সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সদাপ্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী

52
Social Share

২১ নভেম্বর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবস। যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে আমাদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যসহ তদানীন্তন মুক্তিবাহিনীর সব সদস্যকে এক সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে আনা হয় এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে সার্বিক ও ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ রচনা করা হয়। জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওই দিন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা বিধায় ২১ নভেম্বর জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে এই দিবস ও তার ঘটনাবলির গুরুত্ব ও তাৎপর্য ছিল অপরিসীম এবং বহুমুখী। রাষ্ট্রীয় জীবনে যার অবদান এখনো বিদ্যমান ও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভবিষ্যতেও দিনটি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অনুপ্রাণিত করবে ও আলোর পথ দেখাবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮২ সাল থেকে সম্মিলিতভাবে ২১ নভেম্বরকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ, বিমানবাহিনী ২৮ সেপ্টেম্বর ও নৌবাহিনী ১০ ডিসেম্বর আলাদাভাবে নিজ নিজ দিবসগুলো পালন করত।

১৯৭১-এর ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ সিদ্ধান্তে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সমগ্র যুদ্ধ এলাকাকে পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মোট চারটি যুদ্ধাঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। মুক্তিবাহিনীর ১১টি সেক্টর ও নিয়মিত বাহিনীর তিনটি ব্রিগেডকে (জেড ফোর্স, কে ফোর্স, এস ফোর্স)- এই চারটি অঞ্চলে যৌথ কমান্ডে সমন্বিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত এই কমান্ড কার্যকর ছিল।

১৯৭১-এর ২১ নভেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় যশোরের চৌগাছা সীমান্ত এলাকায়। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত যুদ্ধ। ২০ নভেম্বর ভারতীয় বাহিনীর ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং মুক্তিবাহিনীর একটি কম্পানি, ১৪টি পিটি-৭৬ ট্যাংকের ছত্রচ্ছায়ায় বয়রা সীমান্ত পেরিয়ে চৌগাছার গরিবপুর এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। ২১ নভেম্বরের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে পাকিস্তান বাহিনীর ৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, এক স্কোয়াড্রন এম-২৪ সেফি ট্যাংক এবং গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় যৌথ বাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে। তিন ঘণ্টা প্রচণ্ড যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানি বাহিনী প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এখানে তাদের ১১টি ট্যাংক ধ্বংস হয় এবং অফিসারসহ ৩০০ সেনা হতাহত হয়। হেনরি কিসিঞ্জারের মতে, ২১-২২ নভেম্বর বয়রা-চৌগাছা সীমান্তে উভয় পক্ষের ট্যাংক, বিমান ও গোলন্দাজ সংঘর্ষের দিনই চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু করার দিন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ইকবাল হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত) একজন তরুণ ছাত্র হিসেবে (প্লাটুন কমান্ডার) চৌগাছা-গরিবপুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই যুদ্ধ নিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে লেখেন—পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ভারতীয় ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, এক স্কোয়াড্রন টি-৭৬ ও আমরা অর্থাৎ এক কম্পানি মুক্তিযোদ্ধা ২০ নভেম্বর কপোতাক্ষ নদ অতিক্রম করে ঠিক সন্ধ্যায় গরিবপুর বাজারে চৌগাছা-মোহাম্মদপুর সড়ক বরাবর অবস্থান গ্রহণ করি। হঠাৎ সকাল ছয়টার দিকে (২১ নভেম্বর) মিত্রবাহিনীর গবিরপুর প্রতিরক্ষা অবস্থানে দুদিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনী একসঙ্গে আক্রমণ করে। তিন ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানি বাহিনী বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে ২১ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। (সেনানি, নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৮৯, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় চৌগাছা যুদ্ধের অবদান, লে. কর্নেল এস এম ইকবাল হোসেন পিএসসি, এসি)।

প্রতিবছর সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে জনগণ সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ লাভ করে থাকে। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি উদযাপন করা হয়। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানমালায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে (বর্তমানে এক বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়) প্রচুর জনসমাগম ঘটে। বিভিন্ন স্থানে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এই উপলক্ষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের এই অনুষ্ঠানমালায় জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সৈনিক-জনতার মৈত্রী বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী দিবসের তাৎপর্য ও সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য প্রতিবছরই জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোয় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। এতে জনসাধারণ সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে বিশদভাবে জানার সুযোগ পেয়ে থাকে।

সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অন্যতম আকর্ষণীয় কর্মসূচি হলো এই দিবস উপলক্ষে ঢাকাসহ বিভিন্ন সেনানিবাস, নৌবাহিনী ঘাঁটি ও বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে আয়োজিত হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। পাতাঝরা হেমন্তের মনোরম বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জ, প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা, সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা, বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বৃক্ষের শোভা ও সরোবরঘেরা অপরূপ স্থাপত্যময় সেনাকুঞ্জের খোলা চত্বরের সামনে সবুজ ঘাসের গালিচায় এখানে চমৎকার ঐক্য, আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের আবহ তৈরি হয়। আমন্ত্রিত নাগরিকরা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মাঝে অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে।

কবি নির্মলেন্দু গুণ ১৯৯৮ সালের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। এই অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক রাষ্ট্রপতি, সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সম্মিলনী ছিল তার জন্য চমৎকার ও বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা। সেনাকুঞ্জের নজরকাড়া নির্মাণশৈলী ও মূল ভবনের সামনে দেয়ালে আঁকা মুরাল চিত্র তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এই অভিজ্ঞতার ওপর পরবর্তী সময়ে নির্মলেন্দু গুণ ‘সেনাকুঞ্জে কিছুক্ষণ’ নামে একটি বই লেখেন (২০০০ সাল)। কবি বিদায়ের ক্ষণটি বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘রাতে ফ্লাড লাইটের আলোয় উদ্ভাসিত সেনাকুঞ্জকে একটি ছোটখাটো তাজমহল বলেই মনে হলো। এবার ঘরে ফেরার পালা। গাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে আমি আবারও সেনাকুঞ্জের দিকে তাকাই। যতক্ষণ দেখা যায় দেখি।’ উল্লেখ্য, সেনাকুঞ্জ (বহুমুখী মিলনায়তন ও সিভিল কমপ্লেক্স) নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল এম আতিকুর রহমানের উদ্যোগে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এটি ১৯৮৯ সালের ২১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

বর্তমানে প্রতিরক্ষানীতির আলোকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন চলছে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রতিরক্ষানীতিকে যুগোপযোগী করে ‘প্রতিরক্ষানীতি ২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। গত ১৩ বছর সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে অত্যন্ত প্রশংসনীয় অগ্রগতি লক্ষ করা গিয়েছে। বিশেষত অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির সংযোজনীর ক্ষেত্রে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন তিন বাহিনীর যৌথতা, সমন্বয়, ব্যাপক যৌথ অনুশীলন ও অস্ত্র সরঞ্জামাদি ক্রয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন শক্তির দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব, রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনীতিগত গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী ও সুসজ্জিতকরণ বিষয়টি যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ‘ক্রেডিবল ডেটারেন্স’ (যে শক্তিশালী অবস্থান অন্য দেশকে বাংলাদেশ আক্রমণে নিরুত্সাহ করবে) অর্জন করতেই হবে। এটিই দেয়ালের লিখন।

১৯৭১ সালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিত হয়েছিল বাংলার জনগণের সঙ্গে। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক অর্থাৎ জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও একাত্মতা আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য উদ্দীপক বিভাব। দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়া প্রয়োজন। মনে করিয়ে দেয়, তিন বাহিনীর যৌথতা, সমন্বয়, ভ্রাতৃত্ববোধ ও একাত্মতার কথা। প্রতিবার দিবসটি আমাদের পুনরুত্থানের পরম লগ্ন হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং জাতির স্বাধীনতার জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও জনতার চরম ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আমাদের অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধ এবং আমাদের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে একতা, ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মতার মূর্তপ্রতীক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনী জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। আগামী দিনেও মাতৃভূমির অখণ্ডতা রক্ষা তথা জাতীয় যেকোনো প্রয়োজনে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সদাপ্রস্তুত থাকবে। এই হোক আজকের সশস্ত্র বাহিনীর দিবসের অঙ্গীকার।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার এনডিসি (অব.)

লেখক : গবেষক
[email protected]