সীমান্তে চীনের আগ্রাসী ভূমিকা কী করবে ভারত

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

Social Share

বরফে ঢাকা হিমালয় পর্বতের উপত্যকায় প্রায় সাড়ে চার হাজার মিটার উচ্চতায় জনশূন্য অঞ্চলে চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্তের গালবান নদীর তীরে গত ১৫ জুন ২০২০ তারিখের রাতে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রচ- এক মল্লযুদ্ধে উভয় পক্ষের মধ্যেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ভারতের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে উক্ত মল্লযুদ্ধে তাদের একজন কর্নেল পদবির অফিসারসহ ২০ সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তথ্য ভেদে ৫০ থেকে ৭০ জন। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ও ভারতের হতাহতের বিষয়ে কিছুই বলেনি। ভারতের একটি সংবাদ মাধ্যম বলেছে, চীনের ৪৩ সৈন্য নিহত হয়েছে। এ পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যা পাওয়া গেছে তাতে মনে হয় চীন সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিয়েই মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। জানা গেছে, সুচালো পেরেকযুক্ত বড় বড় লোহার রড দ্বারা পিটিয়ে ভারতের সেনাদের হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় সেনারা খালি হাতে মল্লযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অথবা আক্রান্ত হয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছে, এর মধ্যে কোনটি সত্য তা বলা কঠিন। তবে প্রস্তুতির ব্যাপারটা দেখে বলা যায়, হয়তো চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই ১৯৬৭ সালের পর এবারই পুনরায় সীমান্তে দুই দেশের সংঘর্ষে এত সংখ্যক সেনা সদস্যের হতাহতের ঘটনা ঘটল। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে এই সময়ে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পুরো বিশ্ব কম্পমান তখন এ অঞ্চলের বৃহৎ দুই রাষ্ট্র কেন এমন রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল। এর বিরূপ প্রভাব শুধু অত্র অঞ্চল নয়, পুরো বিশ্বের ওপর পড়বে। বিশ্বসংস্থা থেকে যখন বারবার বলা হচ্ছে, করোনা মহামারী থেকে মুক্তি পেতে হলে বৈশ্বিক সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়, তখন আমেরিকা, চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো নতুন নতুন দ্বন্দ্ব, সংঘাত বাধিয়ে পরস্পর থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ ঘটে তখন তার জন্য আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান তাৎক্ষণিক কারণ শুধু নয়, এর পিছনে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণের

সামগ্রিক বিষয়টিই কাজ করে থাকে। তাই ১৫ জুনের ঘটনায় চীনের পক্ষ থেকে যদি আগ্রাসী ভূমিকা থেকে থাকে তাহলে তার পিছনের সম্ভাব্য কারণগুলো কী হতে পারে তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি। প্রথমত, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে ভারতের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের উহান থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি ও বিস্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের পক্ষে ভারত জোরালো বক্তব্য দিয়েছে, যেটি শুরু থেকে আমেরিকা বলে আসছে। এটি নিজেদের আত্মমর্যাদার ওপর আগ্রাসন বলে চীন শুরু থেকে বলে আসছে এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে সম্প্রতি পত্রিকায় একটি নিবন্ধে করোনাভাইরাস বিস্তারের জন্য অত্যন্ত কঠিন ভাষায় চীনকে সমালোচনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, এক চীন নীতি, অর্থাৎ তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই জায়গায় ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় ও আপসহীন। চীন ঘোষণা দিয়েছে, প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ানকে মূল চীনের সঙ্গে একত্রিত করা হবে। আমেরিকা এক চীন নীতির সমর্থক হলেও ফোর্স প্রয়োগের বিরুদ্ধে। কিন্তু এতদিন ভারত এক চীন নীতির সমর্থক ছিল বলেই মনে হলেও এই মাস দুই-তিনেক আগে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে দুজন পার্লামেন্ট সদস্য অংশ নেন। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ভিম ভুরতেল এশিয়ান টাইমসে এক লেখায় মন্তব্য করেছেন, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের যোগদানে চীন ভীষণ চটে গেছে বলেই মনে হয়। তৃতীয়ত, এটি এখন স্পষ্ট, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট থেকে প্রকটতর হবে। আগামী ৩ নভেম্বর নির্বাচনে আমেরিকার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলই ভোট টানার জন্য কঠিন ভাষায় চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাবে, যার উদাহরণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। হয়তো নির্বাচনে জেতার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে আরও বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। চীন মনে করছে ইদানীং ভারত মাত্রাতিরিক্তভাবে আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা চীনের জন্য উদ্বেগ বৃদ্ধি করে। বাণিজ্য যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় চীনের প্রযুক্তি জায়কণ্ট হুয়াউই কোম্পানির বাজারজাত ৫জি মোবাইলকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিষিদ্ধ করেছে। ভারতও সম্প্রতি আমেরিকার পথ ধরে একই পদক্ষেপ নিয়েছে। চতুর্থ, চীন মনে করে হংকংয়ের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং অস্থিরতা সৃষ্টির পিছনে আমেরিকার হাত আছে। চীনের ধারণা হয়ে থাকতে পারে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্তৃত্বকে চাপে ফেলা এবং আলোচনার টেবিলে দরকষাকষিতে অতিরিক্ত তুরুপের কার্ড সৃষ্টির জন্য গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাট দশকের মতো আমেরিকা ভারতের সহযোগিতায় তিব্বতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগ্রাম উসকে দিতে পারে। তাহলে সেখানে ভারতের ভূমিকা মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। সঙ্গত কারণেই চীনের চেষ্টা থাকবে ভারত যেন সেদিকে পা না বাড়ায়। তিব্বতের বর্তমান ধর্মীয় নেতা দালাইলামা ভারতে আছে। বয়সজনিত কারণে নতুন দালাইলামা নিযুক্তির প্রস্তাব উঠেছে। চীন চাইবে ভারত-আমেরিকা কেউ যেন এ বিষয়ে নাক না গলায়।

