজন আদর্শ বাঙালীর মতো। পছন্দের তরকারি ছিল কলার মোচা ও আলু পোস্ত রেসিপি। খাশির গোস্ত ইচ্ছা করলে ৫ কেজি খেয়ে ফেলতে পারতেন এবং খেতে পারতেন ৩০টা ডিম।
যুবক বয়সে তিনি ফুটবল খেলাকে পছন্দ করতেন। দীর্ঘদিন ফুটবল খেলেছেন। তিনি সবসময়ে গোলকিপার হিসেবে খেলতেন এবং তার সামনে গোল দেওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল।
প্রকৃতি, বৃক্ষরাজি ও ফুল-ফলের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল। তাইতো তিনি বসুভিলার গড়ে তুলেছিলেন সুন্দর ফুলের বাগান। এখানে অসংখ্য প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ রয়েছে। যা প্রকৃতিপ্রেমী সকল মানুষকে আকর্ষণ করে। তবে আগের সেই জৌলুস এখন আর নেই।
মেহেরপুরে ইতিহাস ও বসু ভিলা
মেহেরপুরের ইতিহাসে জমিদার বাড়ি বসু ভিলা অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা সাক্ষী। এঅঞ্চলের ইতিহাসে বাবুয়া বোসর দাদা জমিদার সুরেন বোসের কথা বিশেষভাবে লেখা আছে। উইকিপিডিয়ায় তাঁর সম্পর্কে মজার মজার কথা লেখা আছে। সেখানে লেখা হয়েছে,‘অবিভক্ত বাংলার এই অঞ্চলের জমিদার সুরেন বোসের জমিদার বাড়ির সিংহ ফটকের সামনেই ছিল বাসুদেবের সাবিত্রী আর রসকদম দোকানের অবস্থান। জমিদার বাড়িতে মাঝে মধ্যেই আসতেন ব্রিটিশ রাজের অমাত্যবর্গ, রাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণ্যমান্য অতিথি ও অন্য অঞ্চলের জমিদাররা। সুরেন বোস বাসুদেবের সেই অতুলনীয় স্বাদের সাবিত্রী ও রসকদম মিষ্টি পরিবেশন করে আপ্যায়ন করতেন তাঁদের।’
প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়ার পিতা হীরণ কুমার বোস ছিলেন প্রভাবশালী জমিদার এবং সাহিত্য-সঙ্গীত অনুরাগী।বাবুয়া বোসের কাকা কিরণ কুমার বোস ছিলেন বিশিষ্ট লেখক। তিনি ‘দস্যু ডাঃ হুইপ গ্রন্থের রচয়িতা।বেশ কয়েকটি বই রয়েছে তার। তিনি ১৯৭১সালের ২৫মার্চ মারা যান।
১৯২৮ সালের ৫ জুন মেহেরপুর হাই ইংলিশ স্কুল মাঠে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভাষণ দিয়েছিলেন এবং নেতাজি উঠেছিলেন জমিদার হীরণ কুমার বোসের ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে।
এ সম্পর্কে আমার বন্ধু কবি-সাংবাদিক তারিক-উল ইসলাম লিখেছেন, ‘মেহেরপুরে এসে নেতাজি উঠেছিলেন বোস বাড়িতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অভিনয় শিল্পী প্রসেনজিৎ বোস ও কাকুয়া বোসের বাবা-কাকারা ছিলেন কংগ্রেস ও নেতাজির সমর্থক। নেতাজির মেহেরপুর ত্যাগের পর ১৯২৮-এর সেই ৫ জুন এ বাড়ির দ্বিতীয় সন্তান অর্থাৎ বাবুয়া বোসের কাকা কিরণ বোসকে নেতাজি মনে করে পুলিশ আটক করেছিল। সুদর্শন কিরণ বোস ছিলেন অনেকটা নেতাজির মতো দেখতে। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক। রহস্যগদ্যের কয়েকটি বই রয়েছে তাঁর।
তারিক-উল ইসলাম লিখেছেন,‘সাল ১৯২৮। তারিখ ৫ জুন।মেহেরপুর হাই ইংলিশ স্কুল মাঠে ভাষণ দিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। তুলে ধরলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রযোজনীয়তা। স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করলেন মেহেরপুরবাসীকে। জানালেন মানুষের মুক্তির জন্য কী করণীয়। মেহেরপুর শহরের বড়বাজার মোড়ে এদিনই তিনি বিদেশি পণ্য বর্জন আন্দোলনের সূত্রপাত করেন।’
নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে মেহেরপুর বোস প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মেহেরপুর টকিজ নামে একটি প্রেক্ষাগৃহ। মেহেরপুরের মানুষ হুমড়ি খেয়ে সেই হলে ছবি দেখতো। সেই সব চলচ্চিত্রে সংলাপ থাকতো না। চলচ্চিত্রের ঘটনা তার নিয়ম অনুযায়ী চলতে থাকতো এবং সেখানে সংলাপ লিখিত আকারে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করা হতো। বোস প্রাঙ্গণে সেই প্রেক্ষাগৃহের কিছু অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে।
নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ১৯৭০ সালের পারিবারিক-নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র ‘ক খ গ ঘ ঙ’ চুয়াডাঙ্গা,মেহেরপুর,কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে শুটিং হয়েছিল। মেহেরপুরে শুটিং হয়েছিল বাবুয়া বোসের জমিদার বাড়িতে। মনে পড়ে এই ছবির শুটিং দেখতে মেহেরপুরের অসংখ্য মানুষ ভিড় করেছিল এবং ভিড়ের কারণে বাড়ির প্রাচীর ভেঙ্গে গিয়েছিল। এতে প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক এবং কবরী। এছাড়া অন্যান্য পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনোয়ার হোসেন, রাজু আহমেদ, হাসমত, তন্দ্রা ইসলাম, নাজনীন এবং আব্দুল আলী লালু।
বাবুয়া বোস ‘স্মরণের জানালা’ নামে একটি সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন।
প্রসেনজিৎ বোসের সাংক্ষাৎকার ও আমরা
প্রসেনজিৎ বোসকে আমি ছোট বেলা থেকে শ্রদ্ধা করতাম। মেহেরপুরে থাকাকালীন সময়ে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। আমার বড় চাচা নঈমউদ্দিন শেখ যুদ্ধকালীন সময়ে মেহেরপুর শহর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মেহেরপুর শহর সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক এবং আমার বাবা রইসউদ্দিন শেখ মেহেরপুর শহর সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। তাই আমাকে তিনি চিনতেন। আমি মেহেরপুরে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থাকতাম,ধারপাত খেলাঘর আসরের নেতৃত্ব দিতাম,সাংবাদিকতা করতাম। সে হিসেবে তিনি আমাকে ভালোবাসতেন। মৃত্যুর বছর খানেক আগে প্রসেনজিৎ বোসের কাছে তাঁর একটি ইন্টারভিউ নিতে বসু ভিলায় গিয়েছিলাম। আমার সাথে ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক-কবি সামাদুল ইসলাম ও সাংবাদিক মেহের আমজাদ। মনে আছে তিনি তখন অসুস্থ। তবুও তিনি অনেক কষ্ট করে উপর থেকে নীচে নেমে আসলেন এবং আমাদের সাথে নীচের রুমে গোল টেবিলে বসে জীবনের বিভিন্ন কথা বলেছিলেন। মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক জগতের অতীতের মজার মজার কাহিনী তুলে ধরলেন, ‘জল্লাদের দরবার’-এর স্মৃতিচারণ করলেন এবং জাতীয় পর্যায়ে তাঁর মূল্যায়নের দাবি জানালেন। সাথে ছিলেন তাঁর ছোট ভাই অভিজিৎ বোস মানা। সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী, দৈনিক মাথাভা্ঙ্গা ও দৈনিক বাংলাদেশ বার্তাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় এই ইন্টারভিউটি প্রকাশ পেয়েছিল।
মেহেরপুরের সংস্কৃতি ও বাবুয়া বোস
১৯২০-১৯৩০ সালের দিকে স্বদেশী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন মেহেরপুরের সংস্কৃতির অঙ্গন সেই আন্দোলনের হাওয়ায় আন্দোলিত হয়েছে। স্বদেশী আন্দোলনকে সার্থকভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য মেহেরপুরে শুরু হয় থিয়েটার বা নাট্য আন্দোলন।
স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া। এ সময়ে আরো যারা মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা হলেন ওস্তাদ মীর মোজাফ্ফর আলী, মফিজুর রহমান, এডভোকেট হাফিজুর রহমান,এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক,শিল্পী আক্কাস আলী,ননীগোপাল ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মীরু, কুশনিয়া আগরওয়ালা,অনিল গাঙ্গলী,গোপাল কর্মকার, শাহবাজ উদ্দিন আহমেদ (নিজ্জু) প্রমুখ।
১৯৬৭ সালের ১লা বৈশাখ তারিখে কতিপয় সংস্কৃতিমনা ও ক্রীড়ামোদী ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে মেহেরপুর প্রগতি পরিমেল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। এ প্রতিষ্ঠান মূলতঃ সংস্কৃতিও ক্রীড়া দৃষ্টিকোণে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রগতি পরিমেলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন প্রয়াত শাহবাজ উদ্দীন লিজ্জু। প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া প্রগতি পরিমেলের নাট্য পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার পর ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক প্রসার লাভ করার পাশাপাশি সংস্কৃতিক অঙ্গনে অনুপ্রবেশ করতে সচেষ্ট হয়। প্রগতি পরিমেল থেকেই মেহেরপুরে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তি, ১ল বৈশাখ ও অন্যান্য জাতীয় দিবস উদযাপন ছাড়াও স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি প্রথম নাট্য অবদান রাখে। কোহিনুর, মাটির মা, চন্ডিতলার মন্দির এ তিনটি নাটক বাবুয়া বোসের বোস প্রাঙ্গণে মঞ্চসহ করে প্রগতি পরিমেল এক সহায়ী রেকর্ড সৃষ্টি করে।
