সোনালি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়

20
Social Share

 

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্ণালি ময়ূরপুচ্ছের ওপর আরো কিছু স্বর্ণালি পালক জুড়ে দিলেন। করোনার কারণে বৈঠকটি ভার্চুয়ালি হলেও দুই নেতার চোখ ও মুখের ভাষায় বোঝাপড়ার মাত্রাটা কতখানি উঁচু সেটা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি আন্তরিকতার উষ্ণ বাতাসে উভয় দেশের জনমানুষ মুগ্ধ হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি পুনরায় উচ্চারণ করেছেন, ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ আগের মতো আগামী দিনেও সব কিছুতে এক নম্বর ও সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে। টিকাসহ করোনা-উত্তর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চেতনার বন্ধনে আবদ্ধ দুই দেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা—দুজনই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্বের উচ্চতায় উঠেছেন। সুতরাং তাদের একটি কথা বা ইশারার মূল্য এবং তার বিস্তৃতি অনেক বড় ও ব্যাপক। বেশি কথা বলার প্রয়োজন হয় না। ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সংবলিত রাষ্ট্র গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুনভাবে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতের সব দলের সরকারের সঙ্গে যে বোঝাপড়াটা তৈরি হয়েছে, তা এককথায় অসাধারণ। সেটি শুধুই এগিয়ে যাচ্ছে, যার আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি হলো ১৭ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। এই শীর্ষ বৈঠকটি হলো এমন সময় যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী একেবারে দ্বারপ্রান্তে। উপরন্তু এক দিন আগেই ছিল আমাদের বিজয় দিবস, যেটি ভারতের জন্যও অন্যতম একটি বিজয়ের দিন। একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ এবং তাতে ভারতের অসাধারণ বিরল ভূমিকা, বিগত দিনের মতো আগামী দিনেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ও নির্ধারক হিসেবে কাজ করবে শুধু নয়, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র রচনায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে। সম্পর্ক উন্নয়নে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধনের উষ্ণতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৭ ডিসেম্বর চিলাহাটি ও হলদিবাড়ীতে উভয় দেশের হাজার হাজার মানুষের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে প্রকাশ পেয়েছে; বিচ্ছিন্নতা নয়, বন্ধনই দুই দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশের চিলাহাটি থেকে ভারতের কুচবিহারের হলদিবাড়ী পর্যন্ত রেল রুট পুনরায় পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ৫৫ বছর পর যৌথভাবে উদ্বোধন করলেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এই রুটে ঢাকা টু শিলিগুড়ি যাত্রীবাহী ট্রেন ২০২১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হবে, পরে সেটি নেপাল-ভুটান পর্যন্ত যাবে।

পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানির বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সীমান্তের উভয় পাশের মানুষের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সার্বিক আদান-প্রদানে আত্মার বন্ধন তৈরির যে সুযোগ হবে তার মূল্য অঙ্ক কষে মাপা যায় না। সব কিছু স্থূল চোখে দেখতে অভ্যস্ত মানুষ এর মূল্য বুঝতে চায় না। মেহেরপুরের মুজিবনগর থেকে ভারতে প্রবেশের রাস্তাটিকে স্বাধীনতা সড়ক নামকরণের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বৈঠকের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৩৯টি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে শীর্ষ বৈঠকের সব বিষয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে, যেটি ওই দিন বিকেলেই বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টালে এসেছে। তাতে দুই দেশের সম্পর্কের সব বিষয়ই আলোচনায় এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈঠকের শুরুতেই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে ভারত সহায়তা দেবে। স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ যৌথভাবে পানি উন্নয়নের সব বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের খসড়া অনুযায়ী তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এবং নরেন্দ্র মোদি আগের মতো আশার বাণী শুনিয়েছেন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়নসহ সীমান্ত হত্যা বন্ধে উভয় দেশ জিরো টলারেন্সের কথা আবার ব্যক্ত করেছে। কুশিয়ারা, ইছামতী, রায়মঙ্গলসহ কয়েকটি নদীর মধ্যবর্তী সীমানা চিহ্নিতকরণে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী জানুয়ারি থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে ভারত আরো জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারে সে জন্য ভারত ভূমিকা রাখবে। অক্সফোর্ডের আবিষ্কৃত করোনা টিকা ভারত উৎপাদন করবে এবং সেখান থেকে প্রথমেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পাবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক বায়োপিক নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, যার নির্মাণকাজ আসছে জানুয়ারি থেকে শুরু হবে।

