রিয়াজ ভাইয়ের শূন্যতা পূরণ হবে না

মনজুরুল আহসান বুলবুল

61
রিয়াজ
Social Share

একজন পরিপূর্ণ মানুষ রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের চলে যাওয়ায় সাংবাদিক সমাজে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কখনোই পূরণ হবে না। তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে প্রিয় রিয়াজ ভাই হতে পেরেছিলেন। অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ছিল তার। যে কোনো সংকটকালীন মুহূর্তে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার এ রকম গুণ হাতেগোনা খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছি। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির প্রশ্নে রিয়াজ ভাই ছিলেন আপসহীন। তিনি একটি দল সমর্থন করতেন। কিন্তু সহকর্মীদের স্বার্থে দলের আনুগত্যের কথা ভাবতেন না এই অসাধারণ সাংবাদিক নেতা।

বিএনপি সরকারের আমলে তখন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। একবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। প্রতিবাদে সাংবাদিকরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় একজন বিএনপিপন্থি সাংবাদিক আহত হন। তখন রিয়াজ ভাই সাংবাদিকদের পক্ষ নিতে গিয়ে সরকারের কারও কারও কাছে অপ্রিয় হয়েছিলেন। কিন্তু নীতির কাছে আপস করেননি। আসলে রিয়াজ ভাই পরে যে দলই করুন না কেন, তিনি সব সময় ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে গর্ববোধ করতেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এর মাধ্যমে হয়তো মানুষের অনেক কিছুর পরিবর্তন হবে।

দলটির সঙ্গে পরে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করে না রাখলেও কখনও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেননি। এ কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আদর্শ মানব।

আমরা যারা ইউনিয়ন করি বা জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতৃত্ব দিই, তারা নানা সময় নানা সংকট তৈরি করি। কর্মীদের এসব সংকটকালে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ছায়ার মতো পাশে থেকে সমাধান দিতেন। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি খুব সহজভাবে সমাধানের অসাধারণ গুণাবলি ছিল তার। যারা ইউনিয়ন বা প্রেস ক্লাবে নেতৃত্ব দেন, তাদের অনেকের লেখালেখির গুণ থাকে না। কিন্তু রিয়াজ ভাই সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখতেন। তার লেখার মুনশিয়ানা আমাদের মুগ্ধ করে। ইংরেজি দৈনিকে কাজ করেও বাংলায় এত চমৎকার লিখতেন, যা আমাদের অনেকের কাছে অনুকরণীয় হয়ে আছে। তার মৃত্যুতে ইংরেজি মাধ্যমের সাংবাদিকতা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কারণ, তার মতো মানুষ সাংবাদিকতায় আরও বহু বছর দরকার ছিল। তিনি একাধারে সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও নেতা। এতগুলো গুণে গুণান্বিত মানুষ সমাজে কম রয়েছেন। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুর পর আমরা রিয়াজ উদ্দিন আহমেদকে পেয়েছিলাম অভিভাবক হিসেবে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। এবার তিনি অসুস্থ থাকায় আমার ওপর পুরো দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি আমাকে যে কোনো সংকটকালে পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন। তার লেখা ‘সত্যের সন্ধানে’ বইটি পড়লে বোঝা যায়, কতটা পাণ্ডিত্য ছিল এ মানুষটির মধ্যে। কিন্তু বিন্দুমাত্র অহংকারবোধ একমুহূর্তের জন্যও তাকে গ্রাস করতে পারেনি। তিনি ছোট-বড় সবার সঙ্গে সমানতালে মিশেছেন। সম্পাদক পরিষদের সংকটে তাকেই সামনে আসতে হয়েছিল। তিনি তার মেধা ও মনন দিয়ে চেষ্টা করেছেন সংকট সমাধানে। প্রেস কাউন্সিলে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি কতটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তিনি। অনেকের বিরুদ্ধে দলবাজি করে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যায়। কিন্তু এ মানুষটিকে দেখেছি আমৃত্যু পেশা ও সহকর্মীদের পক্ষে অবস্থান নিতে। এর ফলে অনেক সময় তাকে তিনি যে দল সমর্থন করেন, সেই পন্থি সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়তে হতো। কিন্তু এসব তোয়াক্কা না করে তিনি সত্য ও সুন্দরের পক্ষই অবলম্বন করতেন।
তিক্ত কথা না বলেও যে প্রতিবাদ করা যায়, এটা আমরা রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের কাছে শিখেছি। তিনি কারও সঙ্গে একমত হতে না পারলে ভিন্নমত পোষণ করতেন বা তার মতামত জানাতেন। কিন্তু কখনও খারাপ শব্দ ব্যবহার বা উত্তেজিত হয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমার চোখে পড়েনি। আসলে তিনি মানুষকে হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসতে জানতেন। যার ফলে কেউ সংকটে পড়লে তার সঙ্গে কথা বলে সাহস পেতেন। কারণ, মানুষকে বিপদে ফেলার কথা কখনও তিনি চিন্তা করতেন না। ব্যক্তিগত জীবনে সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার চলছিল। কখনও অনৈতিক সুবিধা নিতে হবে- এটা কল্পনাও করতে পারতেন না রিয়াজ ভাই। আর এ কারণেই দুরন্ত সাহস নিয়ে চলতেন। সত্য বললে কেউ তাকে বঞ্চিত করবে- এসব চিন্তা করে কথা বলতেন না। তার লেখনী পড়লেই বোঝা যায়, কতটা স্বাধীনচেতা ও বিচক্ষণ গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। এমন গুণাবলি দেখেছি সারওয়ার ভাই (গোলাম সারওয়ার), সামাদ ভাইয়ের (আতাউস সামাদ) মধ্যে। একে একে এসব বটবৃক্ষ চলে যাচ্ছেন পরপারে। আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে যাচ্ছি। এ শূন্যতা সাংবাদিক সমাজকে আরও বহু বছর বয়ে বেড়াতে হবে।

