সবখানেই সরকারি দল, উত্থান ঘটতে পারে অপশক্তির

13
Social Share

নির্বাচনব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা, ভোটাধিকার প্রয়োগে অনীহা, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়া—সর্বোপরি জনগণের রাজনীতিবিমুখতায় দেশে অগণতান্ত্রিক অপশক্তি বা ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান ঘটতে পারে। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। গতকাল শুক্রবার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক লায়েকুজ্জামান

কালের কণ্ঠ : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন মনে করছেন?

জি এম কাদের : ভালো নয়। গণতন্ত্রের নামে যা চলছে, এটিকে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না। এটি এক ধরনের স্বৈরশাসন। দেশে দারুণভাবে গণতন্ত্র বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধারা শুরু হয়েছে ১৯৯১ সাল থেকে, বিএনপির শাসনামলে। রাষ্ট্রের বেশির ভাগ ক্ষমতা নির্বাহী প্রধানের হাতে থাকলে গণতন্ত্রের চর্চাও হয় না, বিকাশও হয় না। যেখানে সংসদ নির্বাহী প্রধানকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেখানে হচ্ছে উল্টো। নির্বাহী প্রধানই বরং সংসদকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এখন একমাত্র উচ্চ আদালতের বিচারপতির অপসারণ বাদে বলতে গেলে সব ক্ষমতা নির্বাহী প্রধানের অধীনে। রাজনীতির প্রচলিত কথা—নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ দুর্নীতির জন্ম দেয়। এখন এটিই হচ্ছে। দেশে এখন সবখানে শুধুই সরকারি দল। অবাধে দলীয়করণও হচ্ছে। মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়। নির্বাচনপদ্ধতির প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়েছে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, নিজেদের দলীয় প্রার্থী থাকার পরও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভোট দিতে কেন্দ্রে যায় না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের একমাত্র পন্থা হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের প্রতি দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হলে সরকার বদলের জন্য অগণতান্ত্রিক পথই মাত্র খোলা থাকে, যা গণতন্ত্রমনা কারো কাম্য নয়, কেউ প্রত্যাশাও করে না। তার পরও বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষ শেষ পর্যন্ত ওই অপশক্তিকেই স্বাগত জানায় এবং সমর্থন দেয়।

কালের কণ্ঠ : এই অগণতান্ত্রিক অপশক্তি বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন?

জি এম কাদের : দেখুন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে উদারপন্থী বাম ঝোঁকের দল, অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি হচ্ছে উদারপন্থী ডান ঝোঁকের দল। বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। জিয়াউর রহমান পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া বিএনপি চালানো অসম্ভব। অথচ ওই পরিবারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন শুধু আশার বাণী হতে পারে, বাস্তবে অসম্ভব। বাকি থাকে জাতীয় পার্টি, আমাদেরও তো সরকার কোনো স্পেস দিচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে উদারপন্থী ডান ঝোঁকের দলগুলো নেতৃত্ব নিতে ব্যর্থ হলে বাকি থাকে ডানপন্থী চরমপন্থা, মানে ধর্মীয় মৌলবাদীরা। আমরা সাদা চোখে দেখছি তারা ময়দানে নেই। এই সাদা চোখে দেখার হিসাব কিন্তু সব সময়ে এক হয় না। রাজনীতির কিছু জটিল হিসাব থাকে।

কালের কণ্ঠ : জাতীয় পার্টির তো একই সঙ্গে সংসদ ও রাজপথে লড়াই করার সুযোগ রয়েছে, সেটি কেন করছেন না?

জি এম কাদের : সংসদে আন্দোলন মানে অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার এবং ফাইল ছোড়াছুড়ি করে লোক-দেখানো নয়। সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে হলে জনস্বার্থে কথা বলা, প্রস্তাব দেওয়া এবং জনকল্যাণমূলক প্রস্তাবগুলো আইনে পরিণত করার ব্যবস্থা করতে হয়। সেটি আমরা পারছি না। নির্বাহী প্রধান যখন আইনসভা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন, তখন বিরোধী দলের শুধু প্রস্তাব উত্থাপন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলন মানে বাস ভাঙচুর, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, হরতাল-অবরোধ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করা—আমরা তা মনে করি না। আমরা সরকারের জনস্বার্থবিরোধী প্রতিটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করে মানববন্ধন, সভা-সেমিনার করছি। সংসদেও কথা বলছি। এ ছাড়া বিএনপি বিগত দিনে হরতাল-অবরোধের নামে যা করেছে, ওই ধরনের নৈরাজ্য মানুষ আর পছন্দ করে না। রাজনীতির প্রতিবাদের ধরনও বদলেছে। বিএনপি প্রতিবাদের পুরানো ধরনগুলোকে দারুণভাবে অপব্যবহার করে মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছে।

কালের কণ্ঠ : তাহলে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান কী?

জি এম কাদের : আমরা মহাজোটে নেই। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের ছিল নির্বাচনী সমঝোতা, জোট নয়। সরকারের বহু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমরা দ্বিমত পোষণ করি। আবার ভালোটাকে সমর্থন করি। আমরা স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে এগোতে চাই। মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্প খুঁজছে। জাতীয় পার্টি সেই বিকল্প হতে চায়। না হতে পারলে দেশ অন্যদিকে এগোতে পারে, এটি আমার আশঙ্কা।

কালের কণ্ঠ : আপনি বলছেন স্বতন্ত্র ধারায় এগোতে চান; কিন্তু সংসদে আপনার দলের সংসদ সদস্যরা তো ঢালাওভাবে সরকারের পক্ষে কথা বলেন।

জি এম কাদের :  হ্যাঁ, কেউ কেউ বলেন। আবার অনেকে বিরোধিতাও করেন। আমরা এ নিয়ে এরই মধ্যে একাধিক সভা করেছি। সবাইকে বলেছি, আমরা সরকারের নই, আমরা বিরোধী দল, সেভাবেই চলব।

কালের কণ্ঠ : সম্প্রতি কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরায় প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, এ নিয়ে কিছু বলবেন?

জি এম কাদের : আলজাজিরা একজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ডকুমেন্ট ও অভিযোগের ভিত্তিতে একটি সংবাদ প্রচার করেছে। সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও দলীয় নেতা এটিকে ঢালাওভাবে অসত্য বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে বলছেন না যে সংবাদটির ওই অংশটুকু অসত্য। কোনো যুক্তিও তুলে ধরছেন না। এখন দেখার বিষয়, জনগণ সংবাদটি কিভাবে গ্রহণ করেছে। একজন রাজনীতিক হিসেবে আমার আগে জনগণের মতটা বুঝতে হবে এবং সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।