সতর্ক হওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

Social Share

সবার ও সব কিছুর ওপরে রাষ্ট্র ও দেশ। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন সব কথাবার্তা ও কর্মকান্ড সব দেশে সব যুগে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। তারপরও দেখা গেছে যুগে যুগে এ কথার ভয়ানক ব্যত্যয় ঘটেছে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়েছে এবং বিদেশি শাসকদের জাঁতাকলে থাকতে হয়েছে দীর্ঘকাল। যাদের বিশ্বাসঘাতকতায় দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয় তারা সাধারণ কোনো মানুষ বা নাগরিক নয়। দেশের জনগণ কখনো নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। এ কাজটি তারাই করেছেন, যারা অতীতে ও বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার করিডর ও শীর্ষ পর্যায়ের কাছাকাছি থেকে রাষ্ট্রের অতি গোপনীয় বিষয়াদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেছেন অথবা কাছ থেকে সব দেখেছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরকম অবস্থানে থাকা অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির দীর্ঘ বয়ান শুনে উপরোক্ত স্বতঃসিদ্ধ পুরনো কথাগুলো আবার নতুন করে মনে পড়েছে। এই যে সব ব্যক্তি, এদের যোগ্যতা থাকুক অথবা না থাকুক নানা আঁকাবাঁকা পথ ধরে জায়গামতো অধিষ্ঠিত হয়। পদে বসে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিশাল অর্থকড়ি ও সম্পদের মালিক হয়, বিদেশে টাকা পাচারসহ দুবাই, কানাডা, সিঙ্গাপুর, লন্ডনে অট্টালিকা কিনে রাখে যাতে প্রয়োজন হলে চট করে সেখানে গিয়ে বাকি জীবনটা আরামে কাটানো যায়। পদে থাকা অবস্থায় মনে হয় তার মতো বিশ্বস্ত এবং অপরিহার্য লোক বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয় সাপ দুধ-কলা খেয়ে সাপুড়ের অনুগত থাকলেও সময় ও সুযোগ পেলেই স্বরূপে আবির্ভূত হয় এবং এমনকি সাপুড়েকে দর্শন করতে দ্বিধাবোধ করে না। ইতিহাসে এর হাজারো উদাহরণ আছে। পরম ও একান্ত বন্ধু ব্রুটাসই ছিল সম্রাট জুলিয়াস সিজারের অন্যতম প্রধান হত্যাকারী। তাই জুলিয়াস সিজারের সেই একটি উক্তি ইতিহাস হয়ে মানুষের মুখে মুখে, ‘ব্রুটাস তুমিও’। কত নির্মম, নিষ্ঠুর ও হৃদয় বিদারক বাস্তবতা।

অর্থ লোভ এবং বহুবিধ মোহগ্রস্ত মানুষ অর্থ প্রাপ্তি ও মোহকে চরিতার্থ করার জন্য যা কিছু করতে পারে। তাই যুগে যুগে দেখা গেছে দুর্নীতিবাজ রাজকর্মচারীরাই সব সময় রাজার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকা পেলে তারা রাষ্ট্রকে বিক্রি এবং প্রভুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতেও দ্বিধা করে না। জগৎ শেঠ, ঘসেটি বেগম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেটি এখন ইতিহাস হয়ে আছে। ঘসেটি বেগম ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার আপন বড় খালা। সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সেই ঐতিহাসিক

