ভিনিউজ : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে আবারও প্রাণ গেল শ্রমিকের। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে একটি এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। প্রথমে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিহতদের মধ্যে একই এলাকার চারজন এবং আপন দুই ভাইও রয়েছেন। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত কয়েকজন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি পলাশ দাসের। ৩৫ বছর বয়সী এই শ্রমিক প্রায় এক দশক ধরে ওই শিপইয়ার্ডে ওয়েল্ডার হিসেবে কাজ করছিলেন। এক বছরও পূর্ণ হয়নি তার বিয়ের। স্ত্রী ভূমিকা দাস এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাদের ঘরে নতুন অতিথি আসার কথা। অনাগত সন্তানকে ঘিরে যখন পরিবারে আনন্দের প্রস্তুতি, ঠিক তখনই কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন পলাশ। সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ আর হলো না তার।
পলাশের ছোট ভাই শুভ দাস জানান, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পারিবারিকভাবে ভূমিকার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। অনাগত সন্তানকে ঘিরে তাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শুক্রবারের দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে পলাশকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পলাশের বন্ধু দিলীপ দাসের অভিযোগ, শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। তার দাবি, শ্রমিকদের জন্য হেলমেট ও জুতা ছাড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই সীমিত ছিল। এমনকি ইয়ার্ডে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সও ছিল না।
ইয়ার্ড ব্যবস্থাপকের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। তবে স্ক্র্যাপ জাহাজের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জাহাজের বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করছিলেন। সকাল ৯টার দিকে একটি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাসের লিকেজ দেখা দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কিছু মানুষও ঘটনাস্থলে যান। সেখানে জমে থাকা গ্যাসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। ক্যাপ্টেন মো. এনামকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন। আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও কীভাবে এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে বিপজ্জনক গ্যাস জমে ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরীক্ষা করে গ্যাসমুক্ত ঘোষণা করা বাধ্যতামূলক। জাহাজে থাকা তেল, স্লাজ, বিলজ ওয়াটার, অ্যাসবেস্টস, পিসিবি, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিপজ্জনক উপাদানও যথাযথভাবে শনাক্ত ও অপসারণের কথা।
শিপব্রেকিং শিল্পে দুর্ঘটনা নতুন নয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ১১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর গত আট বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৬ জন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি কতটা গভীর।
দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডে ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগও উঠেছে। বিকেলে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে।
সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বারবার শ্রমিকের মৃত্যু এই শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা আসে; কিন্তু স্থায়ীভাবে দুর্ঘটনা কমছে না। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, জাহাজ কাটার প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা যাচাই, প্রশিক্ষিত কর্মী, গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে পলাশের মতো আরও কত শ্রমিককে জীবিকার জন্য গিয়ে প্রাণ দিতে হবে-সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না।




