সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বই

48
Social Share

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার এনডিসি (অব.):

কঙ্গো মিশনে, বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের এলাকায় মিলিশিয়া বাহিনী জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের  কিডন্যাপ করে গভীর অরণ্যে আটকে রাখে। রেসকিউ মিশনের জন্য বাংলাদেশ থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে বিশেষ কমান্ডো টিমকে, যার  নেতৃত্বে আছেন মেজর শিফান। এদিকে রেকি করতে গিয়ে কমান্ডোদের হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হলো গভীর অরণ্যে। তবু সেই বৈরী পরিবেশেও অবশেষে দুর্ধর্ষ কমান্ডো দল তাদের মিশন সফল করল…।

তরুণ সামরিক কর্মকর্তা শাহরিয়ার সৈকতের মিলিটারি থ্রিলার ‘মিশন কঙ্গো’ পাঠককে নিয়ে যায় উত্তেজনায় ভরা রোমাঞ্চকর অজানা ভুবনে। পড়তে পড়তে মনে হয়, হয়তো হলিউডের কোনো ফিল্ম দেখছি। এভাবেই আমাদের শান্তিরক্ষীরা তাঁদের অসাধারণ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন নিজেদের লেখা বইয়ের পাতায় পাতায়। তাঁদের কেউই হয়তো বিদগ্ধ লেখক নন। তবে নিজস্ব অভিজ্ঞতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তার মূল্যও হয়তো কম নয়।

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভার গ্রুপ (ইউনিমগ) মিশনে লে. কর্নেল ফজলে এলাহী আকবরের (পরে মেজর জেনারেল) নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল চৌকস শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করে। পরবর্তী তিন দশকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা (সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশ বাহিনী) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেছেন। গড়ে তুলেছেন নতুন এক বাংলাদেশের প্রেরণাদায়ক ও গর্বের ভাবমূর্তি। বর্তমানে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ।

শান্তিরক্ষীদের কেউ কেউ দেশে ফিরে নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে মিশনের ওপর বই লিখেছেন। এই গ্রন্থগুলোই আজ হয়ে উঠেছে সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত। এ ধরনের লেখা সাধারণত দুই শ্রেণির। কিছু বই/প্রবন্ধ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের থিওরি, সামরিক ও অপারেশনাল বিষয় নিয়ে লেখা। অনেকটা একাডেমিক পর্যায়ের। আরেক ধরনের বই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা কিংবা ভ্রমণ, ইতিহাস ও উপাখ্যানময়। এই নিবন্ধে এই শ্রেণির লেখা নিয়েই আলোকপাত করা হচ্ছে। এ ধরনের বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক। তাঁদের লেখায় ওই সব দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, জাতিগত সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, অর্থনীতি, সামরিক, আন্তর্জাতিক কৌশল, শান্তিরক্ষীদের অবদান, বিদেশে যাপিত জীবন ইত্যাদি বিভিন্ন বিচিত্র বিষয় উঠে এসেছে। আমাদের সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বশান্তি বিনষ্টকারী আগ্রাসী বাহিনীর মোকাবেলাও (কখনো যুদ্ধের মতো) করেছেন। সেই বিবরণও আছে গ্রন্থগুলোতে।

নামিবিয়ার শান্তিপ্রক্রিয়া মনিটর ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য জাতিসংঘ ‘আনটাগ’ নামে পিসকিপিং মিশন (১৯৮৯) পরিচালনা করে। এই মিশনে বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৯০ সালে নামিবিয়ার স্বাধীনতাপ্রাপ্তির অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন সাংবাদিক-লেখক হারুন হাবীব। এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি লেখেন, ‘নামিবিয়া দক্ষিণ আফ্রিকা—সূর্যোদয় দেখে এলাম’ (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, মার্চ ১৯৯১)। এই বইটিকে জাতিসংঘ মিশনের ওপর লেখা প্রথম বই বলা যায়। তবে শান্তিরক্ষীদের লেখা প্রথম বই (সম্ভবত), সেই মিশনে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা এস কে এন ইসলামের ‘আমার দেখা নামিবিয়া’ (লায়লা আরজুমান্দ বানু, খুলনা, জুলাই ১৯৯১)।

এরপর বসনিয়ায় মিশনের ওপর লে. কর্নেল বশীর উদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘অভিজ্ঞতার আলোকে বসনিয়ার যুদ্ধ’। জাতিসংঘ মিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত আইজিপি ও সচিব) নব বিক্রম ত্রিপুরা প্রকাশ করেন ‘দূরদেশে’। সোমালিয়া মিশনের ওপর লে. কর্নেল ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘সোমালিয়ার কান্না’। এগুলো ছিল শান্তি মিশনের ওপর প্রকাশিত প্রথমদিককার বই।

