রাষ্ট্র আর সন্ত্রাস সেদিন এক হয়ে যায়

Social Share

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ক্ষমতাসীনদের উন্মাদনায় রাষ্ট্র সেদিন আত্মঘাতী ভূমিকায় নামে। এমন উদাহরণ বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। দিনে-দুপুরে রাষ্ট্রের পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সমন্বিত তত্ত্বাবধানে ধর্মান্ধ জঙ্গি সংগঠনের দ্বারা রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ বিরোধী দলকে গ্রেনেড মেরে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়। বিশ্বের মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখতে পায় সন্ত্রাস, রাষ্ট্র আর সরকার সেদিন এক হয়ে যায়। ভাবাও যায় না! পঁচাত্তরের পর তারা দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু কথায় আছে, রাখে আল্লাহ মারে কে। সৃষ্টিকর্তা দেশপ্রেমিকদের ভালোবাসেন। একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের জীবন বলিদান যাতে ব্যর্থ হয়ে না যায় তার জন্যই হয়তো সেদিন দৈবশক্তি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে রক্ষা করে। শেখ হাসিনাই ছিলেন তাদের মূল লক্ষ্য। আদালতেই প্রমাণিত হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে যে কারণে এবং যারা হত্যা করে তাদেরই নতুন প্রতিভূরা একই লক্ষ্যে ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চায়। এটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার, বাংলাদেশকে হত্যা করার জন্যই তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে।

শুধু নামে নয়, একটা রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় বহন করে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ ও দর্শনের মধ্য দিয়ে, যা সুনির্দিষ্টভাবে সন্নিবেশিত থাকে সংবিধানে। বাহাত্তরের সংবিধান বঙ্গবন্ধু সেভাবেই তৈরি করেন। রাষ্ট্রের সব আইন, নীতিমালা ও কর্মকাণ্ডের মূল উৎস হয় সংবিধানের মৌলিক আদর্শ। দেশের অনাগত প্রজন্মের মানসকাঠামো সেভাবে তৈরি হতে থাকে। রাষ্ট্রের সামগ্রিক মানসকাঠামো কি উদার গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও নৈতিকতাপূর্ণ হবে, নাকি ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদ ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হবে, সেটি রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ ও তার থেকে উৎসারিত নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। আজকে রাষ্ট্রের যত দৈন্য দেখি তার মূল কারণ এই মানসকাঠামোগত সমস্যা। পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রোথিত দূষণভরা মানসকাঠামো থেকে আমরা বের হতে পারছি না। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে সন্নিবেশিত করলেন, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং এখানে ধর্মের নামে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। এটাই বাংলাদেশের প্রধান রক্ষাকবচ, মূল পরিচয় এবং উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক মানসকাঠামো তৈরির মৌলিক উৎস। এটা না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না। সে জন্যই এই মৌলিক আদর্শকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাহাত্তরের সংবিধানে বঙ্গবন্ধু অনুচ্ছেদ ১২ ও ৩৮ বিশেষভাবে সংযোজন করেন। কিন্তু পঁচাত্তরের পরপর ক্ষমতায় আসা প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশ দ্বারা উপরোক্ত সব কিছু বাতিল করে দেন। জনগণের মতামত ও নির্বাচিত সংসদের জন্য অপেক্ষা না করে সামরিক আদেশ দ্বারা রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ কেন এবং কোন অধিকারবলে বাতিল করলেন, তার ব্যাখ্যা জিয়াউর রহমান অথবা পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতারা কখনো দেননি। সব রাষ্ট্রীয় কর্মের একটা প্রক্রিয়া আছে, তার কিছুই তিনি অনুসরণ করলেন না। উপরোক্ত কর্মকাণ্ড দ্বারা পাকিস্তানের এজেন্ডাই বাস্তবায়িত হলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে গেল। সুতরাং পঁচাত্তর আর ২০০৪ একই সূত্রে গাঁথা। তারা একই উদ্দেশ্যে দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, আওয়ামী লীগের হাল ধরা এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়ে যায়, শেখ হাসিনা বেঁচে থাকলে পঁচাত্তরে যে উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয় তার সব কিছুই ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সবাইকেই চরমভাবে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এটাও বুঝতে পারে, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার ব্যতিরেকে হয়তো শেখ হাসিনাকে তারা হত্যা করতে পারবে না। সুতরাং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশ গুলি চালায়। তাতে প্রায় দুই ডজন নেতাকর্মী নিহত হন। শোনা যায়, তখন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার হুকুমে পুলিশ গুলি চালায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে যখন বোমা হামলা ঘটে, তখন পুলিশের আইজি ছিলেন শহীদুল হক এবং ডিএমপি কমিশনার ছিলেন আশরাফুল হুদা। এঁরা তিনজনসহ আরো কয়েকজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে একাত্তরে পাকিস্তানের সঙ্গী হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে যুক্ত থাকায় বঙ্গবন্ধু বাধ্যতামূলক অবসর দেন। এঁদের সবাইকে জিয়াউর রহমান পুলিশ বাহিনীর উচ্চ পদে পুনর্নিয়োগ দেন। একটু ফিরে দেখি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে কী ঘটে। সেদিন বিকেলে অনেক পূর্বঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ করে। একটি খোলা ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। সর্বশেষ বক্তা হিসেবে শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই মুহুর্মুহু গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে।