পঞ্চম, এতদিন ভারতের বলয়ের মধ্যে থাকা একান্ত বন্ধু রাষ্ট্র নেপাল ক্রমশই চীনের দিকে সরে যাচ্ছে। ২০১৯ সালে শি জিন পিংয়ের কাঠমান্ডু সফরের সময় চীন-নেপাল অনেকগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মধ্যে নেপালের সঙ্গে তিব্বতের রাজধানী লাসার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রকল্প রয়েছে। এই সড়ক নির্মিত হলে নেপাল সড়ক পথে চীনের পূর্ব প্রান্তের সব বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। এটি ভারতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। ভারতের অনেক আপত্তি উপেক্ষা করে নেপালি সরকার তার দেশের নতুন মানচিত্র তৈরি করেছে। তাতে ভারতের ভিতরে থাকা কিছু এলাকা ওই মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। চলমান প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় চীনের অজান্তে সেটা হয়েছে তা বলা যায় না। ষষ্ঠত, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত চতুর্ভুজ (কোয়াড) সংঘের মিত্রতার আওতায় ভারত সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে উভয় দেশ একে অপরের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করতে পারবে। অধ্যাপক ভিম ভুরতেল মন্তব্য করেছেন, চীন হয়তো মনে করছে দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে চীনের অবস্থানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে ভারতও এখন আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিল। যদি এরকম হয়ে থাকে যে, চীন সুপরিকল্পিতভাবে আগ্রাসী ভূমিকায় গিয়েছে এবং তার জের ধরেই ১৫ জুনের ঘটনাটি ঘটেছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এর পিছনে স্ট্র্যাটেজিক্যালি চীনের কী লক্ষ্য থাকতে পারে। ধারণা হয়, চীন হয়তো ভারতকে বার্তা দিতে চাইছে, বাছবিচারহীনভাবে সব কিছুতে ভারত যদি আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলে চীনের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। উপরে বর্ণিত চীনের উদ্বেগ, কারণ ও অবস্থানের বিপরীতে চীনকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জায়গাও আছে। তবে সেটি তত দীর্ঘ না হলেও গুরুত্ব কম নয়। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ রাজ ও তিব্বতের মধ্যে স্বাক্ষরিত সীমান্ত চুক্তিকে চীন অস্বীকার করায় ভারত কখনো তার উত্তর সীমান্ত নিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারছে না। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো লাদাখের বড় একটা অঞ্চল আকসাই চীন ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন দখল করে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, রেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরই) দ্বারা চীন যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে তাতে উত্তর সীমান্তের চাপ ভারত আরও তীব্রভাবে অনুভব করছে। উত্তর সীমান্ত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ও চাপের পূর্ণ সুযোগ পাচ্ছে পাকিস্তান। ১৯৬২ সালের পর থেকে বিগত ৫৮ বছর ধরে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও সংঘর্ষের মূল কারণ সীমান্তের সীমানা নিয়ে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান। ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যায় বিগত সময়ে বিশ্বের সর্বত্রই এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যার দিকে ফিরে তাকালে সেগুলোকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হবে এবং তার মাধ্যমে যেন চিরস্থায়ী অশান্তির বীজ বপন করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসকে রোল ব্যাক করা সম্পূর্ণ অবাস্তব চিন্তা। সেটি করতে গেলে বরং শেষ বলে কিছু থাকবে না। এই বাস্তবতা চীন-ভারত উভয় দেশ উপলব্ধি করলে সমস্যা সমাধানের একটা পথ তারা বের করতে পারবে। তা না হলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব যতই যুদ্ধ, সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চাক না কেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অস্বস্তির প্রভাবে গ্রাউন্ড লেভেলে ১৫ জুনের মতো অথবা তার চেয়েও বড় সংঘর্ষ বেধে যেতে পারে। তখন দুই দেশের