শান্তিরক্ষা মিশনে কাজের কঠিন পরিবেশ, শান্তিরক্ষীদের অর্জন, মানবিক কার্যক্রম ও চ্যালেঞ্জগুলো শান্তিরক্ষীদের বইয়ে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। এই বইগুলোর অন্যতম মেজর জেনারেল রেজাকুল হায়দারের ‘ওয়ান এয়ার ইন ইস্ট তিমুর’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসের ‘সাউথ সুদান সোনালি দিনের প্রত্যাশা’, কর্নেল জি. র. মো. আশরাফ উদ্দিনের ‘সাদা কাক ও কালো মানুষের গল্প’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহিদ হোসেনের ‘সিয়েরালিওনের স্মৃতি’, মেজর মুহাম্মদ আশিক হাসান উল্লাহর ‘ব্ল্যাক উডসের দেশে’ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ারের ‘কম্বোডিয়া : শান্তি সেনার জার্নাল’। এ ছাড়া জেনারেল মইন উ আহমেদ লিখেছেন, ‘স্মৃতিময় রুয়ান্ডার শান্তিরক্ষা মিশন’। এটি তাঁর ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়।

এই বইগুলোর পাতায় পাতায় আমরা পাই, কিভাবে আমাদের শান্তিরক্ষীদের সহযোগিতায় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে স্বাধীন দেশের জন্ম হচ্ছে। তেমনিভাবে গৃহযুদ্ধের অভিশাপ থেকে দেশগুলোকে মুক্ত করে শান্তির আলো দেখিয়েছে। আমাদের শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিকতা। তাঁরা যে দেশেই গেছেন, সেই দেশের মানুষের হৃদয়-মন জয় করেছেন।

শান্তিরক্ষীদের লেখায় উঠে এসেছে গৃহযুদ্ধ, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, গণহত্যা ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের কুটিলতা। তাঁরা দেখেছেন সম্ভাবনাময় হলেও গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ও গণহত্যায় বিপর্যস্ত দেশগুলোর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভয়াবহ অনৈক্য ও মারাত্মক বিভেদের বাস্তবতা। কিছু গ্রন্থে উঠে এসেছে জাতিগত ঐক্যের আকুতি। এ ধরনের বইগুলোর মধ্যে আছে কর্নেল মো. নুরুল ইসলামের ‘অশান্ত সোমালিয়া’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বদরুল মিল্লাতের ‘কালো মানুষ ও ভালো মানুষের গল্প’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাবিবুল করিমের ‘কঙ্গো : নরখাদক ও পিগমিদের দেশে’ ও মেজর কাউসার আহমেদের ‘কনফ্লিক্ট ইন ওয়েস্টার্ন সাহারা অ্যান্ড কোয়েস্ট ফর পিস’।

মিশনের পটভূমিতে কয়েকজন শান্তিরক্ষী চমৎকার উপন্যাসও লিখেছেন। কথাশিল্পী কাজী রাফির (মেজর কাজী জহিরুল ইসলাম) উপন্যাস ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রায়’ পাঠকদের নিয়ে যায় রোমান্সের ভিন্ন জগতে। আইভরি কোস্টে, ফরাসি সেনাবাহিনীর নারী অফিসার এলমা, আর বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের শান্তিরক্ষী অথৈ। এই গ্রহের ছোট ছোট ক্ষতগুলোকে হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে সারাতে গিয়েই অথৈ জড়িয়ে যায় লাস্যময়ী ফরাসিনী এলমার সঙ্গে….। ‘লে জো নদীর বাঁকে’ শান্তি মিশনের পটভূমিতে লেখা কাজী রাফির আরেকটি অনবদ্য প্রেমের উপন্যাস। লেখক জাহান আরা সিদ্দিকী কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনের পটভূমিতে লিখেছেন ‘সংবর্ত’। একজন শান্তিরক্ষী ও খেমার তরুণীর হৃদয়ঘটিত কাহিনি পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মেজর সাব্বির আহসান কঙ্গোতে শান্তিরক্ষীদের জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর লিখেছেন ‘দ্য পিসকিপারস’। মিশনের বিস্তারিত বয়ানসমৃদ্ধ উপন্যাসটি পাঠকদের দৃষ্টি কেড়েছে। হাইতির পটভূমিতে লে. কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ লিখেছেন, ‘মুভে ফাম’।

