সমঝোতার পরও ক্রিকেটপাড়ায় অস্বস্তি

ক্রীড়া প্রতিবেদক : সিরিজ শেষে হিসাব মেলানো হয় নিয়ম করে। তিন দিনের ক্রিকেট ‘বিদ্রোহ’ শেষেও চলছে হিসাব মেলানো। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান সমঝোতার পর জানিয়েছেন ১৩ দফার মধ্য থেকে ৯টি মেনে নেওয়ার কথা। তাতে নৈতিক বিজয় দাবি করতেই পারেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু সত্যিই কি জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে বুধবার রাতে বোর্ড বনাম ক্রিকেটার সভায়? যাঁদের আপাত জয়ী মনে হচ্ছে, সেই ক্রিকেটারদের ডেরায় ঢুঁ মেরে অবশ্য বিজয়োল্লাসের উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। উল্টো আবহাওয়ার মতোই নিম্নচাপে আক্রান্ত তাঁরা।

বুধবার রাতে নিজেদের মধ্যে সভা ছেড়ে যাওয়ার সময়ই মলিন দেখিয়েছে ক্রিকেটারদের। আন্দোলনে যাওয়ার পর যে চনমনে ভাব ছিল সবার মধ্যে, সেটি উধাও। কেন? আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান অবশ্য ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার পরই বলেছিলেন, ‘দাবিগুলো বাস্তবায়ন হলে বলতে পারব খুশি কি না।’ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি এক লাখ করার দাবি পূরণ হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে গেছেন। তাতে পরিষ্কার যে দাবির প্রতি নমনীয় বোর্ড বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে আগের মতোই রক্ষণশীল। আর্থিক সুবিধা বাড়বে, তবে পরিমাণ নির্ধারণে বজায় থাকবে বোর্ডের কর্তৃত্বই। এটা বুঝেই কিনা, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না। উল্টো বোর্ডের রোষানলে পড়ার ভয় নিয়ে বুধবার বোর্ড থেকে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা। কারণ তাঁরা ভালো করেই জানেন, জাতীয় তারকারা অবমূল্যায়নের বিচার পাবেন ঠিকই। কিন্তু তাঁদের খবর কেউ রাখেনি, রাখবেও না।

অথচ সমঝোতা সভার আগেও ফ্রন্টফুটে ছিলেন ক্রিকেটাররা। বোর্ড সভাপতি দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ক্রিকেটারদের অপেক্ষায় বসে আছেন বিসিবির নিজস্ব কার্যালয়ে। অন্যদিকে ক্রিকেটাররা গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজন করেছেন সংবাদ সম্মেলন। সেখানে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়েছেন বাড়তি দুটি যোগ করে মোট ১৩ দফা দাবি।

ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমানকে দিয়েই বোর্ডের সঙ্গে দেন-দরবার করানোর ইচ্ছা ছিল ক্রিকেটারদের। কিন্তু বোর্ডের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ক্রিকেটার ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে আলোচনায় বসবে না বোর্ড। এমনকি প্রতিনিধি হয়ে গোটা কয়েক ক্রিকেটারই নয়, আন্দোলনে যুক্ত সবাইকে আলোচনার জন্য ডেকে আনা হয় বোর্ডে। এরপর ঠাসা বোর্ডরুমে ক্রিকেটারদের নাকি প্রচণ্ড বকাঝকা করেছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান। সেখানে উপস্থিত এক বোর্ড পরিচালক গতকাল বলছিলেন, ‘আমরা তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম উনার (বিসিবি সভাপতি) না আবার হার্ট অ্যাটাক হয়!’ সে রকম কিছু হয়নি। তবে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে আর বাড়তি আবদার নয়, ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ড সভাপতির সম্পর্ক হবে যেমনটা হওয়ার কথা, তেমনটাই! বকাঝকার পর নাজমুল অবশ্য থেমেছেন একপর্যায়ে, ‘মনের সব রাগ ঝেড়ে ফেললাম। এখন বলো, কী বলবা তোমরা?’

এতে ক্রিকেটাররা অবশ্য খুব আশ্বস্ত হয়েছেন বলে মনে হয়নি। ক্ষমতাবান প্রশাসকের রুদ্রমূর্তির প্রভাব থেকে খেলোয়াড়রা আর বেরোতে পারেননি বলেই জানিয়েছে আলোচনায় উপস্থিত একটি সূত্র। তাই দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দিয়েই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি দাবি সম্ভবত দ্রুততম সময়ে পূরণ করবে বিসিবি। ক্রিকেটাররা আন্দোলনে যাওয়ার পর বিসিবির কর্মকর্তারা প্রথম জানতে পারেন যে জাতীয় লিগের ক্রিকেটারদের বিমানে যাতায়াত ভাড়ার খরচ হবে মোটে ১৯ লাখ টাকা। ম্যাচ ফি, বেতন বাড়ালেও অঙ্কটা মোটেও বিসিবির অ্যাকাউন্ট খালি করে দেওয়ার মতো কিছু নয়।

আসলে এত দিন বিসিবির সংশ্লিষ্ট বিভাগে এ নিয়ে চিন্তাভাবনাই হয়নি। জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদের নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর কোনো আলোচনাও হয়নি বিসিবিতে। ক্রিকেটারদের আন্দোলনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত এটাই যে, বোর্ড কর্তাদের আগ্রহের রাডারে জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটাররা ঢুকে পড়েছেন আন্দোলনের ধাক্কায়।

ক্রিকেটারদের আন্দোলনের প্রভাব এটুকুতে সীমিত থাকলে ক্রিকেটেরই মঙ্গল। কিন্তু দেশীয় সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের ভয় তিন দিনের এই আন্দোলনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী, যা তাঁদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজ’ তুলে দেওয়ার দাবি করেছেন সাকিবরা। কারণ এই নিয়মে তাঁদের পছন্দের ক্লাবে খেলার অধিকার হরণ করা হয়েছে, দামও কমেছে। তবে এটাও ঠিক যে বোর্ডের নিয়মে টাকা কমলেও পুরো পারিশ্রমিক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু ঢাকার ক্লাব কালচারে বড় তারকা ছাড়া সাধারণ ক্রিকেটারদের পাওনা না পাওয়ার ঘটনাই বেশি। ওসব ঘটনায় বোর্ড কোনো দায় নেয় না। তার ওপর আর্থিক মন্দার ধুয়া তুলে ক্লাবগুলো যদি একজোট হয়, তখন তারকা ক্রিকেটারদেরই দরপতন ঘটতে পারে। জাতীয় লিগ কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ—দুটোই বিসিবির অধীন টুর্নামেন্ট। সে ক্ষেত্রে খেলোয়াড় নির্বাচনের কাজেও বোর্ডের পূর্ণ কর্তৃত্ব। তাতে আন্দোলনে সম্পৃক্ততার দায়ে নীরব শাস্তির ‘সুযোগ’ রয়েছে বিসিবির।

ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতিতে কয়েকজনের ওপর দিয়ে নীরবে বয়ে যায় জিঘাংসার ঝড়। সে ঝড়ের আশঙ্কাতেই কিনা ডিপ্রেশনে চলে গেছেন ক্রিকেটাররা। সেসব মন্দভাগ্য ক্রিকেটারদের জন্য আগাম সমবেদনা রইল!