যে কারণে মার্কিন প্রস্তাবে সায় দেয়নি ঢাকা

63
Social Share

ঝুঁকিতে থাকা আফগান নাগরিকদের নিরাপদে অন্য দেশে যাওয়া নিশ্চিত করার বিষয়ে গত রবিবার রাতে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৯৫টি দেশ ও জোট। সেই বিবৃতির অংশ হয়নি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ। একমাত্র মালদ্বীপই ওই বিবৃতিতে যুক্ত হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে কিছু আফগান নাগরিককে সাময়িকভাবে বাংলাদেশে রাখার প্রস্তাব দিলে সরকার তাতে সায় দেয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ এসব সিদ্ধান্ত হুট করে নেয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত নীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানের কিছু লোককে বাংলাদেশে সাময়িকভাবে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল তখন বাংলাদেশ জানতে চেয়েছে অন্য কোন কোন দেশ এভাবে আফগান নাগরিকদের আশ্রয় দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তখন এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানায়নি। বাংলাদেশ বলেছে, ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এমনিতেই বেশ চাপের মধ্যে আছে। নতুন করে শরণার্থীর বোঝা বাংলাদেশ নিতে চায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, যে আফগান নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে অন্য দেশে স্থানান্তর করেছে বা করতে চায় তাদের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর হয়ে কাজ করেছে। তাদের অনেক কর্মকাণ্ড তালেবানের বিরুদ্ধে গেছে। বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশই মুসলমান। তালেবানের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সঙ্গে কাজ করা গোষ্ঠীগুলোকে এই অঞ্চলে আশ্রয় দেওয়া বেশ স্পর্শকাতর বিষয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আফগান ইস্যুতে বাংলাদেশ তালেবান বা তালেবানবিরোধী—কোনো পক্ষই নেয়নি। বাংলাদেশ আফগানিস্তান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ওই দেশটির শান্তি ও মঙ্গল প্রত্যাশা করেছে।

জানা গেছে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান বেশ আগে থেকেই আফগানিস্তানের সঙ্গে জড়িত। অভিন্ন সীমান্ত থাকায় আফগানিস্তানে অভ্যন্তরীণ পটপরিবর্তনের প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়ে। আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে মদদ, আশ্রয়-প্রশ্রয়, প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ বেশ পুরনো। তালেবানের সঙ্গে ইসলামাবাদের যোগাযোগ ও নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও তাদের ক্ষমতা দখলকে কৌশলগত কারণে এখনো পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তালেবানবিরোধী বা পশ্চিমাদের সহযোগীকে পাকিস্তান আশ্রয় দেবে—এমনটি এখন প্রত্যাশা করা যায় না।

ভারত তাদের সঙ্গে কাজ করা কিছু আফগান নাগরিক এবং ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘুকে আশ্রয় দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভারত আগে থেকেই এই অঞ্চলে ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে আফগানিস্তান থেকে গত কয়েক দিনে যারা ভারতে আশ্রয় পেয়েছে তারা ছয় মাসের ভিসা পেয়েছে। আফগানিস্তান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জানা গেছে, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কাও আফগান নাগরিক আশ্রয় ও উদ্ধারের বিবৃতিতে যুক্ত হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, ওই দেশগুলোও সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো আফগানিস্তান থেকে অনেক দূরে। এই অঞ্চলে পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবেশীদের ওপরই বেশি পড়বে। আবার যে-ই সরকার গঠন করুক বা ক্ষমতায় থাকুক না কেন তাদের সঙ্গেই প্রতিবেশীদের কাজ করতে হবে।

দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক জোট সার্কের সদস্য মালদ্বীপের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি প্রযোজ্য। তবে ওই দেশটির প্রেক্ষাপট এবার ভিন্ন। আগামী মাসেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিতে যাচ্ছে মালদ্বীপ। এক বছরের সভাপতিত্বকালে মালদ্বীপ আফগানিস্তান ইস্যুতে নীরব থাকতে পারবে না বা বৈশ্বিক অনেক উদ্যোগের সঙ্গে তাকে যুক্ত হতে হবে।

তা ছাড়া তালেবান ও আফগানিস্তান নিয়ে পশ্চিমাদের মনোভাব ও বক্তব্যের সঙ্গেও এ অঞ্চলের দেশগুলোর অবস্থানগত কিছু পার্থক্য আছে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, এই তালেবান পশ্চিমা বিশ্বেরই সৃষ্টি। তারাই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তালেবান সৃষ্টি করেছিল।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ জুনিয়র বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এখন অন্য দেশগুলোর ঠিক করতে হবে যে তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে না সন্ত্রাসের পক্ষে। অথচ ওই যুদ্ধে জাতিসংঘের সরাসরি অনুমোদন ছিল না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা যেভাবে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ২০ বছর অবস্থান করেছে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, আফগানিস্তান আফগান জনগণের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে এবং শান্তি ফিরবে।