সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে মার্কিন এনজিওর অর্থায়ন

57
Social Share

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত  : শেষ পর্যন্ত ঘরের মুরগি ঘরে ফিরেছে উনুনে চাপার জন্য; অর্থাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যার যা বলার ছিল তিনি তা বলে দিয়েছেন—

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের সঙ্গে ফেসবুক লাইভ চ্যাটিংয়ে তাসনিম খলিলের কথাবার্তা ‘নেত্র নিউজ’-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে (নেত্র নিউজ চালান খলিল ও ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড বার্গম্যান। বার্গম্যান ড. কামাল হোসেনের জামাতা। ড. কামাল হোসেন গত জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর একটি জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই জোটের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন দলও ছিল। একটা রিয়ার তৈরি করার জন্য ওই জোট গঠন করা হয়েছিল)।

খলিল স্বীকার করেছেন, নেত্র নিউজ অর্থায়নের জন্য ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) ওপর নির্ভরশীল; এটা একটা নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বা এনজিও, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি জানিয়েছেন, এনইডি যেসব মিডিয়া আউটলেট বিশ্বজুড়ে নানা দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলে সেসব ইনডিপেনডেন্ট মিডিয়া আউটলেটকে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার জন্য অর্থ দেয়। তিনি এ কথাও বলেছেন, নেত্র নিউজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৯ সালে, এনইডির আর্থিক সহায়তা নিয়ে। এ আউটলেটের পরিচালন ব্যয় এনইডির বরাদ্দকৃত অর্থের ওপর নির্ভরশীল।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি জিনিসটা কী?

খলিল কোনো ‘ম্যাগনাম অপাস’ (কারো স্মারক লেখা) পড়লে বা দেখলে ভালো করতেন, যেমন—জেফ্রি টি রিচেলসনের ‘দ্য ইউএস ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি’। তাঁকে মার্কিন গোয়েন্দা কমিউনিটি বিষয়ে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ ভাবা হয়, তিনি আরো একটি বইয়ের লেখক—ভালো বই ‘দ্য উইজার্ডস অব লাংলে : ইনসাইড দ্য সিআইএস ডিরেক্টরেট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’। রিচেলসন বেশ কয়েকটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন এবং ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের জ্যেষ্ঠ ফেলো ছিলেন।

খলিল এনইডির জন্য যে সার্টিফিকেট দিয়েছেন তা ওই এনজিওটির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে, যাতে সব ভালো ভালো কথা রয়েছে—সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্র সম্প্রসারণের মহান আমেরিকান স্বপ্ন বিষয়ে। বোধগম্য কারণে তার মধ্যে কোনো ইনটেনশন ছিল না, তার মধ্যে এক্সপার্টাইজও ছিল না এ কথা জানাতে যে এনইডি ইউএস ইন্টেলিজেন্সের স্কিমে কিভাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু রিচেলসনের বেলায় বিষয়টা এ রকম নয়—তিনি একজন দক্ষ মার্কিন একাডেমিক, তিনি মার্কিন গোয়েন্দা অপারেশনের বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন এবং তিনি যা বলছেন সে ব্যাপারে ভালোভাবে অবহিত।

‘দ্য ইউএস ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি’ নামের ৫৯২ পৃষ্ঠার বইয়ের ষোড়শ অধ্যায়ে—যার নাম ‘কভার্ট অ্যাকশন’—রিচেলসন লিখেছেন, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এবং নাইন-ইলেভেনে ইসলামী জঙ্গিরা টুইন টাওয়ারে হামলা চালানোর পর মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স (সিআইএ, ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ অব স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি)-এর অপারেশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।

চলুন দেখা যাক, রিচেলসন কী লিখেছেন : সোভিয়েতের ধসের মানে দাঁড়িয়েছিল বিশ্বব্যাপী আদর্শিক বিরোধের অবসান—এ বিরোধের ফলে পশ্চিম ইউরোপে এবং অন্যত্র প্রচার-প্রকাশনার প্রতি ‘গোপন সমর্থন’ বেড়ে গিয়েছিল, তাতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করা হচ্ছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য মার্ক্সবাদী সংস্থার/বাহিনীর/প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্রচারণাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কাজ হচ্ছিল। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এবং ইরাক, উত্তর কোরিয়া ও লিবিয়ার মধ্যে অনুরূপ কোনো বৈশ্বিক আদর্শিক বিরোধ খাড়া করা হচ্ছিল না।

উপরন্তু বিভিন্ন ধরনের কাজ, যেমন—রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন বা ব্রডকাস্টিং, যেসব কাজ আগে গোপনে করা হতো, সেসব কাজ এখন প্রায়ই প্রকাশ্যে করা হয়। তখন ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি ১৯৯০ সালের নির্বাচনে সান্দানিস্তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিকারাগুয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সহায়তা দেয়।

১৯৮৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের একটা গোপন ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিরেক্টিভ থেকে উদ্ধৃতি দেন রিচেলসন; তাতে বলা হয়েছে : পররাষ্ট্র বিভাগ একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সমর্থন দেওয়ার জন্য সুদৃঢ় ও সুপরিকল্পিত একটা প্রকাশ্য কর্মসূচি হাতে নেবে। ‘গণতান্ত্রিকবিরোধী পক্ষ’কে সান্দানিস্তা রেজিমের সঙ্গে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করার বিষয়ে সহযোগিতা করতে মার্কিন আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সব চেষ্টাই করা হবে।

নির্দেশনাটি (ডিরেক্টিভ) নির্দিষ্ট করে বলেছে, এ ক্ষেত্রে নিকারাগুয়ায় কোনো গোপন কাজ, রাখঢাকের কোনো ব্যবস্থা এবং কোনো ‘ড্যাগার অ্যাকশন’ হবে না, তবে সান্দানিস্তা রেজিমকে গদিচ্যুত করার জন্য একটা প্রকাশ্য কর্মসূচির দরকার হবে। নিকারাগুয়া অপারেশন নতুন প্রজন্মের মার্কিন ইন্টেলিজেন্স অপারেশনের ‘স্মাক’ অপারেশনে পরিণত হয়ে ওঠে, যাতে ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির মতো সুবচনদাতা এনজিওদের নিযুক্ত করা হয়—সেসব রেজিমকে টেনে নামানোর জন্য যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিকর নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যাদের ‘গণতন্ত্র’ বলে বিবেচনা করে না। অর্থাৎ গণতন্ত্র বিস্তারের ব্যাপারে মার্কিন আবেগকে নিছক কাণ্ডজ্ঞাহীন আচরণ বলা যায়। কারণ ওয়াশিংটনের সরাসরি এবং প্রায়ই রক্তক্ষয়ী প্রণোদনায় (স্পন্সরশিপ) ক্যু এবং সামরিক শাসন জারি হয়েছে—ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, চিলি এবং আরো কমপক্ষে একডজন দেশে।

কে মোসাদ্দেকের নেতৃত্বাধীন ইরানের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল? কে সেই সরকারের জায়গায় পাহলবি রাজতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেছিল? অবশ্যই এ কাজ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আওয়ামী লীগ সরকারকে সতর্ক ও সুপরিকল্পিত সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করায় মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের বিতর্কিত ভূমিকার কথাও ভুলে যাওয়ার মতো নয়; ওই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন (তাঁর দুই কন্যা রক্তের ওই হোলিখেলা থেকে কোনো রকমে বেঁচে যান)।

কোনো সন্দেহ নেই, ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির অর্থ জোগায়, তাদের প্রস্তুত করে, তাদের কাজ দেয় মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি; তারা ১৯৯৫ সাল থেকে তাদের পুরো বাজেট বিতরণ করে এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত ফান্ডিং, এমনকি গোপন অপারেশনের জন্য ফান্ডিংয়ের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন লাগে। অতএব খলিল ‘গ্রেট ইউএস ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ সম্পর্কে অবহিত করার চেষ্টা থেকে এবং তার উচ্চবাচ্য থেকে আমাদের রেহাই দিতে পারেন।

