সুফল দিচ্ছে পরীক্ষামূলক ওষুধ রেমডেসিভির

করোনাভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে গবেষণা করছেন গবেষকেরা। ছবি: রয়টার্স করোনাভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে গবেষণা করছেন গবেষকেরা। ছবি: রয়টার্স
Social Share

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধ আবিষ্কারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন দিক থেকে সুখবরও আসছে। তবে সবই এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ের। এমনই আরেকটি সুখবর দিয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান গিলিয়াড সায়েন্সেস। কোভিড-১৯ রোগীদের ওপর রেমডেসিভির নামের একটি ওষুধ প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো হাসপাতালে গুরুতর কোভিড-১৯ রোগীদের গিলিয়াড সায়েন্সেসের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভির দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে। নিবিড়ভাবে এ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে রোগী জ্বর ও শ্বাসকষ্টের লক্ষণগুলো থেকে দ্রুত সেরে উঠেছেন এবং এক সপ্তাহের কম সময়ে সব রোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত মার্কিন ওয়েবসাইট স্ট্যাট নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

কোভিড-১৯ সৃষ্টির জন্য দায়ী নভেল করোনাভাইরাস সার্স-কোভ-২–কে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা হিসেবে পরীক্ষাগারে চিহ্নিত প্রথম ওষুধগুলোর মধ্যে একটি ছিল রেমডেসিভির। পুরো বিশ্ব গিলিয়াডের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলের দিকে তাকিয়ে আছে। এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে তা দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন পাবে। এটা যদি নিরাপদ ও কার্যকর হয় তবে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এটিই হবে প্রথম অনুমোদিত কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা।

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মার্কিন ওয়েবসাইট স্ট্যাট নিউজের বরাত দিয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমডেসিভির নামের পরীক্ষামূলক ওষুধটি প্রয়োগের পর কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। এ–সম্পর্কিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া রোগীদের সবার তীব্র জ্বর ও শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা প্রকট ছিল। তাঁদের ওপর ওষুধটি প্রয়োগের পর তাঁদের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকি সবাই এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাসায় গেছেন। শিকাগো মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয় কোভিড-১৯ উপসর্গ থাকা ১২৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গিলিয়াডের দুটি ধাপ-৩–এর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১৩ জনের অবস্থা ছিল গুরুতর। তাদের প্রতিদিন রেমডেসিভির দেওয়া হয়।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. ক্যাথলিন মুলেন ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ সম্পর্কিত এক ভিডিও বার্তায় মুলেন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সুখবর হচ্ছে আমাদের অধিকাংশ রোগীই ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় গেছেন যা সত্যিই দারুণ। অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে মাত্র দুজন মারা গেছেন।’

স্ট্যাট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো গিলিয়াডের গবেষণা থেকে অন্য কোনো ক্লিনিকাল তথ্য আজ অবধি প্রকাশ করা হয়নি এবং এ নিয়ে উত্তেজনা বেশি। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেমডেসিভির নিয়ে সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। রেমিডিসিভির নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে খুব ভালো ফল পাওয়া যাবে।’

গত বৃহস্পতিবার গিলিয়াডের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা এই পর্যায়ে যা বলতে পারি তা হলো, চলমান গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের প্রত্যাশায় রয়েছি।’

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ভিডিও বার্তায় দেওয়া মুলেনের বক্তব্যকে ‘আংশিক তথ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পর্কে যেকোনো আংশিক তথ্যই অসম্পূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। গবেষণাধীন সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে এ ধরনের কোনো তথ্যকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা যাবে না।’

এর আগে গিলিয়াড বলেছিল, তারা এপ্রিলে তাদের পরীক্ষার ফল আশা করছে। গবেষক মুলেন বলেছেন, গবেষণার তথ্য বৃহস্পতিবার নাগাদ গিলিয়াডের কাছে ‘লকড’ করে দেওয়া হবে। এর অর্থ, যেকোনো দিন ফল জানা যেতে পারে।

মুলেন এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানতে নিজের দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা খুব কঠিন। কারণ, গুরুতর রোগীদের ওষুধ পরীক্ষার সঙ্গে প্লেসবো গ্রুপের ওষুধ পরীক্ষার তুলনা করা হয়নি। তবে আমরা যখন ওষুধ দেওয়া শুরু করি তখন জ্বরের গ্রাফ নিম্নমুখী হতে শুরু করে। থেরাপি শুরুর পর একদিনের মধ্যেই ভেন্টিলেটর থেকে রোগীকে বের করে আনা যায়। তাই সর্বোপরি রোগীরা ভালো করছে।’

মুলেন আরও বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ রোগীর অবস্থা গুরুতর ছিল এবং তাদের অধিকাংশ ছয় দিনের মধ্যেই ছাড়পত্র পেয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, থেরাপির মেয়াদ ১০ দিন হবে না। খুব কম ক্ষেত্রে থেরাপি ১০ দিনের বেশি লেগেছে। সে সংখ্যাটি মাত্র ৩।’

মুলেন স্ট্যাট নিউজকে তথ্যের সত্যতাও নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।