আমাদের কয়েকজন কবি ও লেখক জাতিসংঘ মিশনে স্বেচ্ছাসেবক, কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কবি জাহিদ হায়দার কম্বোডিয়া মিশনের অভিজ্ঞতার ওপর লেখেন চমৎকার গ্রন্থ ‘যখন ক্যামবডিয়ায়’। মিশন এলাকায় ভ্রমণকারী কয়েকজন লেখক ও সাংবাদিক তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর লেখা চমৎকার কিছু বই উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক লিখেছেন অনবদ্য এক গ্রন্থ ‘আইভরি কোস্টে লাল সবুজের পাশে’।  লেখক মিতালী হোসেন লিখেছেন, ‘খেমারুজদের দেশে’।

আমাদের পুলিশ বাহিনীর আরো কয়েকজন শান্তিরক্ষী দুর্লভ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তাঁদের প্রকাশিত বইগুলোতে। এর মধ্যে ফিরোজ খানের ‘দূরের যাত্রা’, গোলাম মহিউদ্দিন খানের ‘মিশন দারফুর’ ও রহমান শেলীর ‘রক্তাক্ত সুদানে শান্তির সন্ধানে’ অন্যতম।

বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের নারী শান্তিরক্ষীরা সগৌরবে অংশগ্রহণ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতার ওপর আর্মি মেডিক্যাল কোরের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমা বেগম নাজু চারটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ‘আত্মকথন জাতিসংঘ ইতিহাসের প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার’। মেজর শারমিন হক লিখেছেন, ‘দ্য বেঙ্গল গার্ল ইন আফ্রিকা’ (প্রবন্ধ)।

মেজর মো. দেলোয়ার হোসেন সম্পাদিত ও প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘শান্তিরক্ষী : বিশ্বশান্তি রক্ষায় ৩০ বছর বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অভিজ্ঞতা’ একটি অসাধারণ উদ্যোগ। এটি এক মলাটের মধ্যে, নানা সুতার মালায় গাঁথা ৩২ জন শান্তিরক্ষীর বিচিত্র অভিজ্ঞতার বয়ান।

শান্তিরক্ষীদের বইগুলোর অন্যতম আকর্ষণ এর ভ্রমণবৃত্তান্ত। শান্তিরক্ষীদের বইগুলো একেকটি চমৎকার ভ্রমণকাহিনিও বটে। বইগুলো পাঠকদের নিয়ে যায় এমন অচেনা জনপদে, যেখানে পর্যটকরা সাধারণত যায় না। নৌবাহিনীর কমান্ডার হাসান জামান খানের ‘ডায়েরির পাতায় আইভরি কোস্ট’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাহফুজুল হকের ‘লাইবেরিয়ায় ১৪ দিন’, লে. কর্নেল ওয়ালিউল্লার ‘আটলান্টিক পাড়ের দেশগুলো’, কর্নেল মো. ফরিদ উদ্দিনের ‘আমার দেখা আফ্রিকা’, কর্নেল মো. শাহজাহান মোল্লার ‘পৃথিবীর ছাদে’, বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার রাকিব মাহমুদের ‘র‌্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট’ (প্রবন্ধ) ও লে. কর্নেল মাহমুদ শমশেরের ‘আফ্রিকার দেশে দেশে’ ও মেজর খোশরোজ সামাদের ‘যে গল্প ত্রাসের যে গল্প দুঃসাহসের’ এই ধরনের ভ্রমণগাথা।

আজ ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস ২০২১। এ শুভক্ষণে বর্তমানে মিশনে নিয়োজিত সব শান্তিরক্ষীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমাদের ১৫৯ জন শহীদ শান্তিরক্ষীর কথা স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধায়।

শান্তিরক্ষীদের সৃষ্টিকর্মের একটা ফলাফল হলো বৈচিত্র্যহীন বাঙালি জীবনে ঢেউ এসে আছড়ে পড়া, যেখানে আছে অ্যাডভেঞ্চার, বিদেশের যুদ্ধের ডামাডোল, রোমাঞ্চকর অভিযান, পৃথিবীর আশ্চর্য মিলনমেলায় নর-নারীর প্রেম-ভালোবাসার উপাখ্যান, অজানা ভুবনের পরিপার্শ্ব। আছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বীরদের বীরত্বগাথা। শান্তিরক্ষীদের গ্রন্থ—বাগানে এখন বসন্তের ফুল ফুটেছে। ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক সব দিকে।

লেখক : কম্বোডিয়ায় (আনটাক) শান্তি মিশনে নিয়োজিত ছিলেন