যদি নিকারাগুয়ায় ১৯৯০ সালে নতুন প্রজন্মের হাইব্রিড মার্কিন ইন্টেলিজেন্স অপারেশনের সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে ২০১৩-১৪ সালের ইউক্রেনের ইউরো ময়দান বিপ্লব নতুন ভোরের সূচনা করেছে বলতে হয়; তখন নতুন প্রজন্মের ইউএস-স্পন্সরড রেজিম চেঞ্জ অপারেশন হয়, এতে জন-অসন্তোষকে তাতিয়ে তোলা হয় সোশ্যাল মিডিয়া অপারেশন ও পলিটিক্যাল মবিলাইজেশনের মাধ্যমে, মার্কিন ডলারের সহায়তায়। যার ফলে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্রেসিডেন্ট পুতিনের নাকের ডগায় রাশিয়াপন্থী রেজিমের পতন ঘটে। টেড গালেন কারপেন্টার এ বিষয়টির প্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট অনলাইনে’ ২০১৭ সালের ৬ আগস্টে; লেখাটির শিরোনাম : আমেরিকাস ইউক্রেন হিপোক্রেসি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানোকভিচ পছন্দের চরিত্র ছিলেন না। ২০১০ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন সুবিধা ও রাষ্ট্রযন্ত্র যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে তার দলের জন্য সুবিধা নিয়েছেন। কিংবদন্তিতুল্য এ দুর্নীতি ইউক্রেনের জনগণের বড় একটা অংশকে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। ইউক্রেনের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পোল্যান্ডের এবং অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশের নিচে নেমে যাওয়ায় তাঁর প্রতি জনরোষ বেড়ে যায়। ২০১৩ সালে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের চুক্তির শর্তাবলি প্রত্যাখ্যান করে রাশিয়ার প্রস্তাবের দিকে ঝোঁকেন। তখন ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা কিয়েভের ইনডিপেনডেন্ট স্কয়ারে সমবেত হয়, অন্যান্য শহরেও তারা জড়ো হয়।

কারপেন্টারের পর্যবেক্ষণ হলো, নেতৃত্বের ত্রুটি এবং চরিত্রের দোষত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ইয়াকোভিচ যথানিয়মে ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন; আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ বলেছেন—পশ্চিমা গণতন্ত্রের বাইরে ওই নির্বাচন যতটা ভালো আশা করা যায় ততটাই হয়েছিল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার ওপর তার শ্রদ্ধা ছিল, ফলে আইনসংগত প্রেসিডেন্টের মেয়াদ তাঁর শেষ করার কথা ছিল। সে মেয়াদ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিরোধী পক্ষ বা ওয়াশিংটন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা তা চায়নি। তাদের আচরণ সে রকম ছিল না। কারপেন্টারের শেষ কথা : ইউক্রেনের রাজনীতিতে মার্কিন প্রশাসনের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ছিল বিস্ময়-জাগানিয়া।

বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জ অপারেশন ডিজাইন করা হয়েছিল গত সংসদ নির্বাচনের পর; যখন ধর্মাশ্রয়ী বিরোধী দল পরাস্ত ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের নিকারাগুয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর কোনো কারণ পরিকল্পনাকারীদের ছিল না; কাজেই তারা ইউক্রেনের ইউরো ময়দানের ভার্সন তৈরি করার পরিকল্পনা করে, এতে জন-অসন্তোষ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার গালগল্প ও ফেইক নিউজ ব্যবহার করা যাবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে ন্যাশনাল এন্ডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি একটি মার্কিন তহবিলপ্রাপ্ত এনজিও, যার উদ্দেশ্য রেজিম চেঞ্জকে ত্বরান্বিত করা, গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানো নয়। তাদের তহবিল আসে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স বাজেট থেকে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের গোপন অপারেশনের প্রকাশ্য মঞ্চ; নেত্র নিউজে তাদের তহবিল জোগানোর উদ্দেশ্যও তাই। কনক সারওয়ার, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শহীদ উদ্দিন খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর দেলোয়ার, শহীদুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমানও ইউরো ময়দানের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

থ্যাংকস টু খলিল, থলের বিড়াল বের করে আনার জন্য। আমরা বরাবরই জানতাম আপনি এবং আপনার বন্ধুরা কার হয়ে কাজ করেন, তবে আপনার নিজের মুখ থেকে এ কথা শোনার গুরুত্ব রয়েছে বৈকি। এনইডি গণতন্ত্রের মন্দির তৈরি করার কোনো প্রকল্প নয়—এটা নতুন ওভার্ট অপারেশন আর্কিটেকচারের অংশ, যার কাজ হলো সম্প্রসারণবাদী আমেরিকাকে তার গোপন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান সাংবাদিক