এক বিবৃতিতে শিকাগো মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, ‘এ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না এবং তা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তযুক্ত নয়।’

তথ্য প্রসঙ্গে স্ক্রিপস রিসার্চ ট্রান্সলেশনাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক এরিক টপল বলেছেন, ‘এটা উৎসাহব্যঞ্জক। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি থাকে বেশি। যদি ১১৩ জন রোগী এ ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার ছাড়পত্র পায় তবে তা ওষুধের কার্যকারিতার ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে আরও গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’

এ পরীক্ষায় রেমডেসিভির নিয়ে ৫ দিন ও ১০ দিনের চিকিৎসার দুটি উপায় খোঁজ করা হচ্ছিল। এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দুটি চিকিৎসা উপায়ের মধ্যে রোগীর উন্নতির পরিসংখ্যানগত তুলনা করা। সাত পয়েন্টের স্কেল ধরে উন্নতি মাপা হচ্ছিল যে স্কেলের সবচেয়ে খারাপ পয়েন্ট ছিল মৃত্যু আর সবচেয়ে ভালো ফল ছিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়ও স্কেলে ছিল। তবে এ গবেষণার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি ফলাফল ব্যাখ্যা করা বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জিং করতে পারে।

এর আগে চীনে দুটি পরীক্ষা আংশিক থামিয়ে দিতে হয়েছিল কারণ তখন রোগী পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, একটি বিশেষ কর্মসূচির অধীনে গুরুতর রোগীদের ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছিল যা উদ্দীপনা ও সংশয় সৃষ্টি করেছে।

বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, যতক্ষণ পূর্ণ পরীক্ষার ফল না পাওয়া যাবে ততক্ষণ সব তথ্য অ্যানেকডোটাল বা অননুমেয়। অর্থাৎ, এ তথ্য থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। তবে কিছু অ্যানেকডোট আবার নাটকীয়।

এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ চিকিৎসায় কোনো নিশ্চিত ওষুধের সন্ধান পাননি বিজ্ঞানীরা। তবে গবেষণা চলছে পুরোদমে। রেমডেসিভির-এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের যে সাফল্যের কথা বলা হচ্ছে, তাও মূলত সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। রেমডেসিভির নিয়ে বিশ্বের ১৫২টি স্থানে গুরুতর উপসর্গ রয়েছে এমন ২ হাজার ৪০০ রোগীর ওপর ওষুধটির পরীক্ষা চলছে। এ ছাড়া বিশ্বের ১৬৯টি হাসপাতালে মধ্যম পর্যায়ের উপসর্গ রয়েছে এমন ১ হাজার ৬০০ রোগীর মধ্যেও ওষুধটির পরীক্ষা হচ্ছে। চলতি মাসের শেষ নাগাদ এসব পরীক্ষার ফল হাতে আসবে বলে আশা ব্যক্ত করেছে এটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গিলিয়াড সায়েন্সেস।

গিলিয়াড সায়েন্সেসের তৈরি করা ওষুধ রেমডেসিভির এর আগে ইবোলা চিকিৎসায় প্রয়োগ করে কিছুটা সাফল্য এসেছিল। তবে কোভিড-১৯ রোগের কারণ যে করোনাভাইরাস, সেই গোত্রের ভাইরাস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এটি এর আগে ভালো সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষত অন্য প্রাণীর শরীরে ওষুধটির প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান। গত ফেব্রুয়ারিতে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেমডেসিভিরকে সম্ভাব্য ওষুধ হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

শিকাগোর ওই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী কারখানার শ্রমিক স্লাওমির মিকালাক। তাঁর মেয়ের মার্চ মাসের শেষের দিকে কোভিড-১৯ এর মৃদু উপসর্গ দেখা দেয়। তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। এরপর মিকালাকের জ্বর শুরু হয়। তীব্র শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি পিঠের দিকে ব্যথা বেড়ে যায়।

স্ট্যাটকে মিকালাক বলেন, ওই সময় মনে হচ্ছিল কেউ যেন ফুসফুসে আঘাত করছে। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে তিনি শিকাগো মেডিসিন হাসপাতালে যান। ৩ এপ্রিল তার জ্বর ১০৪ ডিগ্রিতে ওঠে ও শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। হাসপাতালে তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তিনি গিলিয়াডের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অংশ নিতে সম্মত হন। ৪ এপ্রিল তাঁর শরীরে রেমডেসিভির দেওয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জ্বর নেমে গেল এবং তিনি আগের চেয়ে ভালো বোধ করতে শুরু করলেন। পরের দিন তাঁকে দ্বিতীয় ডোজ ওষুধ দেওয়া হলে আর অক্সিজেন দরকার হয়নি। এরপর আরও দুবার তাঁকে রেমডেসিভির দেওয়া হয়। ৭ এপ্রিল তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান।

মিকালাক বলেন, ‘রেমডেসিভির অলৌকিক এক ওষুধ।’ এটা যদি সত্যিই অলৌকিক হয়ে থাকে তবে, সারা বিশ্ব এখন এ অলৌকিক ওষুধের প্রত্যাশাতেই রয়েছে।