রোজার সময় ইফতারে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনির মত মুখরোচক খাবারের রীতি এলো যেভাবে

88
Social Share

রমজান মাসে বাংলাদেশের ইফতারে পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, চপ, এবং মাংসের তৈরি কাবাবসহ নানা মুখরোচক খাবার অনেকটা যেন অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

সারা বছর এই ধরণের খাবার ততোটা গুরুত্ব না পেলেও, বাংলাদেশের সব বাড়িতেই ইফতারের প্রধান আকর্ষণ নানারকম ভাজা-পোড়া খাবার। শুধুমাত্র বাড়িতেই নয়, এই সময় খাবারের দোকানগুলোতেও এরকম মশলাদার ইফতারি বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়।

রমজানের পুরো মাসজুড়ে এই রকম মুখরোচক খাবার খাওয়া হলেও বছরের অন্য সময় এভাবে নিয়মিতভাবে খাওয়া হয় না।

ধর্মীয় বিধিবিধানেও ইফতারে এরকম মুখরোচক খাবারের রীতির উল্লেখ আছে বলে শোনা যায় না। তাহলে বাঙ্গালির ইফতারের প্লেটে এরকম মুখরোচক ভাজা-পোড়া খাবার জায়গা করে নিলো কীভাবে?

ইসলামের ইতিহাসবিদরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে আসা এবং শাসন করা নানা জাতি গোষ্ঠীর নানা ধরনের সংস্কৃতির মতো খাবারও এখন এই অঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকায় মিশে গেছে। সেভাবেই ইফতারের এই খাবারের তালিকায় ছাপ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশের খাবারের সংস্কৃতির।

ইফতারে নানা জাতিগোষ্ঠীর খাবার

ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নুসরাত ফাতেমা বিবিসি বাংলা বলছেন, ”আমাদের ইফতারে যেসব খাবার খাওয়া হয়, তার বড় অংশটি এসেছে পার্সিয়ান বা মুঘল খাবারের তালিকা থেকে। এক সময় মুঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করতো। তারা যখন ঢাকা শাসন করেছেন, তাদের সেই খাদ্য তালিকা তখনকার ঢাকার লোকজন গ্রহণ করেছে। এরপর আস্তে আস্তে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।”

”আপনি যখন এমনিতে খাবেন, তখন হয়তো ভাত, মাছ, মাংস ইত্যাদি খাচ্ছেন। কিন্তু যখন ইফতারির প্রসঙ্গে যাবেন, তখন দেখবেন, সেখানে নানা জাতিগোষ্ঠীর খাবার মিশে গেছে।” তিনি বলছেন।

তিনি কয়েকটি খাবারের উদাহরণ দিচ্ছেন:

খেজুর: ইসলামের নবী ইফতারের সময় খেজুর খেতেন। ফলে ইফতারের সময় খেজুর খাওয়াকে সুন্নত বলে মনে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের থেকে এই রীতিটি সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বেই ইফতারের সময় খেজুর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয়।

ইসলামিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম খাদেমুল হক বিবিসিকে বলেন, এটা তো রমজানের সাথে সম্পৃক্ত।

“হযরত মোহাম্মদ (সা.) রোজা খোলার সময় অর্থাৎ ইফতারে খেজুর খেতেন। সে কারণে মনে করা হয় এটা ভালো অনুষঙ্গ। সেজন্যই বাংলাদেশের মানুষ মনে করে ইফতারিতে সুন্নত হিসেবে খেজুর খাওয়া”।

মোঘলদের দেখে কাবাব, মাংসের খাবার ইফতারিতে যুক্ত হয়েছে
মোঘলদের দেখে কাবাব, মাংসের খাবার ইফতারিতে যুক্ত হয়েছে, বলছেন ইতিহাসবিদরা

ছোলা: এটা আফগানদের প্রিয় খাবার, তাদের কাছ থেকে ভারতবর্ষের, বাংলাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছে। তারা কাবুলি চানা বা কাবুলি ছোলা খেয়ে থাকে। সেখান থেকেই এটা খাওয়ার চল এসেছে। শবেবরাতের সময় যে বুটের হালুয়া তৈরি করা হয়, সেটার আসল নাম যেমন হাবশি হালুয়া, এটাও আফগানদের একটা খাবার।