৭৬ বছর বয়সে চলে যাওয়া আমাদের প্রিয় রিয়াজ ভাই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৩ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি। তার মৃত্যুতে আমাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক সাংবাদিককে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখেছি। এ ভালোবাসা যুগ যুগ ধরে অর্জন করেছেন তিনি। পেশাগত জীবনে সফল মানুষ রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ নিজেকে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তার মৃত্যু অনেকের কাছে গুরু হারানোর বেদনার শামিল। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ডেইলি স্টারের উপসম্পাদক, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক, ডেইলি টেলিগ্রাফের সম্পাদক এবং নিউজ টুডের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ফিন্যান্সিয়াল হেরাল্ড পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন।

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদীর মনোহরদীর নারান্দী গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৬৭ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও ১৯৭২ সালে এলএলবি পাস করেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার আগে কিছুদিন তিনি ঢাকার হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ ও টাঙ্গাইলে কাপাসিয়া কলেজে অধ্যাপনাও করেন।
১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যকরী সদস্য হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত হন রিয়াজ উদ্দিন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন তিনি। একাত্তরের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সময় রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ পাকিস্তান অবজারভারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ অবজারভারে যোগ দেন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে প্রধান প্রতিবেদক, বিশেষ প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাংবাদিকদের ফেডারেশন সমন্বয়ে গঠিত দক্ষিণ এশিয়া সাংবাদিক সমন্বয় পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (সাফমা) সভাপতি ছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন। এরপর ২০০২ থেকে আবার দুই দফা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার এ চলে যাওয়া সত্যিই আমাদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। তার মতো মানুষ আবার কবে জন্মাবে, সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে যুগের পর যুগ। পরাপারে ভালো থাকুন প্রিয় রিয়াজ ভাই। গভীর শ্রদ্ধা জানাই রিয়াজ উদ্দিন আহমেদকে।

মনজুরুল আহসান বুলবুল: সিনিয়র সাংবাদিক