পৃথিবীর সব জায়গায়ই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অনেক বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য থাকে এবং সংবেদনশীল বিষয়াদির মীমাংসায় পৌঁছাতে সময় লাগে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক আদর্শের জায়গায় দুই দেশের অবস্থান যদি এক ও অভিন্ন হয় তাহলে দু-একটি ইস্যুতে মীমাংসায় পৌঁছাতে সময় লাগলেও সম্পর্কের মোমেন্টাম ও গতিমাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং ক্রমেই তা এগোতে থাকে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই কথা শতভাগ সত্য। গত ৪৯ বছরের ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয়। গত ১২ বছর দুই দেশই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শের ওপর পরিচালিত হচ্ছে বলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের মডেল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ কাজটি অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রগাঢ় রাজনৈতিক সাহস ও বিচক্ষণতা এবং তার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপক্বতা সব কিছু সহজ করে দিয়েছে। আজকে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, ভারতের সব জাতীয় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবর্গ, মূল স্রোতের মিডিয়া এবং সুধীসমাজ উপলব্ধি করেছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-সংবলিত উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা বাংলাদেশে বিরাজমান থাকা ভারতের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তার জন্য অতি অপরিহার্য, এর কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং গত ১২ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক শুধুই এগিয়েছে, যা এখন একাত্তরের পর্যায়ে উঠে সোনালি অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। কাজেই ১৭ ডিসেম্বরের শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে, গত ১২ বছরের আদান-প্রদানের বৃহত্তর আয়নায় সেটি দেখতে হবে। আগের অর্জনগুলোর ওপর একটু নজর বোলাই। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়, যেখানে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে তিন গুণ বেশি ভূমির ওপর সার্বভৌম অধিকার পেয়েছে। তারপর যেখানে পৃথিবীজুড়ে স্থল ও সমুদ্র সীমানা নিয়ে ক্রমেই সংঘাত বেড়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিশাল সমুদ্র এলাকার একচ্ছত্র মালিকানা পেয়েছে। অচিহ্নিত স্থলসীমানার স্থায়ী সমাধান হয়েছে। ২০ মিলিয়ন অনুদানসহ আট বিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তে ঋণ ভারত থেকে এসেছে, যা অন্য কোনো দেশের বেলায় ভারত করেনি। ভুটান-নেপালে নির্মিতব্য যৌথ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আগামী দিনে বাংলাদেশ পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে। এরই মধ্যে ভারত থেকে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশ আমদানি করতে পারছে। ভিসা সহজীকরণের ফলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে পারছে। ঘাটতি এখনো অনেক, কিন্তু ২০১৯ সালে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। আসাম থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আসবে বাংলাদেশে। রসুন, পেঁয়াজ, আদাসহ সব ধরনের মসলা ভারত থেকে সহজে আসছে বিধায় তুলনামূলক কম দামে বাংলাদেশে তা পাওয়া যাচ্ছে।

উল্লিখিত বিষয়াদির বিপরীতে বাংলাদেশের সমুদ্র, স্থল ও নৌবন্দর ভারত নির্ধারিত শুল্কের বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারবে এবং সেটির মাধ্যমে তারা তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে সহজে সংযোগ রক্ষা এবং উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারবে। এটা ভারতের জন্য বড় পাওয়া। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বড় অর্জন হলো, বোঝাপড়াটা আজ এমন উচ্চতায় উঠেছে, যার ফলে প্রায় ১৪২ কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পূর্বশর্ত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে দুই দেশের সহযোগিতার মাত্রা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটি প্রশ্নহীনের পর্যায়ে এসেছে। নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লে সব কিছু কিভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে তা দুই দেশের মানুষই বিগত সময়ে দেখেছে। সুতরাং সহযোগিতার ক্ষেত্রকে ক্রমবর্ধমান রাখতে ১৭ ডিসেম্বরের শীর্ষ বৈঠক আরেকটি বড় পদক্ষেপ, তবে একমাত্র বড় পদক্ষেপ নয়। উভয় দেশকে একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সীমাবদ্ধতাকে মূল্য দিতে হবে এবং চেষ্টা করতে হবে কিভাবে এ বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করা যায়। উভয় দেশের ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি সব কিছু বিনষ্ট করে দিতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্কতা প্রয়োজন। তিস্তা চুক্তি ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য সংবেদনশীল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী হওয়ার কারণেই পুরনো কিছু সমস্যার সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জিং ইস্যু আগামী দিনে সামনে আসবে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক আদর্শের জায়গায় দুই দেশ যদি একই প্ল্যাটফর্মে থাকে, যেমনটি এখন রয়েছে, তাহলে কোনো চ্যালেঞ্জই অনতিক্রম্য হবে না। ১৭ ডিসেম্বর ভার্চুয়াল বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতৃত্ব যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তাতে বিদ্যমান সোনালি সম্পর্ক আগামী দিনে আরো উজ্জ্বলতর হবে, এমন প্রত্যাশাই সবাই করছেন।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]