শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ

75
Social Share

ড. মোঃ আওলাদ হোসেন:

১৭ মে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন দিবস। দীর্ঘদিন বিদেশে নির্বাসিত থেকে, ১৯৮১ সালের এই দিনে, শেখ হাসিনা স্বদেশের পবিত্র মাটিতে ফিরেছেন। ঐদিন ঢাকায় প্রচণ্ড তাপদাহ ছিল। সারাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে সমবেত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সাজসাজ রব। প্রচণ্ড গরমে মানুষের নাকাল অবস্থা। শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি যখন বাংলার আকাশে প্রবেশ করলো, আবহাওয়ার কারণে আকাশ তখন মেঘলা হয়ে আসলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে অঝোরে বৃষ্টি নামল। সেদিন মানিক মিয়া এভিনিউতে সমবেত জনতা তাপদাহের পর বৃষ্টিতে ভিজে স্বর্গীয় সুখ ও শান্তি পেয়েছিল।

শেখ হাসিনা ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত পরহেজগার ও ধর্মপ্রাণ একজন মুসলিম নারী। এই উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য ইরাক থেকে আসা শেখ আব্দুল আউয়াল এর বংশধর শেখ হাসিনা, পাঞ্জেগানা নামাজসহ অন্যান্য নফল নামাজ নিয়মিত আদায় করেন, নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং মহান আল্লাহর বাণী  আমল করার উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় অনুবাদসমূহ নিয়মিত পাঠ করেন। তিনি আলেম-ওলামাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন এবং সাক্ষাতে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক সফরকালে পথিমধ্যে ‌অবস্থিত ওলি-আউলিয়াদের মাজার জিয়ারত করেন এবং যথাযথ সম্মান করেন।

গত ০৯, ০৯, ২০২০ বুধবার, একাদশ জাতীয় সংসদের নবম অধিবেশনের মুলতবি অধিবেশনে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় সংসদ সদস্য ফকরুল ইমাম এক সম্পূরক প্রশ্নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট জানতে চেয়েছেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি খোঁজেন?” প্রশ্নোত্তরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভোরে ঘুম থেকে উঠেই আমি প্রথমে জায়নামাজ খুঁজি। সকালে উঠেই আগে নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পর কোরআন তেলাওয়াত করি…”।

এমনি একজন মহিয়সী নারী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আমরা গর্বিত। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির সম্মান বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আশির দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়- স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে শুরু করেন এক কঠিন সংগ্রাম, বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লড়াই।

২০২০ সালে সারাবিশ্বের ২১৩টি দেশে নির্মম তাণ্ডব চালিয়েছে মহামারী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)। করোনা‘র প্রথম ঢেউয়ে (First wave) বিভিন্ন দেশ করোনা‘র সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে লকডাউনসহ নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। World Food Program (WFP) অনুমান করে বলেছিল, করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশে লকডাউনের কারণে শুধু শিল্প নয়, কৃষিতেও উৎপাদন কম হবে, ফলে বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুরদর্শী নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষি বিভাগের সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের কারনেই বাংলাদেশে খাদ্য সংকট হয়নি। WFP এর ভবিষ্যৎ বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের দুইশতাধিক দেশের মধ্যে বাংলাদেশসহ ৭টি দেশের গৃহিত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের নীলনকশার অবশিষ্টাংশ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য অসংখ্যবার চেষ্টা করলেও মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি বেঁচে আছেন। গত ১ মে, ২০২১ শনিবার বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সৈয়দ বোরহান কবীর লিখেছেন- ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার এটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরতে গেলে দেখা যায় ১৯৯৪ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জে, ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে হত্যা চেষ্টা করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারটি, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারটি হত্যা চেষ্টার কথা প্রকাশ হবার কথা জানা যায়।

শেখ হাসিনার কয়েকটি হত্যা চেষ্টার মধ্যে-২০১১ সালে শ্রীলংকার একটি সন্ত্রাসবাদী দলের সাথে বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চুক্তি করে। এজন্য অগ্রিম টাকাও দেয়া হয়। শ্রীলংকার সেই সন্ত্রাসবাদী দলের আততায়ীদের টিম গাড়ি করে কলকাতা বিমানবন্দরে যাবার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনাটি। এর পেছনে বিদেশে পলাতক এক বিএনপি নেতার নাম এসেছে।

জিয়া পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শরিফুল হক ডালিম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করে, যা উইকিলিকসের সৌদি আরবের এক গোপন বার্তায় প্রকাশ পায়। হংকংয়ে বসবাসরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইসরাক আহমেদ এ পরিকল্পনায় অর্থায়ন করেন বলে গোপন বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৪ সালের শেষদিকে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গিদের মাধ্যমে মানব-বোমায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৫০ জন নারী ও ১৫০ জন যুবককে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। এদের নেতৃত্বে ছিল ১৩ জঙ্গি দম্পতি। তবে প্রশিক্ষণরত অবস্থায়ই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে ওই ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়, যার পেছনে বিএনপির হাত থাকার অভিযোগ আছে।