জন্য সেটা হবে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। ১৯৬২ সালে চীনের একই সময়ে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চরম শত্রুতা এবং অভ্যন্তরীণভাবে মহাদুর্ভিক্ষে পতিত থাকার পরেও সেই যুদ্ধে চীন অনেকখানি সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। লাদাখের উত্তরে আকসাই চীন সেই থেকে চীনের দখলে আছে। বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে হরিহর আত্মার সম্পর্কের ফলে উত্তর সীমান্ত নিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকায় চীন তার দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্তে বিশাল সামরিক সুবিধা পাবে, যে পরিস্থিতি ১৯৬২ সালে ছিল না। পক্ষান্তরে কাশ্মীর ও পাকিস্তানের সীমান্তে ভারতের উদ্বেগের শেষ নেই। আবার চীনের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারত নয়, আমেরিকা। চীনের যেমন যুদ্ধ করে হলেও তাইওয়ানকে একত্রিত করার মিশন আছে, ভারতের তেমন কিছু নেই। চীন-ভারতের দ্বন্দ্বে রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় এবং আমেরিকার সঙ্গে জোটবদ্ধতার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের চেয়ে ভারত বেশি সুবিধা পাবে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত একটা কথা হলো, ‘নাথিং ইজ ফ্রি ইন দিস ওয়ার্ল্ড’। এবারের জের ধরে সংঘটিত একটি ঘটনা আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যস্থতা করতে চাইলে চীন-ভারত, দুই দেশই তা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু গত ২২ জুন দুই দেশের মধ্যে আপাতত একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য যে সমঝোতা বৈঠক হলো, তাতে চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়ালি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যোগ দিয়েছিলেন। ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, দক্ষিণ আফ্রিকা) গঠন ও তার প্রসারে মনে হয়েছিল বিশ্ব ব্যবস্থায় একক কোনো দেশের কর্তৃত্বের পরিবর্তে বহুপক্ষীয় একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে। চীন-ভারত দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে সেটি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৮ সালে চীনের উহানে এবং ২০১৯ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিন পিংয়ের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের ফলে মনে হয়েছিল দুই পক্ষই বোধহয় উপলব্ধি করেছে জিরো শাম দৃষ্টিভঙ্গি মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। চীন-ভারতের যে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের ওপরই পড়বে। চীন এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। এর অপরিহার্যতার সম্পর্কে সবাই একমত। কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক, হৃদয়ের সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক সীমানার প্রায় পুরোটাই ভারতের সঙ্গে হওয়ায় প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত স্ট্র্যাটেজি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য দুই দেশই একে অপরের অপরিহার্য অংশ হয়ে পড়েছে। এরও কোনো বিকল্প নেই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কারণে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের একটা অনন্য মাত্রা রয়েছে, যা বিগত ১০-১২ বছরে বিশেষ উচ্চতায় উঠেছে। সুতরাং চীন-ভারতের সহায়ক সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অনেক স্বস্তিদায়ক ব্যাপার। তবে এ কথাও সত্য যে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন ও ভারত দুই বন্ধু দেশের ভূমিকা ধোঁয়াশার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা থাকার কারণ নেই এ জন্য যে, এ দুটি বৃহৎ দেশ তো আমাদেরও পরম বন্ধু। তারপরও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মনে হয় কোথাও না কোথাও একটা কিন্তু আছে। তবে শেষ কথা হলো, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে মনে করি, চীন-ভারত উভয়েই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকবে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]