সেই রাতের কথা বলতে এসেছি

76
Social Share

“তখন রাত প্রায় ১২টা। পাকিস্তানিরা সেই সময়ে প্রথম ব্রাশফায়ার করে জগন্নাথ হলের ওপর। আমার এই কক্ষ, ২৯ নম্বর কক্ষে আমি তাড়াতাড়ি প্রবেশ করি তখন।
#এই কক্ষে সেই সময়ে আমার দুই বন্ধু ছিল। একজন সুশীল দাস, অন্যজনের নাম আমি এখন মনে করতে পারছি না।…চারিদিকে তখন এত বিস্ম্ফোরণ এবং মেশিনগানের আওয়াজ হচ্ছিল যে, কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বললেও কিছু শোনা যাচ্ছিল না। সে জন্য আমরা তিনজন ফ্লোরে এই জায়গাটাতে কোনোমতে বসি এবং হাতের ওপর হাত রেখে একজন অন্যজনকে প্রায় আঁকড়ে ধরি।…তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমাদের শেষ-সময় এগিয়ে আসছে। আমরা একে অপরের হাত স্পর্শ করে বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আমি এখান (কামরার মাঝখান) থেকে উঠে ঠিক এখানে (কামরার দরজার কোনায়) অবস্থান নিলাম। আমার বাকি বন্ধুরা অন্ধকারে ঠিক কোথায় ছিল, সেটা আমি জানি না; বলতে পারি না। এটা কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানি আর্মিরা এর মাঝেই লাথি দিয়ে আমাদের রুমের দরজা ভেঙে ফেলে। ঠিক তখনি আমাদের কামরার ভেতরে তারা স্টেনগান থেকে ব্রাশফায়ার করে। ফায়ারিং শেষ হলে পাকিস্তানিরা একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে রুমের ভেতর; যদি কেউ ব্রাশফায়ারের মাঝেও বেঁচে যায়, তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য। পাকিস্তানিদের ছুড়ে দেওয়া গ্রেনেডটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ম্ফোরিত হয়। গ্রেনেড চার্জ করেই একটি পেন্সিল টর্চের সাহায্যে তারা ভেতরে দেখল- এর পরও কেউ বেঁচে আছে কিনা। কাময়ায় দু’জনের মৃতদেহ দেখে টিটকারির সুরে বলল- ‘বাতাও জয় বাংলা…!’ এই বলে কদর্য ভাষায় কিছু গালাগাল করে ওরা চলে গেল অন্য কামরার দিকে। আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু দাঁড়াতে পারছি না। এর পর ভাঙা দরজার একটি অংশকে সাপোর্ট করে যখন উঠে দাঁড়ালাম, তখন বুঝতে পারলাম, গ্রেনেডের আঘাতে আমার বাম পা-টা হয় দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, না হয় মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে…।”
ওপরের কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সেই সময়ের আবাসিক ছাত্র হরিধন দাস, যিনি জগন্নাথ হলের ২৯ নম্ব্বর কক্ষে থেকে পড়াশোনা করছিলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে হরিধন দাস গ্রেনেডের আঘাতে আহত হয়েও বেঁচে যান কোনোমতে। পরবর্তী কোনো এক সময়ে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পদার্থবিদ্যায় (সম্ভবত) শিক্ষকতা করছিলেন। বছর ১৫ আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