এছাড়া ২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে কারওয়ানবাজার এলাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে বোমা হামলার চেষ্টা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যরা। কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণও ঘটায় তারা, যাদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে বিএনপি, খালেদা জিয়া তার পরিবারের সদস্যদের অনেকেই।’

তবে শেখ হাসিনাকে প্রথম হত্যা চেষ্টা করা হয় ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। এ দিন চট্টগ্রাম মহানগরের লালদীঘির ময়দানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে ফেরার পথে তাঁর গাড়িবহরে পুলিশ কতৃক ব্রাশফায়ার করা হয়। শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও ১১ জন দলীয় কর্মী এতে প্রাণ হারান। শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সকল ষড়যন্ত্র থেকে মহান আল্লাহ আলৌকিকভাবে শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য।

২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজের প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জনসভার আয়োজন করা হচ্ছে। ২১ জুলাই জনসভাস্থলের অদূরে একজন চা’র দোকানদার পার্শ্বস্থ পুকুরে কেটলি ধোয়ার সময়, বৈদ্যুতিক তারের টুকরো কেটলিতে জড়িয়ে গেল। সেই তারের উৎসস্থল খুঁজতে গিয়ে জনসভাস্থলে পুঁতে রাখা ৭৬ কেজি ওজনের বোমার সন্ধান পাওয়া গেল। সেই সূত্রেই শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেল। মহান আল্লাহর ইচ্ছায়ই চা‘র দোকানদার ঐ সময় কেটলি ধুইতে গিয়েছিলেন এবং ঐ তারটি কেটলিতে জড়িয়ে গিয়েছিল।

২০০৪ এর ২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ট্রাকমঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। বক্তব্য শেষ করার কয়েক মূহুর্ত পূর্বে হামলাকারীরা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়লো। ট্রাকমঞ্চের যেই কর্নারে শেখ হাসিনা অবস্থান করছিলেন, ট্রাকের সেই কর্নারের বাহিরে সবগুলো গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো। সেখানে অবস্থানরত মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আইভি রহমানসহ অসংখ্য মহিলা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী শাহাদাৎবরণ করেছিলেন। মহান আল্লাহর আশির্বাদে একটি গ্রেনেডও ট্রাকে বিস্ফোরিত হয়নি। গ্রেনেড নিক্ষেপকারীরা নিশ্চয়ই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। তা সত্বেও মহান আল্লাহর আলৌকিক ইশারায় সবগুলো গ্রেনেডই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। পরবর্তিতে শেখ হাসিনা ট্রাকমঞ্চ থেকে নেমে অকুস্থলে অপেক্ষমান বুলেটপ্রুফ গাড়িতে উঠার সময় উনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারীদের ছোড়া গুলিতে আত্মহুতি দিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মাহবুব সাহেব। আল্লাহর কি মহিমা, ঐ মাহবুব সেদিন ছুটিতে ছিলেন। তিনি হঠাৎ করে কাহারো নির্দেশনা ছাড়াই ঐ মূহুর্তে ওখানে হাজির হয়ে দেহঢাল তৈরি করে নিজের শরীরে গুলিটা গ্রহণ করলেন। মহান আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখলেন।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসবেন। বঙ্গবন্ধুকে বরণ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক আয়োজন চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সংগত কারণেই তাঁর মনেও অনেক আনন্দ। কিন্তু তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল জার্মানিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। ৩০ জুলাই ১৯৭৫ ফ্লাইট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর মতিন চৌধুরীর অত্যন্ত স্নেহের ছাত্রী শেখ হাসিনা। তাই বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে উপাচার্য মহোদয়কে জানাতে গেলেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তিনি নিজের রচিত ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে বর্ননা করেছেন কিভাবে মহান আল্লাহ ১৫ আগষ্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে তাঁদের রক্ষা করেছেন। ঐ গ্রন্থের ৮০ ও ৮১ পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনা লিখেছেন, “আমি দেখা করে বিদেশে যাওয়ার কথা বলায়, তিনি (উপাচার্য অধ্যাপক মতিন চৌধুরী) প্রথমে আমাকে নিষেধ করলেন। আমি ড. ওয়াজেদের সেখানে একাকিত্বের কথা বলায় তিনি বললেন, তাহলে যেন অন্তত কয়েকটা দিন আমি অপেক্ষা করে ১৫ তারিখের অনুষ্ঠানটির পরে রওয়ানা করি।…স্যারের অনুরোধে আমি ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আমি ভাবতেও পারিনি যে তিনি আমাকে থেকে যেতে বলবেন। সুতরাং একটু অপ্রস্তুত হয়ে পরলাম।…

দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়েই বাসায় ফিরলাম এবং ফিরে এসেই মাকে স্যারের অনুরোধের কথাটা বললাম। কয়েকদিন আগে থেকেই আমার ছেলে জয়ের খুব জ্বর। সুতরাং থেকে যেতেই মনস্থির করে ফেললাম। কিন্তু সন্ধ্যায় ড. ওয়াজেদের ফোন এলো জার্মানী থেকে। আমি ওয়াজেদকে স্যারের নিষেধ এবং ১৫ তারিখে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে আমার ইচ্ছের কথা জানালাম। আরও বললাম, একদিকে জয়ের জ্বর, অন্যদিকে ১৫ তারিখের অনুষ্ঠান, আমি খুব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। উত্তরে আমার স্বামী জানালেন যে তিনি ইতিমধ্যেই ছুটি নিয়ে ফেলেছেন এবং বাজারও করে ফেলেছেন। অগত্যা আমি যাওয়াই স্থির করলাম। ৩০ জুলাই ঢাকা ছাড়লাম, ৩১ জুলাই জার্মানী পৌঁছলাম।…মাঝে মাঝে মনে হয়, সেদিন যদি স্যারের কথা অমান্য না করে ঢাকায় থেকে যেতাম…।”
৩০ জুলাই ১৯৭৫ শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল পশ্চিম জার্মানী গমন করলেন এবং সেখানেই অবস্থান করলেন। পরবর্তিতে ভারতে অবস্থান করেছিলেন।

১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ এর কালো রাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ধানমন্ডি ৩২ নং বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অবস্থানরত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সকল সদস্য ও অন্যান্য সকলেই শাহাদাৎ বরণ করেন, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান। এমনি আলৌকিক ভাবেই মহান আল্লাহ শেখ হাসিনাকে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।

মহান আল্লাহ শেখ হাসিনাকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবেন, হয়তোবা সে কারণেই তাঁর দুই কন্যাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে।

শেখ হাসিনা ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেন এবং দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সেই থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নিম্নআয়ের দেশের তালিকা থেকে উন্নীত হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি সেক্টরের বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।

১৯৭১ সালে এ দেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। প্রতিনিয়তই দেশের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। বিশেষ করে আবাসন, শিল্পকারখানা স্থাপন, নগরায়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর করে কৃষিজমি কমছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, এছাড়া একই কারণে ফসলি জমিও কমছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের সংখ্যা, বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উদ্বৃত্ত হলো। শেখ হাসিনার নির্দেশনায় কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছে, কৃষিবিদদের পরামর্শ মোতাবেক কৃষকগণ মাটি চাষ করেছেন। কৃষকের চাষ করা জমিতে মহান আল্লাহ ফসল ফলনে বরকত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলো বাংলাদেশ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন-, ‘নির্জিব জমিন ওদের (মানুষের) জন্য একটি নিদর্শন, যাকে আমি সঞ্জীবিত করি এবং যা হতে জন্মাই শস্য যা ওরা খায়। ওতে আমি সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের উদ্যান এবং উৎসারিত করি প্রস্রবণ; যাতে ওরা ভক্ষণ করতে পারে এর ফলমূল যা ওদের হাতের সৃষ্টি নয়…. ‘(সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৩, ৩৪, ৩৫)।

খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যই মহান শেখ হাসিনার শাসনকালে বছরগুলোতে আল্লাহর অশেষ রহমতে দেশে অনাবৃষ্টি নাই, অতিবৃষ্টি নাই, খরা নাই, রোগবালাই-এর আক্রমণ নেই বললেই চলে। যদিওবা কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা গেছে, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে শেখ হাসিনার দুরদর্শী নির্দেশনায় কৃষি বিভাগ সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রন করেছে। কক্সবাজারে পঙ্গপালের আক্রমণ করলেও মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে সরকারের কৃষি বিভাগ পঙ্গপাল ধ্বংস করতে সমর্থ হয়েছে। এমনকি ফসল ঘরে তোলার আগে পর্যন্ত বন্যা বা হাওর এলাকায় অপ্রত্যাশিত ঢলও নেই। ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপি ভয়াবহ বন্যা হলেও তাঁর দূরদর্শী পদক্ষেপে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। ধান কাটা শেষ হওয়ার এক/দুইদিন পর ঢল এসেছে। এই প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ সবই মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। শুধু ধানই নয়, সবজি, আলু, মাছ, দুধ, ডিম, মাংস ফলমূল সবকিছুরই উৎপাদন বেড়েছে। সবকিছুই মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এমনকি করোনাকালে রেমিটেন্স বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সবই মহান আল্লাহর আশির্বাদ।

মহান স্রষ্টা অলি-আউলিয়ার বংশধর, ধর্মভীরু, অত্যন্ত পরহেজগার মুসলমান নারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশটাকে সাজানোর পরিকল্পনা করেছেন। আর সে কারণেই ১৯৮৮, ১৯৭৫, ২০০০ ও ২০০৪ এর আগস্টের হামলাসহ সকল বিপদ থেকে মহান আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতেই মহান আল্লাহ বারবার সকল প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুকরিয়া মহান আল্লাহর দরবারে।