রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের জয়

Social Share

 

ভিনিউজ-

ভোটের লড়াইয়ে ঢাকার নিয়ন্ত্রণ থাকল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরই। নৌকা আর ধানের শীষের ভোটযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন নৌকা প্রতীকের দুই প্রার্থী। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে ঢাকা উত্তরে মো. আতিকুল ইসলাম এবং দক্ষিণে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জয়লাভ করেছেন। এই বিজয়কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নের পক্ষে রায় বলে জানিয়েছেন জয়ী দুই প্রার্থী।

এর আগে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্দলীয় ভোটে উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক ও দক্ষিণ সিটিতে সাঈদ খোকন জয়লাভ করেছিলেন। ঢাকাকে ভেঙে দুইটি সিটি করপোরেশন করার পর এবার দলীয় প্রতীক নিয়ে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখল আওয়ামী লীগ। যদিও ভোটের ফলাফল বর্জন করে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি হরতাল আহ্বান করেছে।

স্বল্প সময়ের মধ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ফলাফল ঘোষণা করার কথা থাকলেও দুই সিটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদের বেসরকারি ফলাফল প্রকাশ করা হলেও উত্তরের ফল প্রকাশে বিলম্ব হয়।

গতকাল শনিবার রাত পৌনে ২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ২০৫টির ফলাফলে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী মো. আতিকুল ইসলাম পেয়েছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোনীত তাবিথ আউয়াল পেয়েছেন ২ লাখ ৪২ হাজার ৮৪১ ভোট। আতিকের সঙ্গে তাবিথের ভোটের ব্যবধান প্রায় ২ লাখের মতো। রিটার্নিং অফিসার আবুল কাশেমের গভীর রাত পর্যন্ত ফলাফল ঘোষণা না এলেও প্রাপ্ত ফলে আতিকের জয় নিশ্চিত। এই সিটির বাকি মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা) ২৬ হাজার ২৫৮ ভোট, পিডিপির শাহীন খান (বাঘ) ১ হাজার ৯১৯ ভোট, এনপিপির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান (আম) ৩ হাজার ৫২৯ ভোট এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আহম্মেদ সাজ্জাদুল হক (কাস্তে) ১৩ হাজার ৮১৭ ভোট পেয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ ভোটের মধ্যে বৈধ ভোট পড়েছে ৭ লাখ ১১ হাজার ৪৮৮টি। ভোট বাতিল হয়েছে ১ হাজার ৫৬২টি। এই সিটিতে ভোট পড়েছে ২৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। ১ হাজার ১৫০টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস পেয়েছেন ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ইশরাক হোসেন পেয়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট। তাপস তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩ ভোট বেশি পেয়েছেন। এই সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য রাজনৈতিক দলে প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবদুর রহমান (হাতপাখা) ২৬ হাজার ৫২৫ ভোট, গণফ্রন্টের আবদুস সামাদ সুজন (মাছ) ১২ হাজার ৬৮৭ ভোট, জাপার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন (লাঙ্গল) ৫ হাজার ৫৯৩ ভোট, এনপিপি-ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (আম) বাহরানে সুলতান বাহরান ৩ হাজার ১৫৫ ভোট এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আক্তারুজ্জামান ওরফে আয়াতউল্লাহ (ডাব) পেয়েছেন ২ হাজার ৪২১ ভোট।

শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। তবে ইভিএমে ভোট হওয়ার কারণে ভোটারের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক অনেক কম। বিভিন্ন স্থানে ভোটারের ফিঙ্গার ম্যাচিং না হওয়ার অভিযোগ আসে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন মনে করছে, দুই সিটিতে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়তে পারে। ২০১৫ সালে ব্যালটে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ভোটেও ভোটারদের উপস্থিতি ইভিএমের চেয়ে বেশি ছিল। ব্যালটে অনুষ্ঠিত ঐ নির্বাচনে উত্তরে ভোট পড়েছিল ৩৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, দক্ষিণে ৪৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উত্তরের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।

দুই সিটিতে মেয়র পদে ১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চার প্রার্থীর মধ্যেই মেয়র পদের লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল। নির্বাচনে উত্তর সিটিতে ছয় জন এবং দক্ষিণ সিটিতে সাত জন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গত ১০ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে দুটি প্রধান দলের প্রার্থীরা ছুটেছিলেন ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে। উত্তর সিটির ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, সংরক্ষিত ১৮টি নারী কাউন্সিলর, দক্ষিণ সিটিতে ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ২৫টি নারী কাউন্সিলর পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ভোটের আগে দক্ষিণ সিটির চার জন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। শিল্পকলা একাডেমী থেকে ঢাকা দক্ষিণের এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তর সিটির ফলাফল ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা।

ভোট নিয়ে শঙ্কা বা উত্কণ্ঠা থাকলেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। ইভিএমে ভোটাররা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন বলে জানান তিনি। যদিও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আবার বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘ইভিএম ব্যবহার করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে সবচেয়ে বড়ো অর্জন হচ্ছে, এতে কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েনি। রাতে ব্যালট পেপারে বাক্স ভর্তি এবং কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার অপবাদ থেকে আমরা মুক্ত। নির্বাচনে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৫ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে। তাতে কি ফলাফলে কিছু আসে যায়?’ তবে ইভিএমে ঢাকার ভোটে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে হতাশ নির্বাচন কমিশন। যদিও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটারের কম উপস্থিতির জন্য কমিশনই দায়ী।

সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়। তবু দুই সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা, এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ৪৫টি ঘটনার তথ্য পেয়েছে নির্বাচন কমিশনের মনিটরিং সেল। ঐ সব ঘটনার তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া হলে তারা তাত্ক্ষণিকভাবে সমাধান করেছেন। এবারই প্রথম বড়ো কোনো নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করা হয়নি। এই সিটি নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন ৯টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ৭৪ জন প্রতিনিধি। এছাড়া সহস্রাধিক দেশীয় পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন।

দুই সিটিতে ভোটার ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৮ লাখ ৪৩ হাজার ৮ এবং নারী ভোটার ২৬ লাখ ২০ হাজার ৪৫৯ জন। উত্তর সিটিতে ভোটার রয়েছেন ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ এবং নারী ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন। অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোটার ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ এবং নারী ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন।

গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছিল কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। প্রথমে ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে চরম সমালোচনার মুখে পড়ে কমিশন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সরস্বতী পূজার কারণে পরে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।