যত ষড়যন্ত্র ছিল পদ্মা সেতু ঘিরে

73
Social Share

আর মাত্র চার দিন পর উদ্বোধন হচ্ছে বাঙালির গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতু। কিন্তু একটু পেছনে ফিরলে দেখা যায় এ সেতু ঘিরে ছিল নানা ষড়যন্ত্র। ছিল দুর্নীতির কল্পিত অভিযোগ। গত ১২ জুন পদ্মা সেতু পাড়ে সেসব ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, দুর্নীতিচেষ্টার ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক বাদানুবাদ, গুজব, জটিল রকমের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে নিজস্ব অর্থায়নে বাঙালির গর্বের পদ্মা সেতু নির্মাণের একক কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার হাতেই ২১ বছর আগে ২০০১ সালে পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল, আগামী ২৫ জুন উদ্বোধনও করবেন তিনি।

২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি ছাত্রদলের এক সভায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু এই আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। জোড়াতালি দিয়ে বানানো সেতুতে কেউ উঠবেও না। এরপর একের পর এক পদ্মা সেতু বিরোধী মন্তব্য আসতে থাকে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক বিরোধিতার সুরে তাল মিলিয়ে ‘কান নিয়ে গেছে চিলে’ এমন রব তোলেন সুশীল সমাজের কয়েক জনও।

পদ্মা সেতু বিরোধী নানা মহলের সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে। সে সময়ে সংবাদমাধ্যমে ড. মসিউর রহমান আর্তি জানিয়ে বলেছিলেন, আপনাদের কাছে আমি সহানুভূতি চাই। আপনারা আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। শেষমেশ বাধ্যতামূলক ছুটিতে যেতে হয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টাকে, দেড় মাস জেল খাটেন সেতু সচিব, ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি পদত্যাগই করতে হয় তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। দফায় দফায় তাদের হাজিরা দিতে হয় দুদকে।

আরেকটু পেছনে ফেরা যাক, সেতুর অর্থায়নে শুরুতে যোগ দেয় বিশ্বব্যাংক। উন্নয়ন সংস্থাগুলো যোগ দিতে থাকে অর্থায়নে। এরপর কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন থেকে সরে যেতে থাকে সংস্থাগুলো। তাদের একটার পর একটা আবদার রক্ষার চেষ্টা করেও বিশ্বব্যাংককে ফেরানো যায়নি পদ্মায়। গত ১৬ জুন এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারিয়ে ক্ষুব্ধ নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের তদবিরের কারণেই দুর্নীতিচেষ্টার মিথ্যে অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় কানাডার আদালত। রায়ে বলা হয়, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ গালগপ্প ছাড়া কিছুই নয়।

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে প্রথম বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। সেই মেয়াদে তার একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০০১ সালে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সরকারি নথিপত্রে লিপিবদ্ধ আছে। সেই সময় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য একটি সরকারি চিঠি জারি করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী-২) হিসেবে আমি সেই চিঠি নথিবদ্ধ করি।’ ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণের। ২০০৯ সালের ১৯ জুন সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে। এরপর ২৯ জুন পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি হয়। পদ্মা সেতুর কাজ ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণও করা হয় সেই সময়। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহ্বান করা হয়। পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় বিশ্বব্যাংক। সেই সঙ্গে সহযোগী হতে চায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিপি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকা। ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। এরপর ঐ বছরের ১৮ মে জাইকা (৪০ কোটি ডলার), ২৪ মে আইডিবি (১৪ কোটি ডলার) এবং ৬ জুন এডিবির (৬২ কোটি ডলার) সঙ্গে ঋণমুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরই মধ্যে শুরু হয় যায় বিপত্তি। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আসে দুর্নীতির অভিযোগ। ঋণমুক্তির পাঁচ মাসের মাথায় দুর্নীতির অভিযোগ এনে ঐ বছর (২০১১) সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করে। সরকারের তরফ থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে নানা চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০১২ সালের ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণমুক্তি বাতিল করে দেয় আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। এর তিন দিনের মাথায় ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বক্তব্য দিয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে দেন এবং প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করা হবে বলে ঘোষণা দেন।