ভিনিউজ ডেস্ক
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা (Ceuta) সীমান্ত দিয়ে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসীর আকস্মিক প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী মঙ্গলবার ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা জরুরি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে বসছেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপের কয়েকটি দেশের প্রতিক্রিয়াকে “স্বার্থপর, বিভাজনমূলক ও আইনবহির্ভূত” বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু স্পেনের নয়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ দায়িত্ব।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাসকা জানিয়েছেন, ৩০ জুলাই সীমান্ত অতিক্রম করে সেউতায় প্রবেশকারী অভিবাসীদের প্রায় সবাইকে ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সীমান্ত পারাপারের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৭ জনে পৌঁছেছে বলেও তিনি জানান।
এই ঘটনার পর ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্থগিত করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার পরিস্থিতিকে “ভয়াবহ” আখ্যা দিয়ে বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ইতালির এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। একই সঙ্গে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিশ স্পেনের শেনজেন সদস্যপদ সাময়িক স্থগিতের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য দেশের মধ্যে ২২টি দেশ জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়ে এক যৌথ চিঠিতে স্পেনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, স্পেন ও মরক্কোর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় অভিবাসীদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। পাশাপাশি সীমান্তে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতে ইইউর সহায়তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে দেশগুলো।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েনের কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ উল্লেখ করেন, ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে স্পেন সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে এবং ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে কোনো অননুমোদিত অভিবাসী প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার ভুয়া তথ্য, রাজনৈতিক স্বার্থ ও পূর্বধারণার ভিত্তিতে স্পেনকে দোষারোপ করছে। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, সেউতা শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয়।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানান, তিনি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং যুক্তরাজ্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সেউতার পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে গেছে এবং ভবিষ্যতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সমুদ্রপথে ভাসমান প্রতিরোধক (ইনফ্ল্যাটেবল মেরিটাইম ব্যারিয়ার) স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
ফ্রান্স ইতোমধ্যে স্পেন সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে। পর্তুগালও সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস স্পেনের সীমান্ত সুরক্ষার উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে মরক্কোর প্রতি অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই সংকটের জন্য স্পেনের অভিবাসন নীতিকে দায়ী করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে “বিপর্যয়” উল্লেখ করে বলেন, এটি যেন একটি দেশের ওপর ব্যাপক অনুপ্রবেশের মতো।
প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই অভিবাসী ঢলের জন্য মানবপাচারকারী চক্রকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়কে পাচারকারীরা নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়, যার সুযোগ নিয়ে হাজারো মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে।
উল্লেখ্য, গত জুনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সেউতা বা মেলিয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সেউতা ও মেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট। ২০২১ সালেও কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছিল। চলতি বছরের এই নজিরবিহীন অভিবাসী ঢল ইউরোপে অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শেনজেন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি




