রান্না করা খাবারও যাতে পাঠানো যায় সেজন্য ডাকবিভাগকে যা করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

47
Social Share

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাক অধিদপ্তরকে অনলাইন ব্যবসায় সর্বাধিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু অনলাইন ক্রয়-বিক্রয় জনপ্রিয়তা লাভ করছে। কাজেই, ডাকঘর পিছিয়ে থাকলে চলবে না। ডাক বিভাগকে এ ব্যাপারে আরো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে, এটাও হবে ডাকবিভাগের জন্য একটি বড় ব্যবসার ক্ষেত্র।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর আগারগাঁওস্থ শেরে বাংলা নগরে আধুনিক স্থাপত্য নকশায় ১৫০ ফুট উঁচু গাড়ি পার্কিং-এর সুবিধা সংবলিত ১৪তলা বিশিষ্ট লেটার বক্সের আকৃতিতে নির্মিত ডাক বিভাগের নতুন সদর দপ্তর ‘ডাকভবন’এর উদ্বোধনকালে প্রদান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
তিনি আজ সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি এই ভবনের উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমারা ডাক বিভাগের পরিবহন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করতে ১১৮টি ডাক গাড়ি সংযোজন করেছি। এ সকল গাড়িচালনার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীকে গাড়িচালক হিসেবে নিয়োজিত করেছি।
তিনি বলেন, ‘ডাক বাছাই ত্বরান্বিতকরণ ও পচনশীল দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য চিলিং চেম্বারের সুবিধা সংবলিত ওয়্যারহাউস যুক্ত ১৪টি অত্যাধুনিক মেইল প্রসেসিং ও লজিস্টিক সার্ভিস সেন্টার নির্মাণের কাজ সমাপ্তির পথে।
তিনি বলেন, প্রথমে আমরা বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে এগুলো করছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য থাকবে এবং আমি এটা ডাক বিভাগকে বলবো একদম উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ ডাকঘর যেখানে থাকবে সেখানেই এই ব্যবস্থাটা নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই করোনাভাইরাসের কারণে এখন বেশিরভাই অনলাইন সেবা চলছে, অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় চলছে। পচনশীল জিনিষ অর্থাৎ খাদ্য দ্রব্য থেকে শুরু করে ফলমূল তরিতরকারি এগুলো যেন ডাকের মাধ্যমে পাঠানো যায়।
তিনি উদাহারণ দেন- কেউ নিজে রান্না করে আরেক জেলায় আত্মীয়ের কাছে খাবার পাঠাবেন, সেটাও যেন পাঠাতে পারেন। সেই জন্যই এই চিলিং সিষ্টেমটা বা কুলিং সিস্টেমটা খুব দরকার। অর্থাৎ সেই ধরনের ফ্রিজিং টেম্পারেচার করে দেওয়া যাতে জিনিসটা নষ্ট হবে না এবং সঠিক ব্যক্তির কাছে গিয়ে পৌঁছাবে। তার ব্যবস্থাটা ডাক বিভাগকে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এরকম সেন্টার থাকবে যেখান থেকে পোর্টেবল বক্সে করে এসব ডেলিভারি হবে সেভাবেই ডাকের সেবাটাকে একেবারে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে এবং সে ব্যবস্থাটাও আপনাদের এখন নিতে হবে।
‘৩৮টি মডেল ডাকঘর নির্মাণের কাজ সরকার হাতে নিয়েছে,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি চাইবেন সারা বাংলাদেশে এটা করে দিতে। যাতে ঘরে বসেও অনেকে টাকা-পয়সা উপার্জন করতে পারবেন। এতে মানুষের যেমন কর্মসংস্থান হবে তেমনি মানুষ সেবাটাও পাবে।
তাঁর সরকার ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের রূপরেখার আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ডাকপরিষেবা বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
ভবনটি নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৯১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ভবনটিতে সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, আধুনিক পোস্টাল মিউজিয়াম, সুপরিসর অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া, ডে-কেয়ার সেন্টার, মেডিকেল সুবিধা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও সার্বক্ষণিক ওয়াইফাইসহ অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিগত সুবিধা রয়েছে।

