স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

44
Social Share

জাতির পিতার কন্যা বাংলাদেশের চার-চারবার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ অর্জনের জন্য। যখন এ স্বীকৃতি পেল তখন বাংলাদেশের মানুষ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে- এটি আমাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয়।

আজ ১ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির পিতার নেতৃতে বাঙালী জাতি চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার জন্য সমগ্র দেশে রাজপথে নেমে আসে এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে ফেরে ঘরে। আজকের এই শুভদিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, স্মরণ করি জাতীয় চার নেতাকে, স্মরণ করি ত্রিশ লাখ শহীদকে, স্মরণ করি ২ লাখ মা-বোনকে, যাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ।

গত শুক্রবার রাতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) পাঁচদিনের বৈঠক শেষে এ সুপারিশ করেছে। সিডিপির এলডিসি সংক্রান্ত উপগ্রুপের প্রধান টেফেরি টেসফাসো এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বের হতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ তুলনামূলক দুর্বল, সেসব দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে পাঁচ বছর পর এলডিসি থেকে বের হয়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যাবে বাংলাদেশ। সাধারণত সিডিপির চূড়ান্ত সুপারিশের তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু করোনার প্রভাব মোকাবেলা করে প্রস্তুতি নিতে বাড়তি দুই বছর সময় দেয়া হয়েছে। সিডিপির সঙ্গে গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বাংলাদেশও বাড়তি দুই বছর সময় চেয়েছিল।

এলডিসি থেকে কোন্ কোন্ দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে থাকে সিডিপি। এ জন্য প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। যে কোন দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা এর নিচে থাকতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পেতে হবে। মাথাপিছু আয় সূচকে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকতে হবে। মাথাপিছু আয় হিসাবটি জাতিসংঘ করেছে এ্যাটলাস পদ্ধতিতে। সেখানে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করে তিন বছরের গড় হিসাব করা হয়।

২০১৮ সালে প্রথম দফায় বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবারও প্রথমবারের মতো তিনটি সূচকেই প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছে। এলডিসি থেকে বের হতে সিডিপির পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি পেতে হয়। এলডিসি থেকে বের হয়ে এলে সুবিধার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি হবে, উন্নয়নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যাবে, বিদেশী বিনিয়োগ আরও আকৃষ্ট হবে, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং বাড়বে, বড় ধরনের ব্র্যান্ডিং হবে। বাংলাদেশ এখন খুব একটা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয় । উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য যা যা দরকার, তা করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। ‘জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে টেনে তুলে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের যে উন্নয়নের চিত্র আমাদের সামনে তাতে বুক ভরে যায়। ২০০৮-০৯ বছরে জিডিপির আকার ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ সালে তা ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮-০৯ বছরে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫.৫৭ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৮-১৯ বছরে তা ৪০ দশমিক পাঁচ-চার বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ বছরের ৭ দশমিক চার-সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪ দশমিক শূন্য-তিন বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ এবং হত-দরিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২০.৫ ভাগ এবং হতদরিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে।

২০০৯-১০ সালে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুত উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াটে উন্নীত এবং বিদ্যুত সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয় এবং মাছ-মাংস, ডিম, শাক-সবজি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণমুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। উন্নয়ন অভিযাত্রায় ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুবিধা শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’-এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দৃশ্যমান। করোনা নিয়ন্ত্রণে বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার দুটোই নিম্নস্তরে। বিশ্বের ১৩০টি দেশ যেখানে টিকা পায়নি, সেখানে আমাদের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ টিকা গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ করে ফেলেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়ী ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে জায়গা করে নেবে। তবে এ অর্জনকে সুসংহত এবং টেকসই করার ওপর জোর দিতে হবে সবাইকে।

এ লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশকিছু মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের বিপুল কর্মকাণ্ড দ্রুত এগিয়ে চলেছে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পরিকল্পনা ও তত্ত্ব¡াবধানে।

এ সব কিছুর পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ভিশন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি ইশতেহারে যুক্ত করেন নতুন উন্নয়ন ও বাংলাদেশের আধুনিকায়নের ধারা- ‘রূপকল্প ২০২১’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বা ‘দিন বদলের সনদ।’ ২০২১ এর অনেক আগেই রূপকল্পের অধিকাংশ কর্মসূচী বাস্তবায়ন হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃতে দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে, তখন তিনি ২০১৪ এর নির্বাচনের ইশতেহারে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নিয়ে ঘোষণা দিলেন ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’ ২০১৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করলেন, ‘সমৃদ্ধি অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’, যার মধ্যে গ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রাধান্য পেল। গ্রামে পাওয়া যাবে শহরের সুবিধা। তিনি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ‘উন্নত বাংলাদেশ ২০৪১’ এবং ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সততা, কূটনীতি, পরিকল্পনা বাংলাদেশকে আজ বিশ্বের দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ অচিরেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃতে দলমত-নির্বিশেষে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করি।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়