প্রসেনজিৎ বোস ছাত্র জীবন থেকেই ছিলেন মুক্তচিন্তার অধিকারী, সংস্কৃতিমনস্ক ও নাট্যামোদী। নাটকের প্রতি ছিল তার প্রবল অনুরাগ। নাটকের প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন স্কুল শিক্ষক প্রয়াত শিবনারায়াণ চক্রবর্তীর কাছে। ১৯৫৪ সালে প্রয়াত শিবনারায়াণ চক্রবর্তী পরিচালিত ‘রঞ্জিত সিংহ’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাবুয়া বোস নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। চার দশক ধরে তিনি মঞ্চ, রেডিও ও টেলিভিশনে অসংখ্য নাটক ও যাত্রাপালায় সুনাম ও সাফল্যের সাথে অভিনয় করেছেন। তিনি মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক জগতের অগ্রনায়ক ছিলেন। তার বাড়ির সামনে বিশাল খোলা মাঠে যাত্রা-নাটক মঞ্চস্থ হতো। সেখানে তিনি নেতৃত্ব দিতেন ও অভিনয় করেছেন। ঢাকা রেডিও ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তিনি নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। রেডিওতে বহু নাটকে তিনি অংশ নিয়েছেন। বিটিভিতে আতিকুল হক প্রযোজিত দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পন নাটকে তিনি অভিনয় করেন। বিটিভির জনপ্রিয় ইত্যাদি অনুষ্ঠানে তিনি মাঝে মধ্যে অংশ নিতেন। কলকাতার ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভোলপমেন্ট কর্পোরেশনের সদস্য ছিলেন তিনি। শেষ জীবনে ঢাকার একটি এফএম রেডিও-এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মনে পড়ে, বাবুয়া বোসের নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে মেহেরপুর হাইস্কুল মাঠে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রা মঞ্চস্থ হয়েছিল। সেখানে নবাব চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন এবং আলেয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী আনোয়ারা। সেখানে বাবুয়া বোসও অভিনয় করেছিলেন। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন ও অভিনেত্রী আনোয়ারাসহ ঢাকা থেকে আগত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা রাত্রি যাপন ও খাওয়া-দাওয়া করেন বাবুয়া বোসের বাড়িতে।
মুক্তিযুদ্ধ,জল্লাদের দরবার ও বাবুয়া বোস
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও বেতারকেন্দ্রের কর্মীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার (৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ) প্রদান করে। এসময় সকল বেতারকর্মীদের ধীরে ধীরে মুজিবনগরে নিয়ে আসা হতে থাকে। ঢাকা থেকেও ঢাকা বেতারের শিল্পীরা আসতে থাকেন। প্রতিষ্ঠা হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিছু নিয়মিত অনুষ্ঠান ছিল পবিত্র কোরআনের বাণী, চরমপত্র, মুক্তিযুদ্ধের গান, যুদ্ধক্ষেত্রের খবরাখবর, রণাঙ্গনের সাফল্যকাহিনী, সংবাদ বুলেটিন, ধর্মীয় কথিকা, বজ্রকণ্ঠ, নাটক, সাহিত্য আসর এবং রক্তের আখরে লিখি। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল অনুষ্ঠান এম আর আখতার মুকুল উপস্থাপিত চরমপত্র। এখানে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অসংলগ্ন অবস্থানকে পুরনো ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে তুলে ধরতেন। চরমপত্রের পরিকল্পনা করেন আবদুল মান্নান। আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান জল্লাদের দরবার পরিচালনা করতেন কল্যাণ মিত্র। অনুষ্ঠানটিতে ইয়াহিয়া খানকে “কেল্লা ফতে খান”হিসেবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলা হত। “বজ্র কণ্ঠ” অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের অংশবিশেষ সম্প্রচার করা হত। বেতার কেন্দ্রে তরুণ শিল্পীরা দেশাত্মবোধক ও অনুপ্রেরণাদায়ক গান করতেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে জল্লাদের দরবার লিখতেন প্রখ্যাত কুষ্টিয়ার কৃতী সন্তান নাট্যকার কল্যাণ মিত্র। জল্লাদ, দুর্মুখ, নবাবজাদা, টিটিয়া খান, পিয়জী খান, গর্ভণর এবং বেগমের ভূমিকায় অভিনয় করতেন যথাক্রমে কুষ্টিয়ার কৃতী সন্তান চিত্রাভিনেতা রাজু আহমেদ, চিত্র পরিচালক নারায়ণ ঘোষ, মেহেরপুরের কৃতী সন্তান প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া, আজমল হুদা মিঠু,ফিরোজ ইফতিখার, জহিরুল হক , বুলবুল মহলানবীশ ও প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়ার ভাই অমিতাভ বোস কাকুয়া। ।