রাজনীতির ‘গণমুখী’ পরম্পরা ও একজন সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টা

115
Social Share

প্রজন্মের ইতিহাস বিমুখতার কারণে ন্যায়-অন্যায় যাই হোক, চারপাশে কেবলই সমকালীনতার জয়জয়কার। দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বোধহয় এই বাস্তবতাটি একরকম ধ্রুবসত্যই হয়ে উঠেছে। আশির দশকে মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরের পূর্ব পর্যন্তও সংসদীয় আসনের বিস্তৃতি ছিল বিরাট এলাকা নিয়ে। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপে ভোটের রাজনীতির সমীকরণ বদলের সঙ্গে পুরনো সংসদীয় আসন ভেঙে একাধিক আসন সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগও বেড়েছে বহুসংখ্যায়। কিন্তু রাজনীতিকদের কর্তব্য পালনের প্রবণতা কিংবা ‘জননেতাদের’ জনসেবা খুব একটা বেড়েছে বলে আমরা দেখছি না। সংবাদপত্রে প্রায়শই আমরা দেখব, জনপ্রতিনিধি, বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের প্রতি তাদের ভোটারদের ক্ষোভ ‘ভোটে জেতার পর আর দেখা মিলে না এমপিদের’ ইত্যাদি। জনগণের এই অভিযোগ অমূলক নয়, অনেকক্ষেত্রে বহুলাংশেই সত্য। দেশের অনেক জনপদেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এলাকাবিমুখ। স্থানীয় সমস্যা-সংকট তাদের স্পর্শ করে সামান্যই। এমনকি রাজধানীতে গিয়ে জনগণের অর্থে নির্মিত ও পরিচালিত ভবনে তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েও অনেক প্রান্তিক মানুষ বাধা পান বা দেখা না পেয়ে মনোকষ্ট নিয়ে ফিরে আসেন।

কিন্তু গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় শাসন কাঠামোতে একজন সংসদ সদস্যের কর্তব্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত। বলতে গেলে একটি সংসদীয় আসনের সামগ্রিক সংকট-সম্ভাবনা এবং উন্নয়ন-অগ্রগতি ও প্রগতি দেখভালের নৈতিক দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের ওপরই বর্তায়। যদিও সমকালীন বাস্তবতা এর এতোটাই উল্টো যে জনগণ এখন সেই অধিকারের কথা ভুলতেই বসেছে। জনশক্তি রপ্তানিতে প্রতারণায় দেশের একজন সংসদ সদস্য যখন কুয়েতের আদালতে দণ্ডিত হয়ে পদ হারান কিংবা সম্প্রতি তিনজন সংসদ সদস্যকে অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে আদালত কর্তৃক দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়; তখন স্খলনটা কোন স্তরে পৌঁছেছে তা সহজেই অনুমেয়।

কিন্তু আমরা অনেক আশাবাদী হওয়ার মতো খবরও পাই, যা আমাদের গ্লানি ঘুচিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সাহস যোগায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একজন সংসদ সদস্যের নানা গণমুখী প্রয়াস আমাদের আশাবাদী করেছে। এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের গণমুখী রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল যে অতীত, তিনি সেই পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বলছিলাম রাজধানীর অদূরে গাজীপুরের শ্রীপুরের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন সবুজের কথা।

তারুণ্যের শক্তি নিয়ে দুই দশক আগে রাজনীতির মাঠে পা দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের এই নেতাকে নিয়ে এমন আশাবাদের পেছনে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে। ইকবাল হোসেন সবুজের রাজনৈতিক কর্মপ্রয়াসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক মনে হয় নিবিড় জনসংযোগ। প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে এই সংযোগই এক সময় কর্মী থেকে নেতায় রূপান্তর ঘটাতো রাজনীতিকদের। সমকালীন বৈপরিত্যে সবুজরাই সেই পরম্পরাকে এগিয়ে নেন।

আমরা দেখেছি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন সবুজ ‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচি নিয়ে জনগণের দুয়ারে হাজির হয়েছিলেন। যেখানে প্রান্তিক মানুষেরা তাদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরার সুযোগ পান। এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই সংসদ সদস্য একে একে পুরো নির্বাচনী এলাকার মানুষের জনজীবনের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। দেশের প্রতিটি জনপদেই উন্নয়ন বাস্তবায়ন করে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু একজন চৌকষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি গণমানুষের আকাঙ্খার নিরিখে একটি বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার তৈরি করে তা প্রশাসনের সঙ্গে সুসমন্বয় করে জনকল্যাণকে নিশ্চিত করতে পারেন। ইকবাল হোসেন সবুজ এই কাজটি সার্থকভাবেই করতে পেরেছেন।

শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নে নগরহাওলা ও ধনুয়া নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। মহাসড়কের কোল ঘেঁষে শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই গ্রাম দুটিতে অন্তত এক দশক আগে থেকেই কিছু সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠছিল। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের বিরূপ প্রভাবে সৃষ্ট তরল শিল্পবর্জ্যের ভয়াবহ দূষণ ও নির্গমণপথ ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতা অধিবাসীদের জনজীবনকে ক্রমেই অতীষ্ট করে ফেলছিল। সম্প্রতি আমরা সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন সবুজকে জলাবদ্ধ সেই জনপদে যেতে দেখেছি। পত্রিকার খবরে জেনেছি, সংসদ সদস্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনের স্থায়ী উপায় খুঁজতে এবং তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা এটা জানি যে, মানুষের উদগ্র লোভ ও দায়িত্বহীনতায় যেভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ইকবাল হোসেন সবুজের এই পদক্ষেপ হয়তো এখনি সব সমস্যার সমাধান নিয়ে আসবে না; কিন্তু ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে এবং জনসচেতনতা ব্যাপকভাবে তৈরি করা গেলে সচেতন জনগোষ্ঠী পরিবেশবিনাশী এ অপচেষ্টা একদিন নিশ্চয়ই রুঁখে দিতে পারবে।

ক’মাস আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে আমরা জেনেছি, গাজীপুরের হোতাপাড়ায় একটি শিল্পকারখানায় মজুরির দাবিতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আরেক মানবিক দৃষ্টান্ত গড়েছেন ইকবাল হোসেন সবুজ। খবরে প্রকাশ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে তবেই তিনি ওই কারখানা চত্বর ত্যাগ করেন। যদ্দূর জেনেছি, ওই কারখানার শ্রমিকরা এখানকার ভোটার নন, তদুপরি একজন জনপ্রতিনিধি তাদের সহমর্মি হয়ে এগিয়ে গেছেন!

রাজনীতিবিদদের কর্তব্যবোধ তো এমনি হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্বৃত্তায়িত সমাজে, স্খলিত মূল্যবোধের ঘুণে ধরা সমাজে এই ‘কর্তব্যবোধ’ অনেক আগেই নির্বাসনে গেছে। সেখানে আমরা সত্যিকারের রাজনীতির পরম্পরাকে বহন করার দৃষ্টান্ত দেখলে বিস্মিত হই বৈকি!  সেইসঙ্গে আমরা আশাবাদী হই এইভেবে যে, গণমুখী রাজনীতির পুনঃপ্রত্যাবর্তন নিশ্চয়ই আমাদের সমাজে ঘটবে। ইকবাল হোসেন সবুজরা সেই আলোকবর্তিকা বয়ে নিয়ে যাক।

লেখকসাংবাদিক  গবেষক