মেহেরপুরে খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

104
খেজুর রস
Social Share

শীতের শুরুতেই রস সংগ্রহ, খেজুর রস এর গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মেহেরপুরের গাছিরা। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকেও গাছিরা মেহেরপুরে এসে খেজুর বাগান লিজ নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করে থাকে। তবে এবার উত্তারাঞ্চলীয় গাছিরা মেহেরপুরে আসেনি। এবছর স্থানীয় গাছিরা রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদনে করছেন।
শীত শুরুর সাথে সাথে গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করে রস আহরণ শুরু করেছে। রস আহরণের জন্য প্রথমে হাতে দা ও কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছে উঠে নিপুণ হাতে গাছ চাছা-ছেলা করে। পরে ছেলা স্থানে বাঁশের কঞ্চির নল বসানো হয়। সেই নল বেয়ে নেমে আসে সুস্বাদু রস। কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৮-৯টা পর্যন্ত গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে। দুপুর পর্যন্ত রস জাল দিয়ে গুড় তৈরি। কেউ কউ আবার গুড় থেকে পাটাালি তৈরি করে বিক্রির জন্য। আবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রস সংগ্রহের জন্য গাছে গাছে কলস বাঁধা। এভাবেই ব্যস্ত সময় পার করছে গাছিরা। মেহেরপুর জেলায় এমন গাছির সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। সদর উপজেলার আশরাফপুর, আমদহ ও গোভিপুর গ্রামে গাছের এবং গাছির সংখ্যা বেশী। তবে সদর উপজেলার আমদহ গ্রামের সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছ দেখা যায়। কোন কোন গাছি রস বিক্রি করে দেয়। অনেকে রস কিনে নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করে। এ শীতের মৌসুমে রস ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করে এমন সংখ্যা শতাধিক। রসের তৈরি পিঠা উৎসব চলবে পুরো শীত জুড়ে। রস দিয়ে নানান রকম পিঠা তৈরি করা হয়। ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, পাঠিসাপটা, রস পিঠাসহ বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির ধুম পড়ে গেছে খেজুর গাছের রস আর গুড় দিয়ে। ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবে রস ও রস থেকে তৈীি গুড়, পাটালি দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু খাবার। ইদানিং ইট ভাটায় জ্বালানি হিসেবে গাছে পোড়ানোর কারণে গাছ কমে যাচ্ছে। মেহেরপুর জেলায় এখনও আমদহ, গোভিপুর, পিরোজপুর গ্রামে খেজুর বাগান চোখে পড়ে। তাছাড়া জমির আইল, পুকুর পাড় আর রাস্তার ধারে রয়েছে খেজুর গাছ। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। খেজুর গাছ ৫-৬ বছরের হলেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করা যায়। দো-আঁশ ও পলি মাটিতে জন্মানো গাছে বেশি রস হয়। কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত রস আহরণ করা হয়। তবে যত শীত বেশি পড়ে তত রস বেশি হয়। গাছিদের মতে  প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০টি গাছের রস থেকে তৈরি হয় ৪০ কেজি গুড়।

সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের গাছি মুকুল মিয়া জানান- খেজুরের রস পেতে হলে বেশ কিছু কাজ করতে হয়। গাছের উপরিভাগের নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। আবার পাখিরা যাতে রস না খেতে পারে আর কোন জীবাণু না ছড়াতে পারে, সেজন্য আবার জাল বিছাতে হয়। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে-চুইয়ে এনে নল দিয়ে ফোটায় ফোটায় জমা হয় মাটির কলসিতে । একবার গাছ কাটার পর ২-৩ দিন রস পাওয়া যায়। রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর ৫-৬ দিন বিশ্রাম দেয়া হয়। রোদে কাটা অংশ শুকিয়ে গেলে আবার ওই অংশ চেছে রস সংগ্রহ করা হয়। আর এ কারণেই সাধারণত খেজুর গাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি ওই কাটা অংশে পড়ে।
আমদহ গ্রামের গাছি মুনতাজ আলী জানান- গাছ থেকে রস সংগ্রহের সময় মৌমাছির কামড় সইতে হয়। রস বিক্রির টাকা যখন ঘরে তুলি তখন মৌমাছির কামড়ের কথা ভুলে যাই।
সমাজ কর্মী মাহবুবুল হক মন্টু বলেন-আগে পতিত জমি ছিল। সেখানে অবহেলা অযতেœ খেজুর গাছ জন্মাতো। গ্রামীণ রাস্তার পাশেও সারিবদ্ধভাবে খেজুরগাছ দেখা যেত। সেসব গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতো। ওই খেজুর গাছ থেকে বাংলার নবান্ন উৎসবের জন্য গাছিরা রস আহরণ করতো। এসব গাছ ইটভাটা খেয়ে ফেলেছে। অন্তত পরিবেশের ভারাসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিটি সড়কের পাশে খেজুরগাছ লাগানো উচিত।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার খাঁ জানান, কৃষি বিভাগ খেজুর গুড়ের এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে কৃষককে জমি বা জমির আইলের পাশে খেজুর গাছ লাগানোর ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়।  তবে মেহেরপুরের মাটির গুণে এখানকার রস ও গুড় সুস্বাদু।