সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন অনেক দূরে

65
Social Share

পলিথিনের বিকল্প হিসেবে কয়েক বছর ধরেই পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছে। তিন বছর ধরে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যাগ তৈরির কাজও চলছে। কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদনে যে ধরনের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় অর্থের প্রয়োজন তার জোগান ও সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। আর যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে, তাতে বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনো অনেক দূরে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কোনো রকম প্লাস্টিকের উপাদান ছাড়াই প্লাস্টিকের মতো পাটের তৈরি শতভাগ পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ। এর উদ্ভাবক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা (সোনালি ব্যাগ) হিসেবে কর্মরত।

পাটভিত্তিক ন্যাচারাল ফাইবার কম্পোজিট ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে ২০১৮ সাল থেকে বিজেএমসির অধীন রাজধানীর ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে সোনালি ব্যাগের উৎপাদন শুরু হয়। ব্যাগগুলো বানানো হচ্ছে শুধুই পাটের আঁশ ব্যবহার করে। এ ব্যাগ দেখতে বাজারের সাধারণ পলিথিন ব্যাগের মতো হলেও এটি অনেক বেশি টেকসই ও মজবুত। এটি সেলুলোজভিত্তিক বায়োডিগ্রেডেবল বায়োপ্লাস্টিক। পলিথিনের তুলনায় পাটের পলিমার দেড় গুণ বেশি ভার বহন করতে পারে। এটি পানি শোষণ না করলেও ফেলে দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এটি পরিবেশ দূষিত করে না। এটিকে তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ বলেন, ‘এখনো আমরা পাইলটিং পর্যায়েই রয়েছি। এই ব্যাগ উৎপাদন মূলত উচ্চতর প্রযুক্তির বিষয়। এখন তিন-চার ধাপ প্রক্রিয়া শেষে এই ব্যাগ উৎপাদন করা হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে হলে আমাকে মেশিনের এক দিক থেকে পাট দিতে হবে আর অন্য দিক দিয়ে ব্যাগ বের হবে। এটা না হলে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব নয়; কিন্তু সেটা আমরা পারছি না।’

বিজেএমসির চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমদ খান বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়তই গবেষণা করছেন। তিনি প্রায়ই বলছেন, ৩০০-৪০০ কোটি টাকা হলে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব। আমরা একবার মেশিনপত্র কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিলাম। কিন্তু স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মেশিন পাওয়া যায়নি। আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এখন আমরা যে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করব, তা কোথায় করব? গবেষক যদি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী এবারও মেশিনপত্র না পান তাহলে আরো পিছিয়ে যাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত দেশে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ এই ব্যাগ উৎপাদন করতে হবে। এ জন্য উচ্চতর প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া দামও সহজলভ্য হতে হবে। বর্তমানে একটি ব্যাগের দামই নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা, যা পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যদি এ ব্যাগ খুবই কম দামের মধ্যে না আনা যায়, তাহলে তা কাগজের ব্যাগের মতো অভিজাত দোকানগুলোতেই বন্দি হয়ে থাকবে।

জানা যায়, বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখেরও বেশি এবং বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার মানুষ ছাড়াও পাখি ও জলজ প্রাণী। এই পলিথিনের মাত্র ১ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং সমুদ্রে ফেলা হয় ১০ শতাংশ। এসব পলিব্যাগ ১০০ বছরেও পচবে না ও মাটির সঙ্গে মিশবে না। এ ছাড়া রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণও পলিথিন। শুধু ঢাকায়ই প্রতিদিন এক কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ জমা হয়। ২০০২ সালে দেশে আইন করে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। দামে সস্তা ও অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় নানা সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যাগ বিশ্বজুড়ে যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বিশ্ববাজারে পাটের এই প্রাকৃতিক পলিব্যাগের বিপুল চাহিদার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার আগেই এটি দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ইউরোপের দেশগুলোর বিপুল আগ্রহ রয়েছে দেশের সোনালি ব্যাগের প্রতি।

কিছুদিন আগে সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবক বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান বলেছেন, ‘প্লাস্টিকের বিকল্প পাট খাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও টেকসই পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ জন্য প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে পরিবেশবান্ধব এই সোনালি ব্যাগের দাম হবে সাশ্রয়ী।’