ডায়লগ সবাই জানেন। পলাশী যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে নবাব সিরাজ অসহায়ের মতো মীর জাফরকে বলেছিলেন, জনাব মীর জাফর আলী খান, আপনি শুধু আমার প্রধান সিপাহি সালাহর নন, পরম আত্মীয়ও বটে। কিন্তু তাতে মীর জাফরের মন গলেনি। ইতিহাস থেকে একটা উদাহরণ দিই। ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন সোভিয়েত  ইউনিয়নের ক্ষমতা দখল করেই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রটোস্কিকে শুধু দেশ ছাড়া করলেন না, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক সেখানেই গোপন বাহিনীর দ্বারা ট্রটোস্কিকে হত্যা করার জন্য গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলেকজান্ডার অরলভকে নির্দেশ দেন। কিন্তু অল্প দিনের মাথায় স্তালিনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেধে যাওয়ায় কর্নেল অরলভ দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আশ্রয় নেন। মেক্সিকোতে অবস্থানকারী ট্রটোস্কিকে অরলভ চিঠি দিয়ে সতর্ক করেন, তোমার হত্যাকারী যাচ্ছে, তুমি অপরিচিত মানুষ থেকে সাবধান হও এবং ইতিমধ্যে যারা ঘনিষ্ঠ পরিচিতজন হয়ে গেছে তাদের ওপর ডাবল ডাবল চেক এবং কড়া নজর রাখ। কিন্তু ট্রটোস্কি কর্নেল অরলভের এই চিঠিকে গুরুত্ব দিলেন না। সুতরাং যা হওয়ার তাই হলো। ১৯৪০ সালের ২০ আগস্ট অত্যন্ত সুরক্ষিত নিজ ঘরের ভিতরেই একান্ত বিশ্বাসী প্রাইভেট সেক্রেটারি আমেরিকান মহিলা সিলভিয়ার বাগদত্তা স্পেনীয় নাগরিক রেমন মারকেডের হাতে ট্রটোস্কি নিহত হলেন।

ফিরে আসি বাংলাদেশের কথায়। দেশি-বিদেশি একং শক্তিশালী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে নিহত হয়েছেন, এ কথা এখন সবাই জানেন। কিন্তু ফ্রন্টলাইনের হত্যাকারী নূর চৌধুরী, ডালিম এরা তো অবাধে বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাতায়াত করেছেন। শোনা যায়, ১৫ আগস্ট সন্ধ্যা বেলায়ও নাকি তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে। সেদিন ১৫ আগস্ট হত্যাকারীরা সন্ধ্যার পর থেকে প্রকাশ্যে সেনানিবাসের ভিতরে সন্দেহজনক প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা শুরু করে। রাত ১২টার পর থেকে ট্যাংকসহ সৈন্যদল সেনানিবাসের বাইরে অবস্থান নেয়। কিন্তু হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় ভোর ৫টা অথবা তার কিছু পর। তাতে দেখা যায়, পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগে থেকে তৎপরতা প্রকাশ্যে পরিচালিত হওয়ার পরেও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা কিছুই জানতে পারলেন না। এটা কেমন কথা। তখন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এবং সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিএফআইয়ের প্রধান কারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডের দিকে তাকালে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। এনএসআইয়ের প্রধান ছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা এ বি এম সফদার। জনাব এই সফদার, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিশেষ শাখায় কর্মরত থেকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর কি আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে। বিশ্বব্যাপী সামরিক বাহিনীর একটা স্বতঃসিদ্ধ নীতিমালা হলো, যুদ্ধের পর শত্রু পক্ষের বন্দীশালা থেকে প্রত্যাগত অফিসারদের চাকরিতে বহাল রাখলেও সংবেদনশীল গুরুত্বপূর্ণ পদে কখনো পদায়ন করা হয় না। তাহলে ব্রিগেডিয়ার রউফ কীভাবে ডিএফআইয়ের প্রধান হলেন। কার সুপারিশে, কার মাধ্যমে এ বি এম সফদার ও রউফ ওইসব জায়গায় নিযুক্তি পেলেন তার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না, হয়তো কোনো দিন তা পাওয়া যাবে না। কিন্তু পুরনো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, এখনো দেখছি ঠিক একই রকম ঘটনাই ঘটে চলেছে। লেখার শুরুতে যেমনটি বলেছি, সরকারের অত্যন্ত সংবেদনশীল সংস্থার এক সময়ের একজন প্রধানের সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি কিছু বক্তব্য শুনে আবার ওই পুরনো কথা মনে পড়েছে। তিনি যা বলেছেন, তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। কিন্তু তার চেয়েও বড্ড দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, যে এবং যারা সুপারিশ করে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ওইরকম সংবেদনশীল সংস্থার প্রধানের পদে ওই ব্যক্তিকে বসিয়েছেন তারা তো সবাই স্ব-স্ব অবস্থানে আগের মতোই আছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে একজন মানুষ ভবিষ্যতে কি করবে, না করবে তা কি পূর্ব থেকে সব জানা বা বোঝা যায়। এর প্রাথমিক উত্তর হবে না, সম্ভব নয়। কিন্তু এই উত্তরটি আংশিক সত্য। বিশ্বের এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার ভান্ডার এখন অনেক সমৃদ্ধ। স্বীকৃত অভিজ্ঞতা ও নীতিমালা নির্মোহভাবে অনুসরণ করা হলে এই ধরনের ছদ্মবেশী কাল সাপসম মানুষ কখনো ওই রকম সংবেদনশীল সংস্থায় নিয়োগ পেতে পারে না। কিন্তু অর্থের লোভ আর অঢেল অবৈধ সুযোগ-সুবিধার মোহ যাদের থাকে তারা এসব লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে সুপারিশ করে তাদের মাধ্যমে নিজেদের সব আকাক্সক্ষাকে চরিতার্থ করতে চায়। তাই বাছ-বিচারে তারা কখনো নির্মোহ হতে পারে না। আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খোন্দকার ২০১৪ সালে মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার বেদনায় এক বিতর্কিত বই লিখে কেলেঙ্কারিতে জড়ালেন। তখন এই কলামে দুই কিস্তিতে লম্বা প্রবন্ধে বলেছিলাম, স্যার জেনেশুনে বিষপান করবেন না। কিন্তু তখন তিনি বুঝলেন না, পাঁচ বছর পর এসে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বটে, কিন্তু পূর্ণ সত্য প্রকাশ করেননি। তিনি ভালো করেই জানেন ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে যে ষড়যন্ত্র চলছে সেটারই ধারাবাহিকতায় একটি গোষ্ঠী তাকে দিয়ে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ওই অপকর্মটি করিয়েছিল, যা তার ক্ষমা প্রার্থনার কথায়ও বোঝা যায়। ওই ষড়যন্ত্রকারীদের নামগুলো যদি তিনি বলতেন তাহলে জাতি-রাষ্ট্রের অনেক উপকার হতো। এটা তো এখন পরিষ্কার, ২০০৯ সাল থেকে একটার পর একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার লক্ষ্যে যার প্রথম বহির্প্রকাশ ঘটে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। তারপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশি-বিদেশি কারা চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল সেটি আমরা সবাই দেখেছি। সেই ষড়যন্ত্র থেমে গেছে তা ভাবার মতো কারণ নেই। তাই দেখতে পাচ্ছি, করোনার এই সংকটের সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অবসরপ্রাপ্ত সেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিপজ্জনক সব কথাবার্তা। একটু চোখ-কান যারা খোলা রাখেন তারা ভালো করেই জানেন দেশি-বিদেশি একটি শক্তি বলয়ের বাংলাদেশকে ঘিরে যে লক্ষ্য রয়েছে সেটি তারা কখনোই অর্জন করতে পারবে না যদি রাষ্ট্র ক্ষমতায় শেখ মুজিবের কোনো উত্তরসূরি থাকে। তাই ওই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কর্মকান্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না, এর পিছনে ইন্ধন রয়েছে আরও অনেকের, যেমন ইন্ধন ছিল এ কে খোন্দকারের পিছনে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দশ-বারো বছরে সব দিক থেকে বাংলাদেশকে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় আনার যে ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন তা যদি নির্বিঘ্নে আরও কয়েকটা বছর অব্যাহত থাকে তাহলে দেশি-বিদেশি ওই চক্রান্তকারীদের উদ্দেশ্য আর কোনো দিন সাধিত হবে না। সে জন্যই জাতির এই ক্রান্তিকালে তারা কখনো কখনো মরিয়া হয়ে মাঠে নামার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। যদি অ্যানিমি উইদিন, অর্থাৎ কাছের বিশ্বস্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিশ্বাসঘাতকতা না করে তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র কখনো সফল হবে না। মা, বাবা, ভাই সবাইকে হারিয়ে বাবার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সংগ্রামে শেখ হাসিনাকে সব সময়ই যেন একলা মনে হয়। বিশ্বাস করে, আপন ভেবে যাদের ওপর গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাদের অনেকেই যা করছেন এবং দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পর কেউ কেউ যা বলছেন সেটি অনুধাবন করতে গিয়ে জসীমউদ্দীনের কবর কবিতার দুটি লাইন মনে পড়েছে, ‘তারপর এই শূন্য জীবনে যত কটিয়াছি পাড়ি/যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।’ কার মনে কী আছে একমাত্র আলেমুল গায়েবই জানেন। এই বিষয়ে ইতিহাস ভালো শিক্ষা দেয় না। সুতরাং সতর্ক, সতর্ক এবং সতর্ক হওয়া জরুরি।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।