তবে ভারত বা বাংলাদেশে এসে সেটা আরও মশলা, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে মুখরোচক করে রান্না করা হয়ে থাকে। সেটার সাথে মুড়ি খাওয়ার চলও এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন।

কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি: মুঘল খাবারের মধ্যে পারসিক খাবারের প্রভাবটা অনেক বেশি ছিল। তারাই ইফতারে বিরিয়ানি, কাবারের মতো খাবার খেতো। সেটা দেখে এই অঞ্চলের বনেদি মানুষজনও খেতে শুরু করে, বলছেন ড. নুসরাত ফাতেমা ।

এখনো ইরান, আরব আমিরাত, সৌদি আরব ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ইফতারির সময় কাবাব সহযোগে বিরিয়ানি বা পোলাও খাওয়ার চল রয়েছে।

পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ: এটা উত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এলাকার খাবারে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বলছেন ড. ফাতেমা।

”এই অঞ্চলে ইসলাম ছড়ানোর সময় অ্যারাবিক প্রভাব ছিল, পার্সিয়ান প্রভাব ছিল, পরবর্তীতে সেটা একপ্রকার ভারতীয়করণও হয়। ভারতে এসে, মূলত উত্তর ভারত থেকে ইফতারের সময় মুখরোচক খাবারের অংশ হিসাবে নানা রকমের ভাজাপোড়া খাওয়ার চল যোগ হয়েছে। তখন পেঁয়াজু, বেগুনি, নানা ধরনের চপ খাওয়ার চল যুক্ত হলো। সেটাই পরবর্তীতে আমরাও গ্রহণ করেছি,” তিনি বলছিলেন।

শরবত: ইফতারে শরবত খাওয়ার রীতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে রয়েছে। পানির পিপাসা থেকে স্বাদ, মিষ্টি ও সুগন্ধি শরবত খাওয়ার চল চালু হয়েছে বলে মনে করেন ইসলামী ইতিহাসবিদরা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ আর লকডাউনের কারণে এই বছর চকবাজারে ইফতারির বিশাল পসরা দেখা যায়নি
ছবির ক্যাপশান,করোনাভাইরাস সংক্রমণ আর লকডাউনের কারণে এই বছর চকবাজারে ইফতারির বিশাল পসরা দেখা যায়নি

বাংলাদেশে কি বরাবরই তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার দিয়ে ইফতারি করা হতো?

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এখন যেভাবে ইফতারে নানারকমের মুখরোচক খাবার, মাংস, জিলাপি বা ভাজাপোড়া খাওয়া হয়ে থাকে, সেটা মাত্র কয়েকশো বছরের পুরনো।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলছেন, বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামে ইফতারির সময় কয়েকশো বছর পূর্বের বর্ণনাতেও এরকম ভাজাপোড়া খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। সুতরাং বলা যায়, কয়েকশো বছর আগেও এগুলো ছিল না।

”কোন এক সময় মুঘলদের কাছ থেকে ঢাকার লোকজন এরকম বিরিয়ানি, কাবাব, ভাজাপোড়া খাওয়া গ্রহণ করে। তাদের কাছ থেকে সেটা আস্তে আস্তে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা যায়,” বলছিলেন মি. মামুন।

তিনি বলছেন, ”উনিশ শতকের দিক থেকে এরকম খাবার এই অঞ্চলের মানুষজন খেতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা যায়। কারণ এর আগে বইপত্রে এরকম রকমারি খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং সেই সময় মানুষ ইফতারে ভাত খেতে বলেই তথ্য পাওয়া যায়।”

অধ্যাপক ড. নুসরাত ফাতেমাও বলছেন, ভারতবর্ষে আরব, পার্সিয়ান, আফগান ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির শাসকদের কারণে তাদের খাবার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে খাবারের পার্থক্য ছিল। তবে পরবর্তীতে আস্তে আস্তে তাদের এসব খাবার এখানকার স্থানীয় মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে। এভাবেই স্থানীয় খাবারের সঙ্গে তাদের খাবারের রীতি মিশে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মোঃ ইউসুফ বলছেন, ”ছোলা, পেঁয়াজু, কাবাব ইত্যাদি কিন্তু আমরা সারা বছরই কম বেশি হালকা নাস্তা হিসাবে খাওয়া হয়। কিন্তু রমজানের সময় এটা মজাদার বা মুখরোচক খাবার হিসাবে যুক্ত হয়ে গেছে। সারাদিন অভুক্ত থেকে সন্ধ্যায় এরকম মজাদার খাবার খেতে ভালো লাগে।”’

