শুভ জন্মদিন : বাংলা সাহিত্যের যুগস্রষ্টা কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

198
Social Share

জয়ন্ত আচার্য-

যুগে যুগে দেশে দেশান্তরে অনেক প্রতিভার জন্ম হয়েছে, তবু এমন বিস্ময়কর এবং বিচিত্র প্রতিভার দৃষ্টান্ত বিশ্বে একমাত্র মধুসুদনই। একমাত্র শুধু তিনিই এমন কৌতুহলোদ্দীপক কাণ্ড করতে পেরেছেন, যিনি সাহিত্য রচনার সময় একটি মাত্র বিষয়ে নির্দিষ্টচিত্ত না হয়ে প্রায় আধডজন শ্রুতিলিপিকর লাইন দিয়ে বসিয়ে হেটে হেটে ডিকটেশন দিয়ে একসঙ্গে তিন চারখানা গুরুত্বপুর্ণ ও ভাবগম্ভীর কাব্য রচনা করতেন। প্রতিভার দীপ্তি কত প্রখর হলে একজন কবি সাহিত্য রচনায় এমন বিস্ময়কর এবং অসাধ্য সাধন করার খেলা অবলীলায় খেলতে পারেন। এই অলৌকিক প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিটির নামই মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।আজ তার ১৯৮ তম জন্মদিন।

এই যে এ রকম অবিশ্বাস্য প্রতিভার অধিকারী মাইকেল তার নিজের গোটা জীবনটাও ছিল একই রকম বিস্ময়কর এবং জীবনবাজি ধরা বিচিত্র সব এলোমেলোমিতে পুর্ণ। অদম্য উৎসাহ, প্রচন্ড উচ্চাকাংখা এবং ভয়ঙ্কর হঠকারিতা-এই নিয়েই গড়ে উঠেছিল মাইকেলের গোটা জীবন। তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন ধুমকেতুর মতো প্রচণ্ড গতিতে। তারপর ধুমকেতুর মতেই স্বল্প সময়ের স্থায়িত্বে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের আকাশে একরাশ বিস্ময় ছড়িয়ে অন্তর্হিত হয়েছিলেন।

মাইকেলের জন্ম ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি, যশোহর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী সাগরদাঁড়ি গ্রামে। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত, মাতা জাহ্নবী দেবী। জন্মলগ্নে সোনার চামচ মুখে নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন মধুসুদন। কিন্তু সেই সোনার চামচ তার মুখে বেশি দিন থাকবার সুযোগ পায়নি। ওই যে প্রচণ্ড উদ্দামতা আর হঠকারিতা- এর তীব্রতাই তাঁর জীবনকে ক্রমাগত ঘুণির পর ঘুর্ণির পাকে ফেলতে লাগল। এই পাক খেতে খেতেই সবাইকে চমচ লাগিয়ে তিনি নিজেই একদিন মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন সবার অলক্ষ্যে।

তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয় সাগরদাঁড়ির পাঠশালায়। ১৮৩৩ সালে পাঠশালার পড়া শেষ করে ভর্তি হন কোলকাতার হিন্দু কলেজের জুনিয়র স্কুলের সর্বনিু শ্রেণীতে। তিনি ১৮৪১ সালে এই কলেজের সিনিয়র বিভাগে প্রবেশ করেন। এ সময় পাশ্চাত্যের ভাব ও আদর্শের প্রতি তিনি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে শুরু করেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার প্রগাঢ় অনুরাগ জন্ম নেয়। নারী শিক্ষার ওপর ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখে হিন্দু কলেজ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

এই সময় তার কবিত্ব শক্তিরও উন্মেষ ঘটে। ইংরেজিতে কবিতা রচনা করে বেঙ্গল স্পেকটেটর, গ্রামার, ক্যালকাটা লিটার‌্যারি গেজেট, লিটার‌্যারি ব্লসম কমেট প্রভৃতি প্রতিকায় প্রকাশ করতে থাকেন। তার অন্তরে হোমার, ভার্জিল, ওভিদ, দান্তে এবং মিলটনে মতো মহাকবি হওয়ার স্বপ্ন ও আকাংখা জেগে ওঠে। ইংল্যাণ্ডে গিয়ে উংরেজিতে কাব্যর্চ্চা করলে তার এই আশা ফলবর্তী হবে মনে করে সেখানে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
বিলেতে যাবার সুবিধে হবে এ আশায় ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টানধর্ম গ্রহণ করেন। এদিন থেকেই তার নামের আগে মাইকেল শব্দটি যোগ হয়ে যায়। কিন্তু খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেই সহসা মধুসূদনের বিলেত গমনের কোনও সুবিধে হলো না। ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য হিন্দু কলেজ থেকে (১৮৪৩) বিতাড়িত হন। এরপর ভর্তি হন বিশপস কলেজে। এখনে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃতি ভাষা শিক্ষা করতে থাকেন।


খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ফলে পিতা ও স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পিতা অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিলে কোলকাতা ছেড়ে ভাগ্যের অন্বেষণে মাদ্রাস গমন করেন। পরে ১৮৫২ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইস্কুল বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র পান। সেখানকার দৈনিক পত্রিকা স্পেকটেটর এর সহকারী সম্পাদকের পদেও দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন মাদ্রাজের হিন্দু ক্রোনিকল পত্রিকা সম্পাদনা করেন। মাদ্রাজে প্রবাসকালে হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। টিমোথি পেনপোয়েম ছদ্মনামে ইংরেজি প্রবন্ধ লিখে মাদ্রাজ সার্কুলার, স্পেকটেটর ও হিন্দু ক্রোনিকল পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন।

মাদ্রাজে বসবাসকালেই ১৮৪৮ সালে তিনি রেবেকা টমসন নামের এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ে তার সুখের হয়নি। এই সময়ই অর্থাৎ ১৮৪৯ সালে তিনি ক্যাপটিভ লেডি নামে একটি ইংরজিকাব্য রচনা করেন। তার এই কাব্যগ্রন্থ পড়ে বিখ্যাত ইংরেজ পাদ্রি বেথুন সাহেব বিদেশী ভাষা ইংরেজি ছেড়ে তাকে মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চার করার উপদেশ দেন। হয়তো বেথুন সাহেবের এই সদুপদেশ কবির মনকে আলোড়িত করেছিল। কারণ, এরপর থেকে ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার যে প্রচণ্ড অন্ধ মোহ ছিল, তার অনেকটাই কমে আসতে থাকে। এরপর তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত, হিব্রু ও তেলেগু ভাষা শেখার দিকে ঝুকে পড়েন।
মাদ্রাজে থাকতেই হেনরিয়েটার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এবং প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর এই নিয়ে স্ত্রী রেবেকার সঙ্গে কলহ চরমে উঠলে তিনি (১৮৫৫-৫৬) খ্রিষ্টাব্দে পিতা মাতার মৃত্যুর পর মাদ্রাজ ছেড়ে চলে আসেন কোলকাতায়। রেবেকাকে ত্যাগ করে ঘরে তোলেন স্ত্রী হিসেবে হেনরিয়েটাকে।

এরপর থেকে শুরু হয় তার প্রচণ্ড অর্থকষ্ট। স্বজাতি ও স্বধর্ম ত্যাগ করার কারণে পিতৃসম্পত্তি থেকে আগেই বঞ্চিত হয়েছিলেন। অথচ এই সময়টাই ছিল তার সাহিত্যজীবনের নবান্নের কাল। সৃজন উৎপাদনার প্রবল বন্যায় তিনি ভাসিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার সাহিত্যকানন।
কোলকাতায় এসে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টে কেরানিগিরি শুরু করেন। পরে দোভাষীর চাকরি নেন। এ সময় বাংলা ভাষায়র প্রতিতার আগ্রহ জাগতে শুরু করে। এতোকাল ইংরেজি ভাষার চর্চা করে আসলেও এবার বাংলা ভাষার সেবায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন।

