রক্তের বন্ধনে আবেগের আত্মিক সম্পর্ক

47
Social Share

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে আগামীকাল ঢাকায় আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর সফরের আগে থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে নানা আলোচনা হচ্ছে। ওদিকে কোনো কোনো ছাত্রসংগঠনসহ দু-একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী মোদির সফরের বিরোধিতায় পথে নেমেছে। বাংলাদেশ অধীর আগ্রহের সঙ্গেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষায় আছে। চলতি বছরটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি শুধু নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও ৫০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। দুটি প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের রসায়নটি একেবারেই ভিন্ন। ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে একসাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছে স্বাধীনতা। সেই অর্জনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ভারত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে মিল রয়েছে। এই সম্পর্ককে রক্তের বন্ধনে বেঁধে দেয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ভারতের সরকার ও জনগণ আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। দুই দেশ একে অপরের ঘনিষ্ঠ মিত্ররূপে কাজ করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ সে সময়ে দেওয়া ভারতের সমর্থন ও সাহায্যের কথা আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

ঐতিহাসিকভাবে যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবলই ১৯৭১ নির্ভর নয়। এ সম্পর্ক আরো অনেক আগের। সেই সম্পর্কটি রক্তের বন্ধনে নতুনভাবে বাঁধা পড়েছে ১৯৭১ সালে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের দেশের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করে আবার আশ্রয় নিয়েছেন ভারতের অভ্যন্তরে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মানুষের ত্যাগ কি এ দেশের মানুষ কখনো ভুলতে পারবে। কিংবা ওই সব এলাকার মানুষের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে আবেগ তা-ও কখনো বিস্মরণের ভেলায় ভেসে যাবে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে যেমন দেরি করেনি, তেমনি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তাকে স্বীকার করে নিয়েছে। এর ফলেই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাঠামোর বাংলাদেশ তার আঞ্চলিক সহযাত্রী হিসেবে পায় গণতান্ত্রিক ও বন্ধুভাবাপন্ন  ভারতকে।

আমরা যদি অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে গঙ্গা চুক্তি হয়েছে। অমীমাংসিত স্থলসীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের অবসান হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে ভারসাম্য আসছে। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের সম্ভাব্য পরিমাণ ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার, এ প্রাক্কলন বিশ্বব্যাংকের। ২০১৮ সালে বাণিজ্য হয়েছে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের। ভারত থেকে সাধারণত কাঁচামাল আমদানি করা হয় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাতের জন্য, বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের জন্য। এ শিল্পে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পোশাক প্রস্তুত করা হয়।

বাংলাদেশ ভারতীয় বেসরকারি কম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও বাগেরহাটের মোংলায় দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা করার কথা বলেছে। রিলায়েন্স পাওয়ার বাংলাদেশে তিন হাজার মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি সই করেছে। উন্নত অবকাঠামো, বাণিজ্য ত্বরান্বিত করতে ভালো ব্যবস্থা, এসইজেডে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পরিবহন সংযোগ ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিনিয়োগকে প্রণোদিত করতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার স্থলসীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দুই দেশের বাণিজ্য সহজ করতে সীমান্তে এক পদক্ষেপে যাতে কাজ হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ইলেকট্রনিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এতে দুই পাশে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সমন্বিত হবে এবং পণ্যবাহী গাড়ির সহজ পারাপার নিশ্চিত হবে। গাড়ি চলাচল, ল্যাবরেটরি টেস্টিং, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি কার্যক্রম এবং টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডস-সংক্রান্ত মিউচুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়া দরকার বলেও মনে করে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এর জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতাও তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এই নিষ্পত্তি উভয় পক্ষ মেনে নিয়েছে। এ কারণেই সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ মিলেছে। দুই দেশের সীমান্ত কিভাবে দুই দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। নিয়মতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভেতরে সম্পৃক্ত করা যায়। স্থলসীমা ও জলসীমা উভয় ক্ষেত্রেই এটা ভাবতে হবে। আশার কথা, দুই দেশের সম্পর্কে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আসছে। ভারতে উত্তর-পূর্ব অংশের সাত রাজ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগেরও সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে সীমান্ত হত্যা। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। দুই দেশের সম্পর্ক সমালোচিত হয় এই বিষয় ঘিরে। উভয় দেশের আন্তরিকতায় সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ও ভারত যখন নিকট প্রতিবেশী, তখন সম্পর্কে কিছু টানাপড়েন, ওঠানামা থাকা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন নতুন ইস্যু তৈরি হয়। কোনো সংকট কেটে যাওয়ার পর নতুন সংকট দেখা দিতেই পারে। একটা ইস্যুর সমাধান হয়ে যাওয়ার পর নতুন ইস্যু আসাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্কের নৈকট্য থাকলে কোনো ইস্যুই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যেমনটি ঘটেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে। এটাই আশার কথা। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক আজ একটি কার্যকর আন্তরিকতার পর্যায়ে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুধু নয়, সীমান্ত সুরক্ষা, প্রযুক্তি বিনিময়, মহাকাশ গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি, শিপিং, নদী খননসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার দিগন্ত ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এতে দুই দেশই উপকৃত হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে রক্তের বন্ধন, আবেগের যে আত্মিক সম্পর্ক,  বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ সেই সম্পর্কের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার
[email protected]