সেখানে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশন জ্যাকপটে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা অরুণ ভট্টাচার্য্যের নাম

Social Share

মেহেরপুরের পিপি পল্লব ভট্টাচার্য্যের ফেসবুক থেকে

ভিনিউজ : ৩ মে,১৯৭১। ভারতের মুর্শিদাবাদের পলাশীতে ভাগীরথী নদীর তীরে নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ ক্যাম্প “সি-টু পি” সাংকেতিক নাম দিয়ে উদ্বোধন করা হয়।বক্তব্য রাখেন কমান্ডার এম এন সুমন্ত, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জি এম মার্টিস এবং সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী। তাঁরা বক্তব্যে বলেন, “এই বাহিনী একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড এবং সকলকে একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর করতে হবে।” সেখানে লেখা ছিলো, “আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবেনা।” উপস্থিত তিনশ সাতান্ন জনের মধ্যে তিনশ পনের জন এখানে স্বাক্ষর করেন এবং বাকিদেরকে চাকুলিয়া ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
২২ জুন ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী পলাশীতে নৌ-কমান্ডো ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন এবং কমান্ডোদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বক্তব্য রাখেন।
প্রশিক্ষণের প্রথমেই প্রত্যেক কমান্ডোকে দেওয়া হয় একটি করে বড় মগ, থালা, গামছা, সুইমিং কস্টিউম,একজোড়া ফিন্স। সেখানে তাঁবু টানিয়ে, চারিদিকে ভেজা মাটির ঢিবি দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয় যাতে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে না পারে।এরপর ভাগীরথী নদীতে চলতো কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে কমান্ডোদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে মংলা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও দাউদকান্দি নদীবন্দরকে নিশানা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।চট্টগ্রাম বন্দর অভিযানে নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী।তাঁর নেতৃত্বে ছিল ষাট জনের একটি স্কোয়াড। সিদ্ধান্ত হয় ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে আক্রমণ করা হবে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত বিদেশী জাহাজগুলোকে। দলনেতার সাথে দেওয়া হয় একটি ছোট্ট রেডিও। নির্দেশ দেওয়া হয়, আকাশবানী খ কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান” শোনার সাথে সাথে দলনেতাকে অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে হবে আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে,” আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি” শোনার সাথে সাথে আক্রমণ করতে হবে। কৌশলগত কারণে অপারেশন একদিন পিছিয়ে পনের তারিখ ঠিক করা হয়।
১৫ আগস্ট,১৯৭১। রাত্রিতে বারোটি দলে ভাগ হয়ে কমান্ডোরা এসে দাড়ায় কর্ণফুলী নদীর তীরে,বন্দরের অপর পারে। চোখের জলে পরস্পরকে আলিংগন করে তারা বুকের সাথে বেঁধে নেন মাইন। আস্তে আস্তে এগিয়ে যান লক্ষ্যের দিকে। বন্দরে দাঁড়ানো এম,ভি আল- আব্বাস, এম ভি হরমুজ, পাক-নেভীর দুটি গানবোট সহ বেশ কিছু জাহাজে মাইন সেট করে তাঁরা দ্রুত ফিরতে থাকেন। নদীতে সাঁতরানো অবস্থায় এক এক করে বিস্ফোরণে ডুবতে থাকে পাকিস্তানি ও তাদের সাহায্যকারী জাহাজগুলো। পাকবাহিনী ও অন্য জাহাজগুলো থেকে প্রচন্ড শব্দে সাইরেন বাজতে থাকে কিন্তু বাংলা মায়ের দামাল সন্তানেরা শত্রুঘাঁটি ধ্বংস করে নিরাপদে ফিরে আসে আশ্রয়স্থলে।
পরদিন ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিকে খবর ছাপা হয়, ” On August 15, the brave commandos carried out a daring operation inside the chittagong port and blew up the ships’ Al-abbas ‘ and ‘Harmuj’ with the capacities of 15000 tons and 12000 tons respectively and five others tugs and gunboats were sank by the commandos.”
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের নিকট এই জাহাজ ডুবানো বন্ধের জন্য হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এতক্ষণ পড়ছিলাম, কমান্ডো মো.খলিলুর রহমানের লেখা,” মুক্তিযুদ্ধ ও নৌ -কমান্ডো অভিযান” শীর্ষক বইটি। যেখানে জ্বলজ্বল করছে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘অপারেশন জ্যাকপট ‘এ অংশ নেওয়া সর্বকনিষ্ঠ কমান্ডো, বীর মুক্তিযোদ্ধা অরুণ ভট্টাচার্যের নাম। আজ ছাব্বিশ জুন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা, ল’ গার্ডেন পরিবারের বীর সদস্য অরুণ ভট্টাচার্যের প্রয়াণ দিবস। ২০০৯ সালের আজকের দিনে তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে। বাংলা মায়ের সাহসী এই সন্তানের আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।