রামনারায়ণ তর্করত্নের (১৮২২-৮৬) রচনাবলী (১৮৫৮) নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে পাইকপাড়ার (কোলকাতা) রাজাদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে শখের নাট্যশালার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। এই নাট্যশালায় রত্নাবলীর নাটকের অভিনয় দেখে মধুসুদনের মনে বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প জেগে ওঠে। মহাভারতের দেবযানী যযাতি উপাখ্যান অবলম্বন করে পাশ্চাত্যে রীতিতে রচনা করে শর্মিষ্ঠা (১৮৫৮) নাটক। ইয়ং বেঙ্গলদের উচ্ছৃংখলতা ও অনাচারকে ব্যঙ্গ করে একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৫৯) এবং আচারনিষ্ঠ প্রাচীনপন্থি রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের গোপন লাম্পট্যকে পরিহাস করে বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁর (১৮৫৯) নামক দুটো প্রহসন রচনা করেন। তারপর গ্রিক পুরান থেকে উপাখ্যান সংগ্রহ করে রচনা করেন পদ্মাবতী (১৮৬০) নাটক। রাজুত ইতিহাস থেকে আখ্যানবস্তু গ্রহণ করে রচনা করেন বিয়োগান্ত নাটক কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১)।
তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। সংস্কৃত সাহিত্য (রামায়ণ ও মহাভারত) থেকে গৃহীত উপাখ্যানকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের রূপ ও রীতিতে বিন্যস্ত করে এবং তাকে সমকালীন ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী কাব্যিক রূপ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের নবযুগের সৃষ্টি করেন।

মহাভারতের সুন্দ ও উপসুন্দ কাহিনীকে অবলম্বন করে রচনা করেন তিলোত্তমা সম্ভব (১৮৬০) কাব্য। রামায়ণের রাম রাবণের কাহিনীর ওপর ইউরোপীয় মহাকাব্যের সৌন্দর্য ও দীপ্ত শৌর্যের রং ফুলিয়ে ওজম্বিনী ভাব ও ভাষায় রচনা করেন তার অমরকাব্য মেঘনাদবধ (১৮৬১)। রামায়ণের অধর্মচারী পাপী ও বর্বর রাক্ষস রাবণকে বীর দেশপ্রেমিক, অসমযোদ্ধা এবং এক অটল শক্তির আর হিসেবে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের প্রধান কবি হিসেবে আবির্ভূত হন। ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১) তার রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য। রোমান কবি ওভিদের হিরোয়দস কাব্যের আদর্শ রচনা করেন তার পত্রকাব্য বীরাঙ্গনা (১৮৬২)। এই একাব্যের এগারোটি পত্রের (যেমন সোমের প্রতি তারা, নীলধ্বজের প্রতি জনা, দশরথের প্রতি ইকয়ী) নায়িকার চরিত্রগুলো হিন্দু পরাণ থেকে নেয়া।
তিনি বাংলার কাব্যসাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্ট। পদ্মাবর্তী নাটকের মাধ্যমে প্রথম তিনি এই ছন্দের সুচনা করেন। মেঘনাদবধ ও বীরাঙ্গনা কাব্য-র আদ্যোপান্তে অমিত্রাক্ষর ছন্দেই রচিত। এই ছন্দে মেঘনাবধ কাব্যে বীররস ও বীরাঙ্গনা কাব্যে করুণ রস সৃষ্টিতে অসাধারণ শিল্পকুশলতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

১৮৫০ থেকে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ- এই সময়টাই ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনের স্বর্ণযুগ। তার সহিত্যখ্যাতি ও যশ এই সময় হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। কিন্তু সেই যে তার চিরাচরিত বিশৃংখল জীবনযাপন, অমিতব্যয়িতা আর হঠকারিতা- সে কারণেই তার জীবনের বিষন্নতা আর অর্থকষ্ট দুর হয়নি। জীবনেও আসেনি নতুন কোন পরিবর্তন।

দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত আর সাহিত্যে খ্যাতিলাভের দুর্দমনীয় উচ্চকাংখা তাকে আরও অস্থির করে তোলে। বিলেত গিয়ে ইংরেজি ভাষায় কাব্যরচনা করে বিশ্বখ্যাতি লাভের আকাংখা তাকে পেয়ে বসে রীতিমতো খ্যাপা বাউলের মতো। এরপর তিনি ১৮৬২ সালে ব্যারিষ্টারি পড়া ও ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চার প্রচণ্ড বাসনা নিয়ে যাত্রা করেন বিলেতে।

বিলেত গিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু কিছুদিন ভালোভাবে কাটলেও স্ত্রী পুত্র পরিবার নিয়ে তিনি আবার পড়ে যান অর্থসংকটে। কষ্ট সইতে না পেরে সেখানে থেকে পরের বছর তিনি চলে যান ফ্রান্সে।

তিনি এতটা অর্থসংকটে পড়েন যে, অর্থের জন্য তিনি স্ত্রী হেনরিয়েটার যাবতীয় গহনাপত্র, গরের জিনিসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হন। তবু দেনার দায় শোধ করতে পারেননি। পাওনাদাররা তাকে জেলে পর্যন্ত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন।

