সাতক্ষীরা-৩ আসনের এমপি আ ফ ম রুহুল হকের কর্মময় জীবন

164
The Minister for Health and Family Welfare, Bangladesh, Professor Dr. A.F.M. Ruhal Haque, MP, meeting the Union Minister for Health and Family Welfare, Shri Ghulam Nabi Azad, in New Delhi on August 03, 2011.
Social Share

জাতীয় সংসদের ১০৭ সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি, দেবহাটা এবং কালিগঞ্জ উপজেলা অংশ (চাম্পাফুল, ভাড়াশিমলা, তারালী ও নলতা ইউনিয়ন) নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসন। এ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ১৯৪৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা শরীফ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আলহাজ্ব নজীর আহমেদ ও মাতার নাম মরহুমা আছিয়া খাতুন। তাঁর পিতা জনাব নজীর আহমেদ একজন ইউনিয়ণ পরিষদ চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক ছিলেন। রুহুল হকের শৈশব কেটেছে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.) এর পূণ্যভূমি নলতাতে।

শিক্ষা জীবন
ডা. রুহুল হক সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৬১ সালে ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৮ সালে এমবিবিএস পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি লন্ডন, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস, এফআইসিএস এবং এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করে মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ডাক্তার হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ দেশের বাইরে।

রাজনৈতিক ও কর্ম জীবন
ডা. রুহুল হক ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বতার শিকার শত শত মানুষকে এসময় তিনি চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ‘এসএইও অ্যান্ড রেজিস্ট্রার ইন অর্থোপেডিক্স অক্সফোর্ড’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার পঙ্গু ও পুনর্বাসন হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে অর্থোপেডিক্সের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পঙ্গু ও পুনর্বাসন হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এবং পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কনস্যালট্যান্ট (অর্থোপেডিক্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৩ থেকে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন ও আওয়ামী লীগের সাতক্ষীরা জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। একাধারে তিনি সম্মিলিত বঙ্গবন্ধু পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার পৃষ্ঠপোষক।

অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক রাজনৈতিক জীবনে সর্বপ্রথম ১৯৬৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করেন। ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। এরপর সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে তৃতীয় বারের মতো অংশগ্রহণ করে এমপি নির্বাচিত হন।

ডা: রুহুল হক একাধারে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-কমিটির সভাপতিও। ২০০৪ সালের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের চিকিৎসায় তার অনবদ্য অবদানের জন্য তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন।

নিজ নির্বাচনী এলাকায় শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরে এগিয়ে নিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগকে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে হাট-বাজার, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কার করেছেন। অবহেলিত সাতক্ষীরাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি সচেষ্ট আছেন। উন্নত সাতক্ষীরা বিনির্মাণে তার অবদান অপরিসীম।

পুরস্কার ও সন্মাননা:
বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে তিনি স্বাস্থ্যখাতে অভাবনীয় উন্নয়নে অবদান রাখায় দেশ ও দেশের বাইরে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ডা. বিধান চন্দ্র রায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি স্বর্ণপদক, জাতিসংঘ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল্ড অ্যাওয়ার্ড, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য গ্যাভি বোর্ড’র পুরষ্কার, সরকারের বেসামারিক স্বীকৃতি অনারারী কর্ণেল ও রোটারী ক্লাব হতে আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন।

সমাজসেবা:
ডা: রুহুল হক বেশ কিছু চিকিৎসা ও সেবামুলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। কালিগঞ্জের নলতায় একটি আধুনিক স্বপ্নের মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলে আধুনিক রূপে রূপ দিয়েছেন সাতক্ষীরাকে। এখানে সর্বস্তরের মানুষের চিকিৎসা সহ অসহায় গরীব মানুষকে বিনা মূল্যে বা স্বল্পমুল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। জেলার স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, এতিমখানা, পাঠাগারসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার করে সাতক্ষীরাকে করেছেন আলোকিত। এছাড়া ঢাকার শ্যামলীতেও তিনি ব্যক্তি পর্যায়ে আধুনিক অর্থোপেডিক্স হাসপাতাল ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

ডা: রুহুল হকের স্ত্রী ইলা হক ২০২০ সালে ১২ আগস্ট বুধবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইলা হক দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ার জিয়াউল হক সুমন, ও এক মেয়ে ডা. মেহজাবিন হক জেবা এবং মেয়ের জামাতা ডা. কামরুজ্জামান।

ডা. আ ফ ম রুহুল হকের পঞ্চাশটিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বহু দেশ ভ্রমন করেন।