পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ঐতিহাসিক জয়ের দুদিন পর বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, কলকাতার নিকটবর্তী উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রামে বিজেপি নেতার পিএ চন্দ্রনাথ রথকে দুবার গুলি করা হয়। রথের সঙ্গে থাকা বুদ্ধদেব নামে আরেক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর মধ্যমগ্রাম ও এর আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে।
বিজেপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও তৃণমূলের রথিন ঘোষ মধ্যমগ্রাম থেকে দুই হাজার ৩৯৯ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর পিএকে হত্যার ঘটনাটি এমন এক দিনে ঘটল, যেদিন বিজেপি অভিযোগ করেছে– তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা বিজেপি সমর্থকের ছদ্মবেশে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুর আসনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত করে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রধান দাবিদার। এ ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসকে দোষারোপ করছে বিজেপি। দলটির নেতা নিখিল প্রসুন বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস যে সহিংসতার সংস্কৃতি জন্ম দিয়েছে, এটা তার ফল। খুব নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এর তদন্ত হওয়া উচিত।
শুভেন্দুর পিএ চন্দ্রনাথের নিহত হওয়ার ঘটনা গত সোমবার ভোটের ফলাফল প্রকাশের ধারাবাহিক সহিংসতার অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। গত তিন দিনে চন্দ্রনাথসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হলেন। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির দুজন করে কর্মী রয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা থামাতে গিয়ে রাজ্য পুলিশের দুই সদস্য গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের তিন জওয়ান।
গত সোমবার নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি ও হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সহিংসতা বাড়তে থাকে। ওই দিন কলকাতার পার্শ্ববর্তী জেলা হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে এক বিজেপি কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন চব্বিশ পরগনা জেলার নিউটাউনে বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলা চালিয়ে এক বিজেপি কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। নিউটাউন থানা এলাকার বালিগুটিতে এ ঘটনা ঘটে। পরে উত্তেজিত বিজেপি কর্মীরা তৃণমূল সমর্থকদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেন।
সহিংসতায় দুই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীও নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিজেপি কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার বেলেঘাটায় নিহত হন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক। তিনি তৃণমূল বুথ এজেন্ট ছিলেন। বীরভূম জেলার নানুর সন্তোষপুরে আরেক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবির শেখকে বিজেপির কর্মীরা রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তাদের তিন থেকে চারশ দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হামলা হয়েছে ১৫০ প্রার্থীর বাড়িতে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন তিনি। তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য বলেন, সহিংসতা-ভাঙচুরে তাদের কোনো কর্মী জড়িত নন। তিনি সহিংসতা বন্ধের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বিজেপি নির্বাচনে জয়ের পরদিনই উত্তর ভারতের ধাঁচে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার হগ মার্কেট বা নিউমার্কেটে দোকানঘরে বুলডোজার চালানো শুরু হয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেখানে বুলডোজার চালিয়ে একাধিক দোকানঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। নিউমার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের।
কে হচ্ছেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী
ভোটে বড় জয়ের পর এখন প্রশ্ন– কে হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী? বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দলের পরিষদীয় দলনেতা বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আছেন উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিও। সূত্র জানায়, আজ বৃহস্পতিবার কলকাতার কোনো হোটেলে একটি বৈঠক হতে পারে। সেখানেই জানা যাবে মুখ্যমন্ত্রীর নাম।
পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একাধিক নাম চর্চায় থাকলেও পাল্লা কার ভারী, তা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না বিজেপির কোনো শীর্ষ নেতা। তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবার থেকে এগিয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়া বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য, সাবেক রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, সংসদ সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত, সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও বিধায়ক সৌরভ শিকদারের নামও শোনা যাচ্ছে। বিজয়ী বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আগামী ৯ মে শনিবার সকাল ১০টায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হবে।




