শহীদ ডা. মিলন দিবস ॥ নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও বিএমএ

25
Social Share

আজ যে সময়ে আমরা শহীদ ডা. মিলনকে স্মরণ করছি তখন গোটা বিশ্ব করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় অনেকটা পর্যুদস্ত। অর্থনীতি বিপর্যস্ত, ভবিষ্যত অনিশ্চিত। বিশ্ববাসী অপেক্ষায় কার্যকর, নিরাপদ ভ্যাকসিনের। বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকটা সামলে উঠেছে। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সকল দেশের মানুষ তৎপর।

১৯৯০ সালের ২৭ নবেম্বর বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও ২৩ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের এক পর্যায়ের কর্মসূচী ছিল- সারাদেশে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জরুরী চিকিৎসা বহাল রেখে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং পিজি হাসপাতালের বটতলায় বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশ। কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আশপাশে চলছিল উত্তপ্ত মিছিল-সমাবেশ। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সঙ্গে এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর চলছিল ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি। এর মধ্যে ২৭ নবেম্বর ডা. জালালের সঙ্গে পিজি হাসপাতালের সভায় যোগদানের জন্য একই রিকশার যাচ্ছিলেন ডা. মিলন। রিকশাটি টিএসসি চত্বরে যেতেই থ্রি নট থ্রি এর এক হিংস্র বুলেট কেড়ে নিল ডা. মিলনের তাজা প্রাণ। সঙ্গে সঙ্গে মিলনকে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নেয়া হলো। সেখানে চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে সবাইকে কান্নায় ভাসিয়ে মিলন চলে গেলেন ওপারে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক-ছাত্র-সর্বস্তরের মানুষ নেমে এলো রাজপথে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের দাবিতে। ৪ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর তারা ঘরে ফিরেছে। ডা. শামছুল আলম খান মিলন ছিলেন তৎকালীন বিএমএর যুগ্ম মহাসচিব, ঢামেক শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন, একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে চাই একটি স্বাস্থ্যবান জাতি। এ জন্য তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি গ্রহণ করেছিলেন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রে একটি শক্ত নীতিমালা, পরিকল্পনা, অবকাঠামো রেখে গেছেন যার উপরে গড়ে উঠেছে আজকের বিশ্ব নন্দিত অনেক কার্যক্রম। বঙ্গবন্ধুর ভাবনা-পরিকল্পনার মধ্যে স্পষ্টত গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাস্তবায়নই লক্ষ্য ছিল যেখানে দুঃখী মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তিনি ‘রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম (চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব)’-ধারণা থেকেই গড়ে তুলেছিলেন গ্রামীণ স্বাস্থ্য কাঠামোসহ নানাবিধ পরিকল্পনা।

২৭ নবেম্বর ছিল বিএমএর দেশব্যাপী কর্মসূচী। তৎকালীন পিজি হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত সভায় যাওয়ার পথে ডা. মিলন টিএসসিসহ চত্বরে শহীদ হন। শহীদ ডা. মিলন, নূর হোসেন, জিহাদের মৃত্যু এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করে এবং ৬ ডিসেম্বর ৯ বছরের স্বৈরশাসনের পতন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই ৮ ডিসেম্বর গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন কিন্তু স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেই জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১২/১২/৯৬ তারিখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং- হাস-১/স্বানী-২/৯৫/১১৭ সূত্র মোতাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সভাপতি করে ২৬ সদস্যের ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় উপনেতা অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) এবং অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুযায়ী জনগণের পুষ্টির উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যসহ স্বাস্থ্যনীতিতে ১৫টি লক্ষ্য, ১০টি মূলনীতি এবং ৩২টি কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়। ২০০০ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি সর্বস্তরের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করে মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নের সকল দিক নির্দেশনা বিদ্যমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে এ স্বাস্থ্যনীতি হালনাগাদ করা হয়। এ স্বাস্থ্যনীতি অনুসরণ করে চললে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে। পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকার চিকিৎসকদের প্রাণের ২৩ দফা দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করেছে।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে জনবল, অবকাঠামো, কর্মবিন্যাস এবং পরিকল্পনা দুর্বল বলা যাবে না। বিগত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ করেছেন। এখন এ খাতের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে সময়োপযোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। করোনাকালীন সময়ে যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-ব্যবসায়ীর সীমাহীন দুর্নীতি যাদের কাছে মানুষের জীবনের কোন মূল্যই নেই।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি জরুরী বিষয়- যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় দ্রুত, বাস্তবায়ন করতে হয় ত্বরিত। ধীরগতি বা গাফিলতির কোন সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন এদেশের চিকিৎসকদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। উন্নত বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণে মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা অপরিসীম, কখনও কখনও প্রধান। আমরা আশা করি সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিএমএ দেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় রেখে আন্তরিক ও সহযোগী মনোভাব নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে ব্রতী হবে। আমাদের সংশ্লিষ্ট সকলের দেশের জনগণের যথাযথ চিকিৎসা প্রদানের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

কি করতে হবে- সেটা সংশ্লিষ্ট মহলের জানা আছে। প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মোকাবেলা করা। করোনাকালের বিগত নয় মাসে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। এরপরেও দেশের বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে। করোনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার যে দুর্বলতা উন্মোচন করেছে, করোনা প্রতিরোধের মাধ্যমেই তার জরুরী সামগ্রিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

এজন্য কিছু সুপারিশ সংক্ষেপে পেশ করছি-

১) স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ: একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের মাধ্যমে অবকাঠামো এবং কর্মচারীদের দায়িত্ব পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি কাজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং এবং ফলো আপ থাকতে হবে।

২) স্বাস্থ্য জনশক্তি পরিকল্পনা : জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক-নার্স- টেকনোলজিস্ট- কর্মচারীদের একটি দীর্ঘ মেয়াদী জনশক্তি পরিকল্পনা থাকতে হবে।

৩) বাজেট : প্রয়োজনীয় বাজেট (জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০%) বরাদ্দ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৪) নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা : চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার প্লানিংসহ একটি গ্রহণযোগ্য বদলি- পদোন্নতি কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে যেখানে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বদলির কাজ ও তদ্বির নিয়েই মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে বেশি সময় ব্যস্ত থাকতে হয়।

৫) মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন : স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করেছে শিক্ষা ও সেবার মান কিভাবে উন্নয়ন করা যায়। সে কারণে দেশের প্রতিটি সরকারী মেডিক্যাল কলেজ ও প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬) বিএমডিসিকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।

৭) বেসরকারী কলেজ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা : বেসরকারী খাতকে গুরুত্ব ও সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে সরকারের নীতিমালা হালনাগাদ করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আনতে হবে যাতে নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়।

৮) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে : প্রতিটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৯) স্বাস্থ্য প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ : কেন্দ্র থেকে আর প্রশাসন গোটা দেশে নিয়ন্ত্রণ বাস্তবসম্মত নয়। তাই, গতিশীল করতে হলে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করে প্রশাসন পুনর্বিন্যাস জরুরী।

১০) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন : প্রশাসনকে তার আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করতে দিতে হবে। চেইন অব কমান্ড কার্যকর থাকতে হবে। অন্যায় প্রভাব থেকে প্রশাসনকে মুক্ত রাখতে হবে।

১১) মেডিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) : শক্তিশালী এমআইএস গড়ে তুলতে হবে এবং অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ থাকতে হবে যা গবেষণা ও নীতি নির্ধারণে ব্যবহার উপযোগী হয়।

১২) অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র : প্রতিটি হাসপাতালে অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র থাকতে হবে।

আজকে শহীদ ডা. মিলনের ৩০তম শাহাদত বার্ষিকীতে লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা এদেশের চিকিৎসক সমাজ ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ মেধা, শক্তি, সুযোগ ব্যয় করব- এটিই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়