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ও দেশ স্বাধীনের পরের বিভিন্ন সময়ে মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী বাবুয়া বোসের বাড়িতে থেকেছেন। তিনি থাকতেন বসু ভিলার তিন তলার রুমে। সাংবাদিক মার্ক টালি, বিখ্যাত কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত, বিখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তসহ অনেক বিশিষ্টজন তাঁর বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করে মেহেরপুরের বিধ্বস্ত অবস্থার খবর সংগ্রহ করেছেন। তৎকালীন মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরীর (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা) সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতা করেছেন। নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ফান্ডে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে মেহেরপুরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক তার বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহলের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভের আশায় মেহেরপুর থেকে এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল কলকাতা যান। এই দলে কলকাতা থেকে যুক্ত হন মেহেরপুরের কৃতী সন্তান জল্লাদের দরবারের খ্যাতিমান অভিনেতা বাবুয়া বোসের ভাই অমিতাভ বোস কাকুয়া। তাঁরা আনন্দবাজার ও অমৃতবাজার পত্রিকা অফিসে যান। তারা বিশিষ্ট সাহিত্যিক অবধূত ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, বিশিষ্ট সাহিত্যিক দক্ষিণারঞ্জন বসুসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে তার সম্পর্ক
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী বিখ্যাত সাংবাদিক,গ্রন্থকার, কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী,মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্রের পরিচালক এম আর আখতার মুকুল,নাট্যকার কল্যাণ মিত্র,বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা, চলচ্চিত্র নায়ক রাজ্জাক, অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, চিত্রাভিনেতা রাজু আহমেদ,মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মেহেরপুরের গণ মানুষের নেতা মোহাম্মদ সহিউদ্দিন বিশ্বাস,যুদ্ধকালীন সময়ের মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, শিক্ষক শিবনারায়ণ চক্রবর্তী,যুদ্ধকালীন সময়ের মেহেরপুর মহকুমা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন,মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শাহবাজ উদ্দিন আহমেদ (নিজ্জু),শিল্পী শাহীন সামাদ,সাংস্কৃতিক সংগঠক মফিজুর রহমান, এডভোকেট হাফিজুর রহমান, সাংস্কৃতিক সংগঠক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মীরু, ননী গোপাল ভট্টাচার্য, ন্যাপ নেতা মোজাম্মেল হক, শিক্ষক আওলাদ হোসেন, কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদসহ মেহেরপুরের সর্বস্তরের মানুষ ও দেশের সাংস্কৃতিক জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। একাত্তরের যুদ্ধের সময়ে তিনি প্রায়ই ভারতের বেতাই লালবাজার ক্যাম্পে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও জননেতা মোহাম্মদ ছহিউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ-খবর রাখতেন এবং কলকাতাতেও বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের খোঁজ-খবর রাখতেন। তিনি নিজেদের পৈত্রিক জমি বিক্রি করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন।
‘এই মাটি ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?’
সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি আর হানাহানিতে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র ও আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের সোনালী পাতা, সম্প্রীতির আলো কখনও কখনও নিভে যেতে চেয়েছে। তারপরও প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে বাবুয়া বোস কোথাও যেতে চাননি। তার স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল: “যে মাটির কণায় লুকিয়ে আছে আমার শৈশব-কৈাশোরের স্বপ্ন-ভালবাসা, যে মাটির গন্ধে লেগে আছে আমার যৌবনের উদ্দামতা, যে মাটির জন্য আমি যুদ্ধ করেছি, সে মাটি ছেড়ে আমি কোথায় যাবো?”
মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান
প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর মেহেরপুর বোসপাড়ার নিজ বাড়ি বোস ভবনে রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া দীর্ঘদিন ধরে বার্ধ্যক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ঐ দিন সকাল সাড়ে ১০টায় মেহেরপুর শহীদ ড. সামসুজ্জোহা পার্কে প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়াকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে সকাল ১১টায় ড. সামসুজ্জোহা পার্ক থেকে শেষকৃত্যের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর ১২টায় বামনপাড়া শ্মশানঘাটে সম্পন্ন হয় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।
রাজনীতি ও সমাজকর্ম
প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া প্রায় তিন দশক ধরে জেলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-মো.) এর সভাপতি, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেহেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে দুই বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রথমবার ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ও দ্বিতীয়বার চেয়ারম্যান পদে। তার মার্কা ছিল হারিকেন। মেহেরপুর পৌর কলেজের লাইব্রেরী ভবনের অর্থ সংগ্রহেরও কাজ করছেন তিনি। বাবুয়া বোস সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিতের পাশাপাশি একজন বই পড়ুয়া মানুষ ছিলেন। বাবুয়া বোসের সহযোগিতায় তাঁর এক বন্ধু পৌর কলেজে একটি স্বতন্ত্র লাইব্রেরী করে দিয়েছেন যা মেহেরপুরের ইতিহাসে বিরল।পাশাপাশি একজন সাংগঠনিক ব্যক্তি হিসেবে হিন্দু বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন।
বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি
প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া তাঁর কর্মময় জীবনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, অরিন্দম সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী,বাংলাদেশ টেলিভিশন শিল্পী পরিষদ সহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন।
৭ মে ২০১৪ বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু স্বাধীনতার স্বীকৃতি স্বরুপ তাঁকে শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাবুয়া বোসের পক্ষে পদক গ্রহণ করেন তার পরিবারের কন্যা অনিন্দিতা বোস।
গত ৪ ডিসেম্বর ২০১৬ বিশিষ্ট অভিনেতা স্বাধীনতার শব্দ সৈনিক বাবুয়া বোসকে মরনোত্তর আজীবন সম্মাননা প্রদান করে মিডিয়া জার্নালিষ্ট ফোরাম বাংলাদেশ। রাজধানীর একটি হোটেলে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা তুলে ধরেছেন আহবায়ক সৌরভ সোহাগ। মরনোত্তর সম্মাননা পদক তুলে দেন বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ,ফ,ম, মোজ্জামেল হক। বাবুয়া বোসের পক্ষে পদক গ্রহণ করেন তার পরিবারের কন্যা অনিন্দিতা বোস।
৭ ডিসেম্বর ২০১২ মেহেরপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়াসহ পাঁচজন গুণীব্যক্তিকে সস্মাননা দেওয়া হয়েছে। অন্যরা হচ্ছেন শিল্পী শেখ জমির উদ্দিন, অ্যাড. হাফিজুর রহমান, আজিজুল হক মাস্টার,ও গোলাম মোস্তফা।
জীবনের স্বপ্ন ও কুখ্যাত রাজাকারদের ফাঁসি