এরপর তিনি দিশেহারা হয়ে স্বদেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে চিঠি লিখেন। বিদ্যাসাগর তাকে টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। বিদ্যাসাগরের অর্থ সাহায্যে আবার শুরু হয় তার ব্যারিষ্টারী পড়া। তিনি ১৮৬৫ সালে ব্যারিষ্টারি পড়া শেষ করে ১৮৬৭ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন।
তিনি ফ্রান্সের ভাসাই নগরীতে অবস্থানকালে ইতালীয় কবি পেত্রার্ক-এর অনুকরণে চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) রচনা করেন। চতুর্দপদী কবিতাবলী (১৮৬৬) নামে এগুলো পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।দেশে ফিরে কোলকাতায় শুরু করেন আইন ব্যবসা। জমেও ওঠে। আসতে থাকে প্রচুর অর্থ। দুর হয় দারিদ্র। কিন্তু বিলাসিতা ওঠে চরমে। তিনি নিজের বাসা ছেড়ে তৎকালীন কোলকাতার সবচেয়ে বিলাস ও ব্যয়বহুল হোটেল স্পেনসেসে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
এরপর তিনি ফ্রান্স থেকে স্ত্রী পুত্রকেও ফিরিয়ে আনেন স্বদেশে। মধুসূদন হোটেল ছেড়ে বাসা ভাড়া করে হেনরিয়েটাকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
কিন্তু সাহিত্যের নেশায় সর্বক্ষণ বিভোর থাকতেন বলে তার আইনের ব্যবসায় আবার মন্দা দশা শুরু হয়। মক্কেল ছুটে যেতে থাকে। আর সেই আয় কমতে শুরু করে আয়। শুরু হয় আগের মতোই নিদারুণ অর্থকষ্ট। তাই বাড়তি কিছু আয়ের জন্য তিনি আদালতে খণ্ডকালিন অনুবাদকের কাজও নেন।
১৮৭২ সালে মধুসূদন আইন ব্যবসা ছেড়ে শহরের জনৈক বড় ব্যবসায়ীর আইন উপদেষ্টার কাজ নেন। কিন্তু এ কাজও তার ভালো লাগল না। অচিরে এই কাজ ছেড়ে দিয়ে তিনি আবার শুরু করেন আইন ব্যবসা।
কিন্তু সেই যে জীবনে শুরু থেকে অস্থিরতা- এটা চেড়ে ওটা, ওটা ছেড়ে আরেকটা, এমনি করতে করতেই পার হয়ে যায় অনেক সময়। জীবনে অনেকটা মুল্যবান সময় কেটে যায় অস্থিরতার মধ্যে দিয়েই।
তাই শেষবারের মতো আবার যখন ব্যবসা শুরু করেন। তখন তিনি তেমন সুবিধা করতে পারলেন না। শরীর আর মন দুটোই তার ভেঙে পড়ল চরমভাবে। আর সেই সুযোগে অর্থসঙ্কটের বিকট দানব তার দিকে আরও ভয়ঙ্কর মূর্তিতে এগিয়ে আসতে থাকে।

এই সময় অর্থকষ্টে তিনি প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েন। আর ধীরে ধীরে তার বক্ষপিঞ্জরে বাসা বাধতে থাকে কালব্যাধি। সেই রোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় কোলকাতার জেনারেল হাসাপাতালে।

এদিকে স্ত্রী হেনরিয়েটাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুন এই পতিপ্রাণা বিদেশীনীর প্রাণবিয়োগ ঘটে। স্ত্রীর মৃত্যুর সংবাদ মধুসূদনের জীবন প্রদীপকে আরও যেন ক্ষীণতর করে দিল। এই মৃত্যুশোক তিনি সইতে পারলেন না। আর তাই তার মৃত্যুর দুদিন পরেই ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন তিনিও শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। এমনি করেই বাংলা সাহিত্যকাশের এক কালজয়ী স্রষ্টার বহু উত্থান পতনময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা পুরুষ মধুসূদন তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন করে গেছেন। সে জন্য তার নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে।আজ তার শুভ জন্মদিন । বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল কিংবদন্তির কবির আজ ১৯৮ তম জন্মদিনে তার প্রতি রইল শ্রদ্ধঞ্জলি ।