দীর্ঘ আট বছর (১৯৯২ থেকে ২০০০) খেটেখুটে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলাম; যার শিরোনাম :’সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ (ইংরেজি ভার্সন :টেল অব দি ডার্কেস্ট নাইট)। সেই প্রামাণ্যচিত্রে একজন প্রোটাগনিস্ট (অধিবক্তা) হিসেবে ওপরের কথাগুলো বলছিলেন হরিধন দাস।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচণ্ড আক্রোশে পাকিস্তানিরা নির্মম গণহত্যা চালায়। বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে অঙ্গীকার এবং তৎপরতা, তাতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ গণহত্যা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়; ঢাকার সদরঘাট, বংশাল, শাঁখারীবাজার, নবাবপুর, গুলিস্তান, সিদ্ধেশ্ব্বরী, চামেলীবাগ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, বাংলামটর (তৎকালীণ পাক-মটর), ফার্মগেট, তেজতুরিপাড়া, মোহাম্মদপুর এবং মিরপুরের কিছু অংশে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী গণহত্যা চালায়। এতে হাজার হাজার নারী-পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা এই এক রাতেই প্রাণ হারায় পাকিস্তানিদের হাতে।
উল্লিখিত এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে শুধু হরিধন দাস নন; এ প্রামাণ্যচিত্রে যারা কথা বলেছেন, তাদের প্রত্যেকের মুখেই উচ্চারিত হয়েছে পাকিস্তানিদের নির্মমতার কথা; মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে আসার কথা; স্বজন হারানোর কথা; সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
একাত্তরে মোহন রায় ছিলেন রোকেয়া হলের একজন কর্মচারী। ২৫ মার্চ রাতে তিনি তার ১৯ দিনের (১৯ মাসের নয়) একটি শিশুসহ পুরো পরিবারকেই হারিয়েছেন পাকিস্তানিদের হাতে। এই প্রামাণ্যচিত্রে তিনি বলেন, ‘১২টা বাজার সাথে সাথে একটা ফায়ার হইল; লাল, পরে নীল। আমাদের দরজার থনে কিলিয়ার (পষবধৎ) দেখা যাচ্ছে। এর সাথে সাথেই দরজা ভাইঙ্গা গেল। (দরজা) ভাইঙ্গা, আমাদের যারা ছিল সবাইরে ফায়ার করল। সবাইরে শোয়াই দিল। আমরা তখন খাটের উপরে, সব লাশ খাটে। রক্তে আমার শরীর…, আমার গায়ে একটা গেঞ্জি ছিল; গেঞ্জিটা রক্তে ভিজে কালো হয়ে গেছিল। মাথার চুলগুলো সুইয়ের মতো দাঁড়াইয়া গেল।
আমি ভাবছি, লোকগুলা (তার পরিবারের) হয়তো জীবিত আছে। গুলি লাগছে; গুলিতে আহত হইয়া পইড়া রইছে, কিন্তু জীবিত আছে; মরে নাই। এটাই সান্ত্বনা আমার মনে। আমার ছেলে ছিল প্রায় আড়াই বছর। ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে যখন খাটের থনে মাটিতে পড়ল, তখন মনে হইল, কেউ বাঁইচা নাই! সাথে সাথে আমি চিৎকার দিলাম। চিৎকার দেওয়ার পরে তারা ছয় রাউন্ড গুলি ছাড়ছে। লাস্ট রাউন্ড গুলিটা আমার পায়ে লাগে, ফাস্ট (ভরৎংঃ ৎড়ঁহফ) গুলিটা আমার শালার ডাইন হাতে লাগে।
…ফজরের আজান দেওয়ার মনে হয় মিনিট দুই-তিনেক আগে আমার মেয়ে…(দীর্ঘ নীরবতা এবং চাপা কান্না) আমার মেয়েটারে যখন ঠ্যাংয়ে ধইরা নিয়া যায়; তার মাথার চুলগুলা মাটির দিকে ঝুলছিল; দেইখ্যা আমার শালাকে বললাম- তুমি সরো, আমি মরব। আমার আর কোনো বাঁচার ইচ্ছা নাই। আমি বাইর হইয়া গেলাম।…সামনে পড়ল একটা আর্মি অফিসার। উনি বললেন- তোমাকে গুলি করা হবে। আমি বললাম- আমি গুলিই চাই। আমারে মাইরা ফালান। আমি গুলি চাই এই জন্যি যে, আমার আর কেউ নাই। আমার ৭ জন মানুষ ছিল; সাত জনই শেষ! ছেলের বয়স ছিল আড়াই বছর। একটা শিশু ছিল ১৯ দিন (১৯ মাস নয়) স্যার; একদম কচি বাচ্চা। হ্যাঁ, তারা (পাকিস্তানিরা) সবাইকেই মারছে। ১৯ দিনের শিশুটার মাথা ফ্লোরে আছড়াইয়া মাথার মগজ বাইর কইরা মাইরা ফেলছে; আমার সামনে!”