তাঁর জীবনের একটি সাধনা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে কুখ্যাত রাজাকারদের ফাঁসি যেন কার্যকর করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের আমলে যখন কুখ্যাত রাজাকারদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়, তখন তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূল্যায়ন
জনপ্রশসন প্রতিমন্ত্রী প্রফেসর ফরহাদ হোসেন এমপি তাঁর স্মরণ সভায় বলেন, ‘অত্যন্ত বড় মনের একজন মানুষ ছিলেন বাবুয়া বোস। মানুষকে হৃদয় দিয়ে কিভাবে জয় করতে হয় তা তিনি জানতেন। দেশের সকল জ্ঞানী-গুণী মানুষদের চিন্তাভাবনার সাথে তার চিন্তা চেতনার চমৎকার মিল ছিল। একজন সরল, নিঃঅহংকারী মানুষ ছিলেন তিনি। তার কাছে সবার যাতায়াত ছিলো অনায়াসে, হিন্দু মুসলিম ,বৌদ্ধ ধর্ম কোনো বিষয় ছিলো না। সব ধর্মের মানুষের মনে অবলীলায় তিনি স্থান করে নিয়েছেন তার এই সরলতার গুণ দিয়ে।’
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক সৈকত রুশদী লিখেছেন, গভীর শ্রদ্ধা জানাই মুক্তিযুদ্ধের এই শব্দ সৈনিকের প্রতি। অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা প্রত্যাশী অবরুদ্ধ ও শরণার্থী বাঙালিদের মনোবল বৃদ্ধিতে যে অবদান রেখেছেন তা’ তুলনাহীন। জীবদ্দশায় তাঁকে আমরা যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি। মেহেরপুরবাসী হিসেবে এবং জাতি হিসেবে এটি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা।
সৈকত রুশদী লিখেছেন, স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তী জয়ন্তী পার হলেও সেই সময়ের তরুণ, যুবা মুক্তিযোদ্ধারা, যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের অহংকার, বিদায় নিচ্ছেন একে একে | স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁদেরকে যোগ্য সম্মান প্রদান এবং আত্মসম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে জীবন যাপনে সহায়তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও এই জাতি কতোটা করেছে, তা’ কী আমরা কখনও ভেবে দেখেছি? খন্ডিতভাবে বিভিন্ন সরকার তাঁদের সমমনা ও ভিন্নমতের মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে পৃথকভাবে বিবেচনা করেছেন এবং করে আসছেন, তা’ কী আমাদের জন্য গৌরবজনক ! জাতি হিসেবে কী আমরা পারিনা দলমত নির্বিশেষে তাঁদের অবদানকে সম্মান দেখানোর ন্যূনতম একটি রাষ্ট্রাচার নির্ধারণে একমত হতে? সম্মানজনকভাবে তাঁদের জীবনধারণের ব্যবস্থা করে দিতে |
কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট কবি-আবৃত্তিকার বিধান চন্দ্র রায় লিখেছেন,বাবুয়া’দার সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ছোটবেলায় যখন আমি স্কুলের নীচু ক্লাসের ছাত্র। তখন থেকেই আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার ভক্ত, তার বাচন ভঙ্গীমায়। এমন কোন বিষয় ছিল না তিনি জানতেন না। কি সঙ্গীত,কি আবৃত্তি, কি নাটক বা যাত্রার কোন ডায়লগ। তিনি অনর্গল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, ওমর খৈয়াম উচ্চারণ করতে পারতেন, কোন পুস্তকের সাহায্য তার লাগতো না।
সত্যি বলতে কি আমার কৈশোরে বাবুয়াদা ছিল এক অপার বিষ্ময়। তারপর একসময় আমার পিসির মেয়ে বালাদি, বালা রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে গেল। তিনি সম্পর্কে আমার জামাইবাবু হয়ে গেলেন। তখন আরো ঘনিষ্ঠ ভাবে পেলাম তাকে। কিন্তু সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে তার ভালো নাম প্রসেনজিৎ বোস তা জেনেছিলাম বিয়ের কার্ড দেখে। এখন বিষয় টা ভাবলে একা একাই হাসি নিজের মনে।প্রসেনজিৎ বোস ওরফে বাবুয়া ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শব্দ সৈনিক, রাজনীতিবিদ,সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,বিশিষ্ট ব্যবসায়ী,মানুষের পরোপকারী বন্ধু ও সাদা মনের মানুষ। তাঁর সংস্পর্শে যে একবার এসেছে সেই তার গুণ মুগ্ধ ভক্ত হয়ে গেছে এবং উপকৃত হয়েছে। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি বড় সন্তান হিসেবে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রেঙ্গুন- কলকাতা – ঢাকা।
মেহেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অ্ধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আমিন (ধুমকেতু) লিখেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সামন্ত সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের ঘেরটোপের মধ্যে প্রসেনজিৎ বোস নিজেকে আটকিয়ে রাখেননি কখনও। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞান, সংস্কৃতিভাবনা, জীবনচর্যার ভরকেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং মানুষ। তার আভিজাত্য- কৌলিন্য তাকে সমাজবিমুখ করতে পারেনি কোনোভাবেই। আমৃত্যু হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, সদালাপী প্রসেনজিৎ বোসের নশ্বর দেহ হয়তো পঞ্চভুতে মিশে যাবে একদিন, কিন্তু সংগ্রামী প্রসোনজিৎ বোস বেঁচে থাকবেন অনেকদিন।
আমাদের প্রত্যাশা
পরিশেষে বলবো প্রসেনজিৎ বোস-বাবুয়া বেঁচে আছেন তার কর্মের মাধ্যমে, তিনি বেঁচে থাকবেন মেহেরপুর সহ দেশের সাংস্কৃতিক ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে। তাঁকে মেহেরপুরের সর্বস্তরের মানুষ তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশের সকল মানুষ স্মরণ করবো চিরকাল। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমাদের দাবি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অহংকার বাবুয়া বোসকে রাষ্ট্রীয় কোন পদক প্রদান করা হোক এবং মেহেরপুরে তাঁর নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা হোক। সরকার মেহেরপুরে একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। আমাদের দাবি এই বেতার কেন্দ্রের করণ করা হোক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং রেডিও স্টেশনের মূল ভবনের নাম করণ করা হোক শব্দসৈনিক প্রসেনজিৎ বোস-বাবুয়া ভবন। মেহেরপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়ামের নাম বাবুয়া বোস মিলনায়তন করা হোক। মেহেরপুর পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি প্রসেনজিৎ বোস-বাবুয়ার নামে মেহেরপুরের একটি সড়ক নামকরণ করা হোক। মেহেরপুরের ইতিহাসে জমিদার বাড়ি বসু ভিলা একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন। এঅঞ্চলের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা সাক্ষী এই ভবন। আমাদের প্রত্যাশা জমিদার বাড়ি বসু ভিলাকে সংরক্ষণ করা হোক। মেহেরপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির কাছে আমাদের প্রত্যাশা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের লেখা ও তাঁর জীবনের বিভিন্ন ছবি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শব্দ সৈনিক বাবুয়া বোসের নামে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা করা হোক। বোস পরিবারের সদস্যরাও এব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারেন। জয়তু স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক প্রসোনজিৎ বোস।
তথ্য সূত্র
১.প্রয়াণে মুক্তিযুদ্ধের শব্দ সৈনিক স্বাধীন বাংলা বাবুয়া বোস- সৈকত রুশদী
২.সুবর্ণ মেহেরপুর, পেছনের খবর-তারিক-উল ইসলাম, মেহেরপুর প্রেসক্লাব স্মরণিকা
৩.আমাদের বাবুয়াদা-বিধান চন্দ্র রায়
৪. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর-রফিকুর রশীদ প্রথম প্রকাশ বই মেলা ২০১০
৫.মেহেরপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-তোজাম্মেল আযম
৬.মঞ্চসারথি নাট্যজন প্রসেনজিৎ বোস-বাবুয়া-আবদুল্লাহ আল আমিন
৭.প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়ার ভাইঝি অনিন্দিতা বোসের সাথে সাক্ষাৎকার
৮ .মুহম্মদ রবীউল আলম সম্পাদিত সাপ্তাহিক পলাশী-২ সেপ্টেম্বর-২০০৫
৯.বিভিন্ন পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা ও ফেইসবুকে তার সম্পর্কে লেখা

লেখক: সাপ্তাহিক মুক্তিবাণীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক