সংস্কৃতির আলো হাতে পথ হাঁটছে শিল্পকলা

14
Social Share

তরুণ ছেলেমেয়েদের আনাগোনায়, আড্ডায় মুখর হয়ে থাকে শিল্পকলা একাডেমি। জাতীয় নাট্যশালার সিঁড়িতে, নন্দন মঞ্চের সামনের সবুজ ঘাসে মানুষের আনাগোনা। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যানার ফেস্টুন আমন্ত্রণ জানায়। পুরো শিল্পকলা একাডেমি যেন ঢাকার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রধান গন্তব্য

পথচলার চার যুগ অতিক্রম করতে যাচ্ছে শিল্পকলা একাডেমি। এই পথ পরক্রিমায় দেশের শিল্পকলা চর্চার অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংস্কৃতির গৌরবময় বিকাশকে অব্যাহত রাখতে ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী চার দশকে সারা দেশে জেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমির ভবনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ জেলার শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে কোনো কার্যক্রম ছিল না। তবে গত এক দশকে এই অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে।

নাটকের উত্সব হোক অথবা পুতল নাট্যের, সেলিম আল দীন স্মরণ হোক কিংবা জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় নাট্য উত্সব—বছর জুড়ে কোনো না কোনো উত্সব চলতেই থাকে শিল্পকলায়। জাতীয় চিত্রশালায় চলে প্রদর্শনী। জাতীয় চিত্র প্রদর্শনী, ভাস্কর্য প্রদর্শনী, ফটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন আয়োজন থাকে সেখানে। সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে চলে গান অথবা নাচের অনুষ্ঠান। সংস্কৃতির বর্ণিল আয়োজন নিয়ে সবসময় প্রস্তুত শিল্পকলা একাডেমি। এর পাশাপাশি, জাতীয় নাট্যশালার মহড়া কক্ষে চলে একেকটি নতুন নতুন নাটকের মহড়া। সংস্কৃতির নানা আয়োজন নিয়ে দেশের শিল্পীদের ব্যস্ততা মন ভরিয়ে দেয়। এমনকি করোনা মহামারির মধ্যেও বন্ধ হয়নি দেশের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। করোনার মধ্যেও অনলাইনে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা দিনে দিনে সংস্কৃতির শহর হয়ে উঠছে। নগর জুড়ে জমজমাট অনুষ্ঠান মঞ্চগুলো তো সেই কথাই বলে। সারা বছরই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে সরগরম সংস্কৃতি অঙ্গন। শীতকালের শুরুতে তার ব্যাপ্তি যায় বেড়ে। তবে উত্সবের পাশাপাশি সংস্কৃতির জাগরণে দেশ জুড়ে কাজ করে চলেছে শিল্পকলা একাডেমি। বাজেটে কম বরাদ্দ, কম সুযোগের ভেতরেও উল্লেখযোগ্য কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাঁচটি বিভাগের মাধ্যমে দেশ জুড়ে একাডেমির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিভাগগুলো হলো—গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগ, অর্থ, হিসাব ও পরিকল্পনা বিভাগ, চারুকলা বিভাগ, নাট্যকলা বিভাগ এবং সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগ। এই পাঁচটি বিভাগ পরিচালিত হয় পাঁচ জন পরিচালকের দায়িত্বে।

‘আমাদের টাকা কম। কিন্তু কম টাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তো অনেক দিনের। নিজেদের দল চালানোর সময় তো কম বাজেটেই কাজ করি। সেই অভিজ্ঞতাই শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনায় কাজে লাগে—বলছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা আমাদের কাজের খুব বড় একটা অংশ। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সংরক্ষণের প্রতি। কেননা বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলার দায়িত্ব সেসব সংরক্ষণ এবং সেই সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে প্রশিক্ষিত শিল্পী তৈরি। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। তবে এসব কাজের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন সবার আগে জরুরি। আমরা সেই কাজে হাত দিয়েছি সবার আগে। সেইসঙ্গে চলছে জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমির বিস্তার ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজ।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের কাছে পৌঁছাতে শিল্পকলা একাডেমিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় পর্যায় তো বটেই জেলা পর্যায়েও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের দেওয়া হচ্ছে শিল্পকলা পদক। এর পাশাপাশি ‘শিল্পের আলোয় মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’, অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, পুতুলনাট্য, যাত্রা মঞ্চায়ন ও কর্মশালা, নাটকের বিভিন্ন শাখার প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা—এমনি অসংখ্য কার্যক্রম দেশ জুড়ে পরিচালনা করছে শিল্পকলা একাডেমি। শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা দেশের জেলা শিল্পকলা একাডেমি বছরে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজনের বাইরে নিয়মিতভাবে ১৩টি করে অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।

বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলায় শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব ভবন রয়েছে। নতুন করে ১৮টি জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে শিল্পকলা ভবন। সংস্কার করা হচ্ছে ৪৪ জেলার ভবন। বর্তমানে ১১টি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি উপজেলায় থানা প্রশাসনের বরাদ্দ করা বাড়িতে চলছে কার্যক্রম

শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছর উপলক্ষ্যে লিয়াকত আলী লাকী আরো বলেন, একাডেমিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন শিল্পকলায় যন্ত্রসঙ্গীত উত্সব চলছে। এতে সারা দেশের ১ হাজার ২০০ যন্ত্রশিল্পী অংশ নিয়েছেন। এমনিভাবে ঢাকার বাইরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক নাট্য উত্সব করা হচ্ছে ৬৪ জেলায়। সাহিত্যনির্ভর নাটক, মূল্যবোধের নাটক, মুক্তিযুদ্ধের নাটকের উত্সব হচ্ছে। এর পাশাপাশি শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে সারা দেশে চারটি উত্সবের আয়োজন করেছি আমরা। দর্শক সৃষ্টিতে গঠন করা হয়েছে ফিল্ম সোসাইটি। এসব কিছুই আমরা করছি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেশের মানুষকে যুক্ত করতে। এ যাত্রা এক স্বপ্নপূরণের যাত্রা। আমরা সেই পথে সবসময় নিয়োজিত।