এর সঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের কোন সম্পর্ক নেই বলে তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন বলছেন, যদিও বিশেষ কোন কারণ বা পুষ্টিমাণের ব্যাপার নেই। তবে এই অঞ্চলের মানুষ একটু মুখরোচক, তেলেভাজা খাবার খেতে পছন্দ করে। এই কারণে ইফতারির মধ্যেই সেটা যুক্ত হয়ে গেছে।

তবে বাংলাদেশে এখনো বিভিন্ন এলাকায় ইফতারির খাবারেও রকমফের রয়েছে। অনেক এলাকায় পেঁয়াজু বা বেগুনির বদলে সন্ধ্যায় খেজুর ও শরবত খেয়ে ইফতারি করার পরপরই ভাত বা খিচুড়ি খাওয়ারও চল রয়েছে।

ইফতারির সময় খেজুর খাওয়াকে সুন্নত বলে করেন ইসলামীবিদরা
ইফতারির সময় খেজুর খাওয়াকে সুন্নত বলে করেন ইসলামীবিদরা

ইসলামে ইফতারে খাবার সম্পর্কে কি বলা হয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মোঃ ইউসুফ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”ইফতারে ইসলামের নবী খেজুর খেতেন, মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতেন। বাকি যে খাবারগুলো আছে, সেগুলো বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী তারা যে সমস্ত খাবার পছন্দ করে, সেগুলো খেয়ে থাকে।”

”ইফতারে বাংলাদেশি বা পাকিস্তানের লোকজন বুট, মুড়ি, ছোলা-যেগুলো ভাজাপোড়া বলা যায়, সেগুলো খেয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মানুষজন কিন্তু এগুলো খায় না। তারা বিরিয়ানি, মুরগির রোস্ট বা ফ্রাই খায়, সাথে খেজুর খায়।”

”ইফতারে সুন্নত বলতে একটা মিষ্টি খাবার, খুরমা বা খেজুর বুঝি। বাকি খাবারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই। যার যার রুচি অনুযায়ী, সংস্কৃতি অনুযায়ী এই খাবার গ্রহণ করে থাকে,” তিনি বলছেন।

পুষ্টিবিদরা মনে করেন, ইফতারির খাদ্য তালিকায় এমন খাবার থাকা উচিত, যা সহজে শরীরে পুষ্টি, পানি ও শক্তির যোগান দেবে
পুষ্টিবিদরা মনে করেন, ইফতারির খাদ্য তালিকায় এমন খাবার থাকা উচিত, যা সহজে শরীরে পুষ্টি, পানি ও শক্তির যোগান দেবে

ইফতারে কি ধরণের খাবার খাওয়া ভালো?

ইফতারে মুখরোচক হলেও তেলে ভাজা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ততোটা ভালো নয় বলেই মনে করেন পুষ্টিবিদরা। পুষ্টিবিদরা মনে করেন, ইফতারির খাদ্য তালিকায় এমন খাবার থাকা উচিত, যা সহজে শরীরে পুষ্টি, পানি ও শক্তির যোগান দেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”তেলে ভাজা খাবার সবার শরীরের জন্য ঠিক নয়। যেগুলো ডিপ ফ্রাই হয়, অনেক বেশি ভাজাপোড়া, সেগুলো অনেকের জন্য অ্যাসিডিটি, পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে।”

অনেকদিন ধরেই পুষ্টিবিদরা এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে তিনি জানান।

”বিশেষ করে বাইরে থেকে যেসব খাবার কিনে এনে রমজানের সময় খাওয়া হয়, তার অনেক খাবার খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয়, তৈরির সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। ফলে এসব খাবার বরং শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।” তিনি বলছেন।

তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, ছোলাটা শরীরের জন্য খারাপ নয়। সেই সঙ্গে খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি থাকা ও মিষ্টি জাতীয় খাবার রাখা উচিৎ। তবে প্রতিদিন তেলে ভাজা খাবার না খেয়ে তার বদলে চিড়া, ফলমূল জাতীয় খাবার খাওয়া শরীরের জন্য ভালো হবে।