সংবাদপত্র বা মিডিয়া সমাজের দর্পণ

53
Social Share

তোফায়েল আহমেদ:

জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করছে। এই যুগপূর্তিতে বাংলাদেশ প্রতিদিনে কর্মরত সব সদস্য ও পাঠকবর্গের জন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। বাংলাদেশ প্রতিদিন আমার অন্যতম প্রিয় পত্রিকা। দেশের জনপ্রিয় এই পত্রিকাটির আমি নিয়মিত পাঠক। প্রতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকাটি হাতে নিই। এখানে যারা কর্মরত আছেন তাদের প্রায় সবাই খ্যাতিমান সাংবাদিক। তারা সবাই একটি পরিবারের মতো সংঘবদ্ধভাবে পত্রিকাটি পরিচালনা করছেন। সমাজের প্রতিদিনের নানামুখী সমস্যা তুলে ধরতে বাংলাদেশ প্রতিদিন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করছে। সর্বান্তঃকরণে কামনা করি, পারস্পরিক এই পারিবারিক বন্ধন অটুট রেখে পত্রিকাটি সবলভাবে সচল থাকুক ও উত্তরোত্তর আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠুক।

পরাধীন আমলে ও স্বৈরশাসনের কালপর্বে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হতো। বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হতো। সে সময় আমরা সেসব কালাকানুনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আমার মনে পড়ে ১৯৬৬ সালের কথা। বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফার পক্ষে লেখা প্রকাশের কারণে পাকিস্তান দেশরক্ষা বিধির ৩২(১) ‘খ’ ধারা ও ৫২ ধারার ২ নম্বর উপ-ধারা মোতাবেক দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা ‘নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সংগ্রামী ছাত্রসমাজের ১১ দফাভিত্তিক ’৬৯-এর প্রবল গণআন্দোলনের দাবির মুখে দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে স্বৈরশাসক বাধ্য হয়।

জনসাধারণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া তুলে না ধরা ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পত্রিকার কী পরিণতি বহন করতে হয় ’৬৯-এর গণআন্দোলন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান চলাকালে যেসব পত্রিকা বাংলার মানুষের তথা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বৈরশাসকের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিল-যেমন ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিস বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অপরদিকে জাতীয় মুক্তির মহতী আকাক্সক্ষার স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের কণ্ঠস্বর তথা জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেছিল বিধায় ‘ইত্তেফাকের ওপর থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজপথে মানুষ জীবন দিয়েছে।

আজ স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সেসব কালাকানুন আর নেই। একটি গণমুখী পত্রিকা যদি গণমানুষের হৃদয় জয় করে নিতে পারে, তবে সেই পত্রিকার জনপ্রিয়তা অপ্রতিরোধ্য। সেখানে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর গণবিরোধী স্বার্থের বিপরীতে গণমানুষের অধিকারের প্রতিফলন আবশ্যক। সেজন্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-এ জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা যখন সংবিধান প্রবর্তন করি, তখন সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স¦াধীনতা’ নিশ্চিত করা হয়। সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয় যে-

“১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।

(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।”

লাখো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধানে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা, সাংবিধানিক আইনসমূহ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্র ও সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতির গঠনমূলক সমালোচনা তুলে ধরাটাই সংবাদপত্র বা মিডিয়ার কাছে আমাদের প্রত্যাশা। আমি বিশ্বাস করি, সেই প্রত্যাশা পরিপূরণে বাংলাদেশ প্রতিদিন উদয়াস্ত নিয়োজিত রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের শুভ জন্মদিনে আমার প্রত্যাশা পত্রিকাটি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের প্রতিদিনের দর্পণ হয়ে রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের তথা আমাদের সবার আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির পথ উন্মোচনের দিশারি হয়ে উঠুক।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।