সিনহা রাশেদ হত্যা: কক্সবাজারে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের যৌথ টহলের কারণ কী?

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মাঠে নামে। ফাইল ফটো
Social Share

বাংলাদেশের কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা নিহতের প্রেক্ষাপটে সেখানে পুলিশ এবং সেনা সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথ টহল পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা কীভাবে পরিচালিত হবে তা পরিষ্কার নয়।

কক্সবাজারের কতটুকু এলাকায় যৌথ টহল হবে সে সম্পর্কেও কোন ধারণা দিতে পারছেন না মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

যৌথ টহলের বিষয়ে বৃহস্পতিবার আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর’র এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

আইএসপিআর-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে এবং এলাকার মানুষের মাঝে ‘আস্থা ফিরিয়ে আনতে’ সে এলাকায় যৌথ টহল পরিচালনা করা হবে।

বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনার সময় ‘যৌথ বাহিনীর’ ব্যানারে কাজ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া বাংলাদেশের অন্য এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ টহল দেখা যায়নি।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কক্সবাজারে কেন যৌথ টহলের প্রয়োজন হচ্ছে?

পুলিশের রাশ টেনে ধরা?

বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছরে কক্সবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি স্পর্শকাতর এলাকা হয়ে উঠেছে।

মাদক এবং মানবপাচারের রুট এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজার এলাকা নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের দুশ্চিন্তাও বেড়েছে।

গত দুই বছরে কক্সবাজার এলাকায় মাদক নির্মূল অভিযানে তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে বহু হত্যাকাণ্ড হয়েছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে।

গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া ডিজিএফআই’র সে রিপোর্ট দেখা যায়, পুলিশের প্রতি এক ধরণের ক্ষোভ রয়েছে।

এমন অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, পুলিশ যাতে একচ্ছত্রভাবে সবকিছু করতে না পারে সেজন্য সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ টহলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বছর তিনেক আগে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে কক্সবাজার এলাকায় সামরিক বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার জন্য সরকার সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আসা-যাওয়ার রাস্তাগুলোতে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং বিজিবির আলাদা-আলাদা চেকপোস্টও রয়েছে।

কক্সবাজারে বেসামরিক প্রশাসনের অনেকেই মনে করেন, কর্তৃত্ব বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে এক ধরণের ঠাণ্ডা প্রতিযোগিতা চলছে।

সেনাবাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক অনেক কর্মকর্তার মনোভাব হচ্ছে, কক্সবাজারে পুলিশের রাশ টেনে ধরতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার এবং মাদক নির্মূলের নামে কক্সবাজারে কী হচ্ছে সেদিকে নজর দেয়া দরকার ।

জেনারেল মইনুল বলেন, “আসলে এখানে সহজ উপায়ে অর্থ উপার্জনের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকলেই এখন চাচ্ছে যে এই বাহিনীটাকে জবাবদিহিতার মধ্যে এনে আরেকটু সুশৃঙ্খল বানানোর জন্য।”

যৌথ টহলে কর্তৃত্ব কার?

সাবেক বিজিবি প্রধান মইনুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারে কেন যৌথ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটি তার কাছে পরিষ্কার নয়।

তবে বাংলাদেশে সাধারণত যে কোন জায়গায় আইনশৃঙ্খলার কাজে যদি সেনাবাহিনী জড়িত হয় তাহলে কর্তৃত্ব তাদের হাতেই থাকে।

“যৌথ বাহিনীর কমান্ড যদি হয়, তাহলে কমান্ড অবশ্যই থাকতে হবে সেনাবাহিনীর হাতে। এখানে অন্য কোন বিবেচনা হয়না।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের উদাহরণ

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় কাজ করেছে। এছাড়া তারা সেখানে কাউন্টার-ইনসারজেন্সির কাজ করেছে।

সে উদাহরণ টেনে জেনারেল মইনুল বলেন, “তখন আমাদের অধীনে অনেক ক্যাম্প ছিল। তারা সবাই পার্বত্য চট্টগ্রামের রিজিওন কমান্ডারের অধীনে কাজ করেছে।”

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহামদ রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হবার পর সেনাবাহিনীর অনেকের মাঝেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

পুলিশ বাহিনী দৃশ্যত চাপের মুখে পড়েছে। যৌথ টহল বিষয়ে পুলিশের কোন পর্যায়ে থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনার পর পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্পর্কে এক ধরণের অস্বস্তিও তৈরি হয়েছিল।

যদিও দুই বাহিনীর প্রধান আশ্বস্ত করেছেন যে এর ফলে সম্পর্কে কোন চিড় ধরবে না।

কারো কারো মনে এমন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে কক্সবাজারে কোন জরুরী পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

তাহলে টহলে কেন সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে?

সাবেক পুলিশ প্রধান মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাটির একটি ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে যৌথ টহলের প্রয়োজন রয়েছে।

“মহল বিশেষ এ পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্যমূলক-ভাবে ব্যবহার করতে পারে। সে ধরনের পরিস্থিতির যাতে উদ্ভব না হয়, বাহিনীগুলোর মধ্যে যাতে সদ্ভাব বজায় থাকে সেজন্যই এটার প্রয়োজন আছে,” বলেন মি. হুদা।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর খানের মৃত্যুর ঘটনা প্রসেঙ্গে পুলিশের দিক থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে এটাই শেষ ঘটনা। এ ধরণের ঘটনা ভবিষ্যতে আর ঘটবে না।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে এমনটাই জানানো হয়েছে। কিন্তু সে এলাকায় তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ চলমান থাকবে কিনা সে প্রসঙ্গে অবশ্য কিছু বলা হয়নি।