এ উপলক্ষে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ স্মারক ডাকটিকেট অবমুক্ত করেন । অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আফজাল হোসেন বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস পিএমও থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াসহ গণভবন এবং পিএমও’র উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পোস্ট ই-সেন্টার প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ৮,৫০০টি ডাকঘরকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যেই ডিজিটাল ডাকঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সামাজিক উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মহিলা ও পুরুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই ডাকঘর থেকে বিভিন্ন বয়সী প্রশিক্ষণার্থী কম্পিউটারের উপর মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন এবং গ্রামীণ জনগণ আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, যেমন: ইন্টারনেট ব্রাউজিং, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ভর্তি ফরম অনলাইনে পূরণ, ফলাফল ডাউনলোড, দেশে-বিদেশে ভিডিও কনফারেন্সিং, ছবি তোলা, ডকুমেন্ট প্রিন্ট আউট প্রভৃতি সেবা লাভ করছে।
তিনি বলেন, সরকার ১৮৯৮ সালের ডাকঘর আইনকে হালনাগাদ ও সংশোধন করে ডাকঘর (সংশোধন) আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছে। এই আইনের ৪(ক) অনুচ্ছেদটিতে-‘জনগণকে সেবা প্রদানের কথা বিবেচনা করে রূপান্তর, বিন্যাস বা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়াও অর্থ প্রেরণ সুবিধা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং নিজে বা অন্য কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে জীবন বিমা সেবা প্রদান করতে পারবে।’- যার সুফল আজ মানুষ পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ডাক বিভাগের কার্যপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণ, পোস্টাল একাডেমি এবং ৪টি পোস্টার ট্রেনিং সেন্টার শক্তিশালীকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ডাকবিভাগের উন্নয়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুহিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় ভুমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, জাতির পিতা মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্তরের ডাকঘরগুলো দ্রুত পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন, দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে গাড়ী এবং কাউন্টার সেবা প্রদানের যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছিলেন। তিনি সাব-পোস্টমাস্টারদের জন্য আবাসিক ভবনও নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর অনবদ্য উদ্যোগের ফলে ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) এর সদস্যপদ লাভ করে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের প্রচেষ্টায় ডাক বিভাগের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রসংগেও আলোকপাত করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার ডাকবিভাগের কর্মচারিদের আবাসন সমস্যা নিরসনে মতিঝলে ৮টি ২০তলা ভবনে মোট ৬০৮টি ফ্লাট নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে এবং ফ্লাটগুলো সাইজেও বড় করেছে।
তিনি বলেন, সাড়ে ৪শ’ স্কয়ার ফিট থেকে এগুলো সাড়ে ৬শ’ স্কয়ার ফিট করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ, আধুনিক লিফট, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, স্যুয়ারেজ-ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, খেলার মাঠ, পুকুর, কমিউনিটি সেন্টার ইত্যাদির সংস্থান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ডাকঘরে কর্মরত ডাক কর্মীদের সম্মানী ভাতা ও তার সরকার বৃদ্ধি করেছে। ২০১৩ সালে এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল সাব পোস্টমাস্টার, এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল এজেন্ট, এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল ডেলিভারি এজেন্ট ও এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল মেইল ক্যারিয়ারদের নির্ধারিত মাসিক ভাতা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ১ হাজার ২৬০ টাকা, ১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১ হাজার ১৮০ টাকা যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে ২০১৮ সালে মাসিক ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছি যথাক্রমে ৫ হাজার ৮৪১ টাকা, ৪ হাজার ৪৬০ টাকা, ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং ৪ হাজার ১৭৭ টাকা।
তাঁর সরকার ধাপে ধাপে এই বেতন বৃদ্ধি করলেও আগে আরো অনেক কম ছিল। তথাপি এই টাকাও বর্তমান বাজারে যথেষ্ট নয় স্বীকার করে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এজন্য ডাক বিভাগও ব্যবস্থা নিতে পারে তাদের লভ্যাংশ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের একটি অংশ ভাতার জন্য বরাদ্দ করলে ভাল হয়। তবে, সরকারের পক্ষ থেকেও যেটুকু করার তা করা হবে এবং করা হচ্ছে, পর্যায়ক্রমিক ভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।’
নবনির্মিত আধুনিক ভবনে যাতে গ্রাহক সেবা বৃদ্ধি পায় এবং আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশনও যাতে হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী আশাপ্রকাশ করেন, এই অত্যাধুনিক কার্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কাজকর্মে আরো গতিশীলতা আনবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেটারবক্স অনেকে ভুলে গেছে। সবাই এসএমএস ও মেইল দেয়। কিন্তু দৃষ্টিনন্দন এই লেটারবক্স সদৃশ ভবন দেখলে চিঠি পাঠানোর কথা মনে পড়বে। ভবনে চিঠিপত্র ঝুলছে, চিঠি যাচ্ছে আসছে, এমন কিছু চিত্র যোগ করারও পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।