রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিজভূমিতে প্রত্যাবাসন একমাত্র সমাধান

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের নিজভূমিতে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান। এ সংকট কেবল বাংলাদেশে নয়, এর বাইরেও অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল শুক্রবার বাকু কংগ্রেস সেন্টারে সমসাময়িক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত ও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিশ্চিতে ‘বান্দুং নীতিমালা’ সমুন্নত রাখার বিষয়ে এক সাধারণ আলোচনায় এ কথা বলেন।

আর্থ-সামাজিক সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকট—এই দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট এবং এর মূল গভীরভাবে মিয়ানমারে প্রোথিত। তাই এর সমাধানও মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই খুঁজতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশে নয়, এর বাইরেও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছি। এটির আমাদের দেশ এবং এর বাইরেও অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। আমরা এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করছি।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটির বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে ভারত আশ্রয় দেওয়ার কথা স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে হত্যার পর বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে ছয় বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দায় খুবই নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে।

হাসিনা-মাহাথির বৈঠক

উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে গড়ে ওঠা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার সকালে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর কংগ্রেস সেন্টারে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ। সম্মেলনের ফাঁকে বিকেলে শেখ হাসিনা ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তাঁরা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর বিষয়ে আলোচনা করেন।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের বিচার দাবি করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, এ সমস্যা সমাধানে যা প্রয়োজন মালয়েশিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য রাষ্ট্র তার সব কিছুই করবে।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং এর বিচার হতে হবে।’

১২০টি উন্নয়নশীল দেশের ফোরাম ন্যাম রাজনৈতিক সমন্বয় ও পরামর্শের জন্য জাতিসংঘের পর সবচেয়ে বড় ফোরাম হিসেবে পরিচিত। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা ৫৮ বছরের পুরনো এ জোটের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশাপাশি পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকা ১৭টি দেশ ও ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনস্থলে পৌঁছলে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট তাঁকে স্বাগত জানান। অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদেরও একইভাবে স্বাগত জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট। অতিথিদের নিয়ে ফটোসেশনের পর শুরু হয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন।

শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন ন্যামের বিদায়ী চেয়ারম্যান ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। এরপর বক্তব্য দেন নতুন চেয়ারম্যান আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ; তিনি আগামী তিন বছরের জন্য ন্যাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ, জিবুতির প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর, ঘানার প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডো, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শার্মা ওলী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভী, ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট এম ভেনকাইয়া নাইডু, তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট গুরবাংগুলি বেরদিমুহামেদো, বসনিয়া-হার্জেগোবিনার প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যান বাকীর ইজতেবেগোভিচ, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি এবং লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ মুস্তাফা আল-সারাজ।

ন্যামভুক্ত দেশগুলোতে বসবাস করে বিশ্বের ৫৫ শতাংশ মানুষ। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে এই জোট কাজ করেছিল তা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি এবারের সম্মেলনে আলোচনায় থাকছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানদের মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন শেখ হাসিনা। সন্ধ্যায় আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের দেওয়া নৈশভোজে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা।

ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার রাতে বাকুতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে তিনি থাকছেন হিলটন বাকু হোটেলে। আজ শনিবার সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন, প্রতিনিধিদলের প্রধানদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ এবং সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। সন্ধ্যায় আজারবাইজানে বাংলাদেশের দূত হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা। সফর শেষে আগামীকাল রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। সূত্র : বাসস।