ঘটনার বর্ণনা সবাই এখন জানেন। তাই সেদিকে না গিয়ে বরং এটা যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছিল তার কয়েকটি নিদর্শন তুলে ধরি। এক. এটা ছিল পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ। ঘোষিত ছিল, শেখ হাসিনাই প্রধান অতিথি। তাই এর নিরাপত্তার দায়িত্ব সার্বিকভাবে পুলিশ এবং তারপর ডিএমপি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার ওপর বর্তায়। তার পরও গ্রেনেড নিক্ষেপকারী সন্ত্রাসীরা পুলিশের কয়েক স্তরের কর্ডন ভেদ করে মঞ্চের ৩০-৪০ গজের মধ্যে অবস্থান নেয়। কী অভাবিত ও নজিরবিহীন ঘটনা! উল্লেখ্য, একজন দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকও একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ৩৫-৪০ গজের বেশি দূরত্বে ফেলতে পারে না। চারপাশের সব ছাদের ওপরও পুলিশ মোতায়েন ছিল। দুই. উপস্থিত পুলিশ সন্ত্রাসীদের ধরার চেষ্টা না করে সমবেত জনতার ওপর টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং তার ধোঁয়ার আড়ালে সব সন্ত্রাসী নিরাপদে ফিরে যায়। তিন. কয়েকটি গ্রেনেড অবিস্ফোরিত ছিল। তার গায়ে লেখা ছিল পিওএফ, অর্থাৎ এটা পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে তৈরি। গ্রেনেডের মডেল ও প্রকার ছিল আর্জেস-৮৪। বিশ্বের কোথাও সেনাবাহিনী ছাড়া অন্য কোনো ফোর্স এটা ব্যবহার করে না। তার মানে দাঁড়ায়, সেনাবাহিনীর কাছ থেকে হস্তান্তরিত হয়ে এগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে আসে। চার. মিডিয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড আসে এবং তার মাধ্যম ছিলেন মাওলানা তাজউদ্দিন, যিনি বিএনপির প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর আপন ভাই। দুজনই আদালতে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। পাঁচ. লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য পাকিস্তানি নাগরিক মাজেদ ভাট আক্রমণে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকায় ধৃত হয়ে বাংলাদেশের জেলে আছে। তাঁরও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। ছয়. তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই অবিস্ফোরিত গ্রেনেডসহ অপরাধের সব আলামত পুলিশ নষ্ট করে ফেলে, যা একেবারে নজিরবিহীন ঘটনা। সাত. গ্রেনেড আক্রমণ পরিচালনাকারী হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ মিথ্যা জজ মিয়া নাটক সাজায়। দিনমজুর জজ মিয়াকে বানায় গ্রেনেড নিক্ষেপকারী, যার সব বর্ণনা ও বৃত্তান্ত এখন ইউটিউবেও পাওয়া যায়, টেলিভিশনের ক্যামেরায়ও ধরা আছে। আট. ঘটনার অনেক আগে সংগত কারণেই সন্ত্রাসীরা দেশের ভেতরে যেকোনো স্থানে এই গ্রেনেড নিক্ষেপের অনুশীলন করে। এত বড় কর্মকাণ্ডের কোনো কিছুই কোনো গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারল না, এটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য। নয়. ঘটনার আগে প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে হাওয়া ভবনে মিটিং হওয়ার খবর পত্রিকায় এসেছে এবং রায়ের সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণেও তা আছে। দশ. ঘটনার পর বিএনপির মতোই ঢাকাস্থ পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত বলেন, আওয়ামী লীগ নিজেরাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। এগারো. ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক আলাদাভাবে নিজস্ব পন্থায় তদন্ত করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিষেধ করেন। প্রায় ১৪ বছর পর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করেন। তাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।  রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা বিধানকারী সংস্থা পুলিশ, এনএসআই এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ অনেকেই উল্লিখিত শাস্তির মধ্যে আছেন। তাহলে সন্ত্রাসী আর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়?

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক