সেনা টহল শুরু জনশূন্য শহর থেকে গ্রাম সবখানে

Social Share

এরকম বাংলাদেশ আগে দেখেনি কেউ। একাত্তর সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও না। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক লকডাউন ঘোষণা করা হয়। টহল দিতে শুরু করেছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এদিন শহর, বন্দর, গ্রাম সবখানে ছিল ভিন্ন এক চিত্র। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। রাস্তাঘাট, দোকান, বাজার একেবারেই জনশূন্য। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হননি। শহরের রাস্তায় ইতস্তত কাউকে কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। বিছিন্নভাবে কিছু রিকশা, অটোরিকশা চলাচল করলেও বেশিরভাগ চালকই কোনো গাছতলা বা ভবনের ছায়ায় রিকশা থামিয়ে গভীর ঘুমে নিমগ্ন ছিলেন। গ্রামের যেসব দোকানে মানুষ আড্ডা দিতেন, টেলিভিশন দেখতেন, সেগুলোও বন্ধ; শূন্য খাঁ খাঁ। সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। লকডাউন থাকায় তারা কাজের সন্ধানে বের হতে পারেননি। এতদিন কীভাবে চলবেন, কী খাবেন- এই নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নেই।

চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় রাস্তাঘাট ফাঁকা। বন্ধ দোকানও। সুনসান এই শহরে তবুও পেটের দায়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন কিছু মানুষ। বেরিয়েই পড়েছেন ভোগান্তিতে। নগরের কাজীর দেউড়ি মোড়ে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রিকশাচালক ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, ‘ঘরে বউ, একটা বাচ্চা আর মা আছেন। পুলিশ বলছে রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যেতে। সকালে মাত্র ৬০ টাকা ভাড়া মারছি। এখন বাসায় যাইতেছি।’

আরেক রিকশাচালক সরওয়ার বলেন, ‘প্রতিদিন মালিককে একশ’ টাকা দিতে হয়। বাসায় ফেরার সময় চাল-ডাল নিয়েও ফিরতে হয়। গত তিন-চার দিন ধরে বাজার করা হচ্ছে না। কারণ, সারাদিনে আড়াইশ’ টাকাও আয় হয় না।’

দুপুরে রাজশাহী শহরের সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, নিউমার্কেট, শিরোইল বাসস্ট্যান্ড, শহীদ কামারুজ্জামান চত্বর, বর্ণালী মোড়, লক্ষ্মীপুর মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল দেন সেনাসদস্যরা। এ সময় রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি একেবারেই কম দেখা গেছে। জেলা প্রশাসক হামিদুল হক জানান, বুধবার থেকে নগরী বেশ ফাঁকা দেখা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকতে যে অনুরোধ করা হচ্ছিল, তা এখন বেশ কার্যকর। মানুষ আরও সচেতন হলে সবাই মিলে করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

বদলে গেছে বরিশাল নগরীসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের দৃশ্যপট। নগরীর রাস্তাঘাট অনেকটাই জনশূন্য। ওষুধ ও মুদি দোকান ছাড়া বন্ধ সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। করোনা এড়াতে জনগণকে নিজ নিজ ঘরে রাখতে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে জনসমাগম রোধে কাজ করছে পুলিশ।

খুলনা নগরীর রাস্তায় দিনভর অল্প কিছু রিকশা, ইজিবাইক ও দু-একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। সকালে নগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে দেখা গেছে কোনো যাত্রী নেই। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ শিববাড়ি মোড়, ময়লাপোতা মোড়, ডাকবাংলো মোড়, পিকচার প্যালেস মোড় এলাকায়ও লোকসমাগম নেই। দু-একজন যারা বাইরে বের হয়েছিলেন, সবার মুখেই দেখা গেছে মাস্ক। নগরীতে সেনাসদস্যরা টহল দিয়ে হ্যান্ড মাইকে লোকজনকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

রংপুরে অপ্রয়োজনে সড়কে ঘোরাফেরা করা মানুষকে ধাওয়াসহ ধরে ধরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মৃধার নেতৃত্বে র‌্যাব-১৩-এর একটি দল নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, সিটি বাজার এলাকায় টহল কার্যক্রম চালায়। জাহাজ কোম্পানি মোড়ে অটোরিকশায় গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করায় এক চালককে কান ধরে ওঠবস করিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সড়কের পাশে ভ্রাম্যমাণ ফলসহ বিভিন্ন দোকান তুলে দেওয়া হয়।

বগুড়া শহরে টহল চলাকালে সেনাসদস্যরা মাইকিং করে অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে নির্দেশ এবং গাড়িতে ‘ঘরে থেকে করব যুদ্ধ, করোনা থেকে হবো মুক্ত’- লেখাযুক্ত স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছেন।

ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংক মোড়, প্রেসক্লাব চত্বর, আলীপুর মোড়, থানা মোড়, ভাঙ্গা রাস্তার মোড় প্রতিদিন লোকে লোকারণ্য থাকলেও গতকাল ছিল একেবারে ফাঁকা। পাবনা থেকে আসা দিনমজুর হাফিজ বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই এই শহরে কামলা দিতে এসেছেন। কিন্তু দু-তিন দিন হলো কোনো কাজ নেই। বাস বন্ধ থাকায় বাড়িও ফিরতে পারছি না।’

রাঙামাটি জেলা শহরকে লকডাউন না করলেও একমাত্র গণপরিবহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা থাকায় শহরটি এমনিতেই লকডাউন হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলেও জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চারটি মোবইল টিম শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় টহল দিচ্ছে।

মাগুরা শহরের নিত্যপণ্য ও ওষুধের দোকানগুলোর সামনে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে মার্কিং শুরু করেছে প্রশাসন। গতকাল সকাল থেকে একাধিক টিমের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করেন সদরের ইউএনও আবু সুফিয়ান।

গোপালগঞ্জে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ। কোথাও কোনো আড্ডা নেই। রাস্তাঘাট জনশূন্য। শুধু স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা রাস্তায় জীবাণুনাশক পানি ছিটানো এবং কারও কারও হাতে মাস্ক ও লিফলেট ধরিয়ে দিচ্ছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে গতকাল বিকেলে জেলার সদর উপজেলার সাতপাড় হাট ছত্রভঙ্গ করে দেন সেনাসদস্যরা। সকাল থেকেই গাইবান্ধা জেলা শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলো একেবারেই ছিল জনশূন্য। মাঝে মাঝে দু-একটি অটোরিকশা, অটোবাইক ও বাইসাইকেল নজরে পড়লেও সবাই মাস্ক লাগিয়ে চলাচল করছেন। ওষুধসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে ও যানবাহন সংকটে লোকজন দুর্ভোগে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীতে হাটের দিন। অন্য দিনের তুলনায় এদিনে জনসমাগম অনেক বেশি হয়। গতকাল ছিল একদমই ফাঁকা। সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে বুধবার বিকেলেই। পাশাপাশি পুলিশের কড়া নজরদারি। কাঁচাবাজারে মানুষের পদচারণা থাকলেও কোলাহল নেই। শহরের প্রাণকেন্দ্র রেলগেট এলাকায় ছিল না কোনো মানুষ।

করোনা ঠেকাতে ভোলার চরফ্যাসন উপজেলাকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও রুহুল আমিন। ঝালকাঠির রাজাপুরে সবাইকে বাড়িতে থাকার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করেছেন সেনাসদস্যরা।

সুত্র: সমকাল