পাকিস্তানি দখলদারদের গণহত্যার নির্মমতার কথা বলতে গেলে কয়েক বছর লাগবে; কয়েক মাস কিংবা কয়েক ঘণ্টায় সেই কাহিনী শেষ হবে না। সম্প্রতি ‘বধ্যভূমিতে একদিন’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্র আমি নির্মাণ করেছি।
দুই ঘণ্টা স্থিতিকালের এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থেই চষে বেড়িয়েছি; একাত্তরের গণহত্যার সন্ধান করেছি। ১৪৮টি বধ্যভূমিতে- মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মানুষ, হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রত্যেকের কথাই এক সুরে বেজেছে; পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে।

দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামসের হত্যাকাণ্ডে নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার কথা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাঁচ সহস্রাধিক বাঙালিকে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যা করেছে পাকিস্তানিদের ‘সম্মিলিত বাহিনী’। সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানার বয়লারের আগুনে নিক্ষেপ করে তারা হত্যা করেছে তিন শতাধিক বাঙালিকে, যারা ওই কারখানার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। সৈয়দপুরের ‘গোলাহাট’ নামে একটি স্থানে একাত্তরের ১৩ জুন ট্রেন থামিয়ে ৪২৭ জন হিন্দু মাড়োয়ারীকে গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করে পাকিস্তানি ও অবাঙালিরা। যারা পাকিস্তানি এবং অবাঙালিদের প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতার শিকার।
চট্টগ্রামে, কুমিরার মধ্য নাথপাড়ায় ৩১ মার্চ ১৯৭১-এ জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যৌথ আক্রমণে তারা নাথপাড়ায় যুগল কৃষ্ণ নাথের বাড়িতে অমানবিক, অমানুষিক এবং নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আমাদের ক্যামেরার সামনে ওই বাড়ির মেয়ে (বয়স ৬৪ বছর) খুকু রানী দেবী বলেন, ‘ওরা আইসাই প্রথমে কুড়াল দিয়া আমাদের বাড়ির দরজা ভেঙে ফেলে। তারপর লম্ব্বা কিরিচ দিয়া বাড়িতে যে কয়জন পুরুষ মানুষ ছিল, তাদের কয়েকজনের গলা কেটে ফেলে। আমার দাদা বাদল, যিনি তখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়তেন, তার গলা কেটে রক্ত নিয়া আমার মায়ের মাথার উপর ঢাইলা দিয়া বলে- জয় বাংলা বলবি আর? জয় বাংলা বলবি?’
বঙ্গবন্ধুর ‘ছয় দফা’ সমর্থনের অপরাধে পাকিস্তানিদের ‘সম্মিলিত বাহিনী’ খুকু রানীর আরেক দাদা দীনেশ চন্দ্র নাথকে ছয় টুকরো করে হত্যা করে ওই একই দিনে।
একটি প্রামাণ্যচিত্র কিংবা একটি নিবন্ধে ‘সেই রাতের কথা…’ শেষ হবে না। বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে থেকে গেছে রক্তের দাগ; সেই রাতের অন্ধকার থেকে গেছে ছোপ ছোপ। ইতিহাসের পাতায় জমেছে শ্যাওলা। নতুন প্রজন্ম পড়ে গেছে ইতিহাসের আড়ালে। নতুন প্রজন্ম আর মুক্তিযুদ্ধের মাঝে সুকৌশলে তৈরি করা হয়েছে দেয়াল। সেই দেয়াল ভেঙে নতুন প্রজন্মকে বেরিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের পোড়ামাটি থেকে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল; তারই আলোকে যাত্রা করতে হবে নতুনদের। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় পুরোনোদের দায়িত্ব এখন সম্পন্নপ্রায়। একাত্তরে অর্জিত পতাকা এখন নতুনদের কাছে তুলে দেবার পালা। লাল-সবুজের সেই পতাকা, যে পতাকায় লেগে আছে ৩০ লাখ বাঙালির রক্ত, দু’লাখ ধর্ষিতার অশ্রু; সেই পতাকা বিশ্বসভায় আরও উচ্চতর আসনে সমাসীন করবে নতুন প্রজন্ম- এটাই প্রত্যাশা।